ভদ্রলোকের চোখে মুসলমান | The Background

Tuesday, May 11, 2021

Contact Us

Google Play

ভদ্রলোকের চোখে মুসলমান

আবু সিদ্দিক

আহমদ ছফার গুরু আব্দুর রাজ্জাক স্যারের মুখ থেকে আমরা শুনি-
বেঙ্গলে হিন্দু মুসলমান শত শত বছর ধইর‍্যা বাস কইর‍্যা আইতাছে। হিন্দু লেখকেরা উপন্যাস লেখার সময় ডেলিবারেটলি মুসলমান সমাজরে ইগনোর কইরা গেছে। দুয়েকজন ব্যতিক্রম থাকলেও থাকবার পারে। বড় বড় সব হিন্দু লেখকের কথা চিন্তা কইর্যাা দেখেন। তারা বাংলার বায়ু, বাংলার জল এই সব কথা ভালা কইর‍্যা কইয়্যা গেছে। কিন্তু মুসলমান সমাজের রাইটফুল রিপ্রেজেনটেশনের কথা যখন উঠছে সকলে এক্কেরে চুপ। মুসলমান সমাজের সংস্কৃতি অধিকার থেইক্যা বঞ্চিত করার এই যে স্টার্বন অ্যাটিটিউড…(যদ্যপি আমার গুরু, মওলা ব্রাদার্স, ২০১৭, পৃষ্ঠা ৫৮)
Jeremy Seabrook and Imran Ahmed Siddiqui-এর মতে,
Muslims are not a matter of concern for the State unless they disturb or disrupt the existing order. It is only when they try to turn their eyes on wealth and power their activities become the interest of the State. If Muslims destruct one another it is of nobody’s concern. The word ‘Muslim’ has become synonymous with poverty and crime. They are antisocial elements. They will find a redressal mechanism for their cause. ( Jeremy Seabrook and Imran Ahmed Siddiqui, “People Without History:India’s Muslim Ghettos.” New Delhi: Navayana, 2011. P. 19. Print.)

অর্থাৎ মুসলমানদের কিসে ভাল হবে, সেটা তাদেরকেই ভাবতে হবে। রাজ্যের এ ব্যাপারে অত মাথা ব্যাথা নেই। মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে বিবাদ এবং সেই বিবাদ থেকে মৃত্যু আকছার ঘটনা।মুসলমান মুসলমানকে নির্বোধের মত ধ্বংস করছে। মুসলমান যুবকরা রাজ্যে কাজ না পেয়ে ‘দেশান্তরী’ হতে বাধ্য হচ্ছে। মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাতে শিক্ষা স্বাস্থ্যের পরিকাঠামোর বেহাল দশা।এসব ব্যাপারে রাজ্যের কোন ‘মাথাব্যাথা’ নেই।‘তার নর্দমার জীব, নর্দমায় থাকতে দিন’—ভাবখানা কিছুটা এরকম। আর মুসলমানরা সম্পদ এবং ক্ষমতাই আসতে চাইলে বা রাজ্জাক সাহেবের রাইটফুল রিপ্রেজেনটেশনের কথা বললে, রাজ্যের তখন মাথাব্যাথা হতে থাকে, রাতের ঘুম হারাম হয়। হাজার কল্পিত অভিযোগের(সন্ত্রাসী,বাংলাদেশী, ইত্যাদি) তীর তাদের দিকে তোলা হয় শুধুমাত্র তাদের অফুরন্ত শক্তিকে নিস্ক্রিয় করে রাখার তাগিদে। বাংলার মুসলমানদের রাজনীতির এই সুচিন্তিত ‘ছক’টি অধ্যবসায়ের সাথে গভীরভাবে বুঝতে হবে। এবং সেই লব্ধ অভিঙ্গতা থেকে তাদের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কী করণীয় সে কথা নতুন করে ভাবতে হবে। তা না হলে ‘কলুর বলদের’ মত বাংলার মুসলমানদেরও মুক্তি নেই, ঘানি টেনে যেতেই হবে। এবার শুনুন এই ভদ্রলোকদের কেলোর কীর্তি সন্তোষ রাণার মুখে,
বাংলাভাষী মানুষদের একটি জাতি হিসাবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সবচেয়ে বড় আঘাত। মধ্যশ্রেণীটি গড়ে উঠেছিল অবিভক্ত বাংলার দশ শতাংশের কম লোককে (পড়ুন ভদ্রলোককে) নিয়ে। এই রকম ছোট একটি অংশের স্বার্থ, