বিপদটা কিন্তু থেকেই গেল | The Background

Tuesday, June 15, 2021

Contact Us

Google Play

বিপদটা কিন্তু থেকেই গেল

সৌমিত্র দস্তিদার

এবার মুর্শিদাবাদের সদর বহরমপুরে বিজেপি জিতেছে। আনুষ্ঠানিক হিন্দুত্ববাদের জয় হয়েছে। কিন্তু এই পরিসর নির্মাণ লোকচক্ষুর আড়ালে বহুদিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছে। একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন বহরমপুর শহরে ফ্ল্যাট ভাড়া বা কেনা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের পক্ষে বেশ কঠিন অনেক দিন ধরেই। তাই এই আরএসএস-এর এজেন্ডা সফল করতে সবসময় বিজেপিকেই সামনে থাকতে নাও হতে পারে।

আমার অনেক প্রগতিশীল বন্ধু মনে করছেন যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি থেকে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে। আমি একেবারেই তাদের সঙ্গে একমত নই। যত দিন যাবে ততই বিষয়টি সবার কাছে স্পষ্ট হবে। ফ্যাসিবাদ শব্দটা ইদানীং বহু ব্যবহারে গাম্ভীর্য হারাচ্ছে। ফ্যাসিবাদ প্রাথমিকভাবে বলা হতো লগ্নি পুঁজির সর্বোচ্চ স্তরকে। পরে সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে নির্দিষ্ট এক আধিপত্যবাদী, এককেন্দ্রিক চরম দক্ষিণপন্থি, স্বৈরতান্ত্রিক দর্শনকেই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির মূল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ আসলে এক মতাদর্শ। বিজেপি সাম্প্রদায়িক, কিন্তু তার আসল চালিকাশক্তি, থিংকট্যাংক রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট শক্তি। বিজেপির এজেন্ডা যেনতেন প্রকারে সংসদীয় ক্ষমতা দখলের। আরএসএস ও সংঘপরিবারের লক্ষ্য বৃহৎ এক হিন্দুরাষ্ট্রের নির্মাণ। ফলে নির্দিষ্ট একটি দল হেরে গেলেও পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আগ্রাসন থেকে মুক্ত হলো এরকম চিন্তা যারা করছেন, তারা নিছক মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। ইতিমধ্যেই আরএসএস এক বিবৃতিতে বলেছে যে, এ রাজ্যের বাবু ভদ্দরলোকের মধ্যে একধরনের মুসলিম বিদ্বেষ চারিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তারা বিজেপির রাজনীতি নানা কারণে প্রত্যাখ্যান করলেও মমতার ‘মুসলিম তোষণ’ আগামীর পশ্চিমবঙ্গে বিপদ ডেকে আনবে এ নিয়ে আশঙ্কা ও উদ্বেগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মনে চারিয়ে দেওয়া গেছে।
ভোটের সময়ই কেউ খেয়াল করেছেন কি না জানি না যে, এ রাজ্যে এসে আরএসএস-এর তাত্ত্বিক নেতা দত্তাত্রেয় খোসাবেলা বলে গিয়েছিলেন যে কে জিতবে বা হারবে সেটা আমাদের কাছে একমাত্র ইস্যু নয়, আমাদের লক্ষ্য হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিস্তার। এখন এ রাজ্যে এসেই আরএসএস-এর আরেক তাত্ত্বিক নেতা হাসতে হাসতে প্রকাশ্যেই খোলাখুলি বলেছেন, ভুলে যাবেন না সারা দেশে আমরা হিন্দুত্ববাদী আবহ তৈরি করছি বলেই কখনো ‘সেক্যুলার’ অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে দিয়ে হনুমান চালিশা পড়িয়েছি। কখনো ভোটের দায়ে খোদ রাহুল গান্ধীকেও মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিতে বাধ্য করেছি। এবং এবার পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ মুখ মমতা ব্যানার্জিকেও চ-ীপাঠ মুখস্থ বলে বলে তিনি একজন ভক্তিমতী ব্রাহ্মণ কন্যা প্রমাণ করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হয়েছে। ভোটে বিজেপি হারলেও হিন্দুত্ববাদী দর্শন পিছু হটা দূরে থাক, ক্রমেই সংগঠিত চেহারা নিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ক্রমেই স্বাধীনতা-উত্তর চেহারা নিচ্ছে। তখন রাতারাতি কোনোরকমে টিকে থাকার তাগিদে মুসলিম লীগ সমর্থিত নেতারা বাধ্য হয়ে কংগ্রেসের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে সেটা কংগ্রেসের মধ্যকার হিন্দুত্ববাদের শর্ত মেনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজেদের আচার-বিশ্বাসকে জলাঞ্জলি দিয়ে। আরএসএস-এর এজেন্ডাই কিন্তু তাই। মুসলিমদের থাকতে হলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে। তখন ছিল কংগ্রেস এ রাজ্যের নীতিনির্ধারক। এখন সেই জায়গা নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ফ্যাসিবাদী বিজেপির হাত থেকে বাঁচতে দলে দলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন মন্দের ভালো তৃণমূলকে বেছে নিয়েছে। কখনো ভালোবেসে। কখনো ভয়ে বাধ্য হয়ে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দাপট বাড়লে মুসলিমরা কোণঠাসা হতে বাধ্য। বারেবারে বলছি হিন্দুত্ববাদ একটা মতাদর্শ। আমাদের টেলিভিশন দেখলেও আঁচ পাওয়া যায় কীভাবে নির্দিষ্টভাবে আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
দেশভাগ নিয়ে একটা ছবি করতে একবার মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙায় ভারত সেবাশ্রম সংঘের অফিসে গিয়েছি। শুনতে খারাপ লাগলেও স্বাধীনতার আগে থাকতেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পেছনে এ ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম জড়িয়েছে। ভারত সেবাশ্রম সংঘের ভূমিকা নিয়ে তো বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। বেলডাঙার আশ্রমের সেক্রেটারি মহারাজ আবার উগ্র এক হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা। কথায় কথায় বলেছিলেন, বিজেপির বাইরেও অনেক দলের মধ্যেই আমাদের লোকজনও আছে। প্রভাবও রয়েছে। মহারাজ নির্দিষ্ট করে বহরমপুরের এক বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতার নাম করে জানিয়েছিলেন ও আমাদেরই লোক। আমরা সহযোগিতা করি বলেই তো ও প্রতি বছর জিততে পারে। একটু অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু পরে খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, বিষয়টি সত্যি।
এবার মুর্শিদাবাদের সদর বহরমপুরে বিজেপি জিতেছে। আনুষ্ঠানিক হিন্দুত্ববাদের জয় হয়েছে। কিন্তু এই পরিসর নির্মাণ লোকচক্ষুর আড়ালে বহুদিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছে। একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন বহরমপুর শহরে ফ্ল্যাট ভাড়া বা কেনা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের পক্ষে বেশ কঠিন অনেক দিন ধরেই। তাই এই আরএসএস-এর এজেন্ডা সফল করতে সবসময় বিজেপিকেই সামনে থাকতে নাও হতে পারে। আরএসএস বা সংঘপরিবার অনেকটা হিন্দু পুরাণের বিখ্যাত হিরণ্যকশিপুর গল্পের মতো।
যতই দৈত্য সম্রাট হিরণ্যকশিপু ছেলে হরিভক্ত প্রহ্লাদকে বলছে, বল কোথায় তোর হরি! ছেলে গদগদ গলায় বলে চলেছেন, তিনি সবখানেই আছেন। এমনকি এই প্রাসাদের দেয়ালেও। রাগে আগুন হয়ে দৈত্যরাজ এক লাথিতে দেয়াল ভাঙতেই সত্যি সত্যি তার মধ্য থেকে বেরিয়ে এলেন ঠাকুর স্বয়ং। আরএসএসও তেমনি। কীভাবে কোন দলে যে ঢুকে বসে আছে তা বলা খুব কঠিন।
মমতা ব্যানার্জি সম্পর্কে বিজেপির সবচেয়ে বড় অভিযোগ ‘সংখ্যালঘু তোষণ’। দেশে বিদেশের অনেকেই কিন্তু বিজেপির এই প্রচারে যথেষ্ট মান্যতা দেন। মজা হচ্ছে এই প্রচারে খোদ মমতা ব্যানার্জিরও প্রচ্ছন্ন ভূমিকা আছে। তিনি রেড রোডে ঈদের নামাজে নিয়মিত হাজিরা দেন। ফ্লেক্স ও অন্যান্য বিজ্ঞাপনে সংখ্যালঘু ভাইবোনদের ঈদ শুভেচ্ছা জানান হিজাব মাথায়। যখন তখন যেখানে সেখানে ‘ইনশাআল্লাহ্’ বলে বার্তা দেন আমি তোমাদেরই লোক। ওয়াকফ বোর্ডের টাকায় কিছু ইমাম, মুয়াজ্জিমকে ভাতা দেন। মসজিদ কবরখানায় ঢেলে সাজানোর জন্য অর্থ বরাদ্দ করেন। এই প্রতীকী রাজনীতি বা ‘পলিটিক্স অফ টোকেনিজম’-এর মধ্য দিয়ে তিনি যে সংখ্যালঘু অন্তঃপ্রাণ, সেই ইমেজই নির্মিত হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় অংশ বাস্তবে এর কতটা সত্যি বা কতটা মিথ্ তা বুঝলেও খানিকটা নিরুপায় হয়েই চুপচাপ থাকেন। আর উচ্চবর্গের হিন্দু বাঙালির কাছে মমতা হয়ে যান ‘মমতা বেগম’। এইভাবেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ফাটল ক্রমেই চওড়া হতে থাকে। আড়ালে চলে যায় এ রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থাটা।
গবেষণা সংস্থা স্ন্যাপ, অ্যাকাডেমিক গিল্ড ও প্রতীচী ট্রাস্ট-এর এক রিপোর্ট বলছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে বাস করেন এমন মুসলিম সম্প্রদায়ের আশি শতাংশের মাসিক রোজগার পাঁচ হাজার টাকা মাত্র। এরমধ্যে সাতচল্লিশ শতাংশ ক্ষেত বা দিনমজুর। নিরক্ষরতার হার ১৯.৫২ শতাংশ। ১২ শতাংশের শিক্ষা প্রাথমিক স্তর অবধি। স্নাতক ৪.৮৫ শতাংশ। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ২ শতাংশ। সরকারি চাকরি ৫.৩৮ শতাংশ। ১৪ শতাংশের কাছাকাছি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার কার্ড নেই। মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলায় এক লাখ জনসংখ্যার অনুপাতে স্কুলের সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম কম, মাত্র ৭.২ শতাংশ। মনে রাখবেন, গবেষণা যারা করেছে সেই তিনটি সংস্থার অন্যতম প্রতীচী ট্রাস্টের মুখ্য উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। সুতরাং পুরো রিপোর্টটি ভুয়া বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো উপায় নেই। এর পাশাপাশি দেখুন করোনা সংকটে মোদি সরকারের আচমকা ‘লকডাউন’ নীতিতে যে বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিকদের বিপর্যস্ত হতে হয়েছিল এ রাজ্যে তার সিংহভাগই মালদা মুর্শিদাবাদ দিনাজপুরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।
ফলে এমনিতেই ইতিমধ্যে কোণঠাসা মুসলিমরা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যত বাড়বে ততই আরও কোণঠাসা, আতঙ্কিত হবে। গত  বিধানসভায় বিজেপি জিতেছিল মাত্র তিনটি আসনে। এবার সেখানে তারা সিট বাড়াতে পেরেছে গতবারের চেয়ে কুড়ি গুণের বেশি। এখন তাদের সাতাত্তর জন এমএলএ। ফলে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তার নখদাঁত ক্রমেই ভয়ংকরভাবে বের করবে এ বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাই ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়নি। ঘটনাচক্রে বাম-শূন্য বিধানসভায় সে প্রবল শক্তি নিয়ে নিজেকে সংহত করবে। মতাদর্শের লড়াইয়ে বলা ভালো দক্ষিণপন্থা জিতেছে। তার আসল শত্রু বামপন্থা পিছু হটেছে। কয়টা আসন পেল না পেল তা বড় কথা নয়। আগামীর রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব কিন্তু দুই মতাদর্শের মধ্যেই। দক্ষিণ বনাম বাম। ফ্যাসিবাদকে সত্যি সত্যি আটকাতে পারে বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিই।

Facebook Comments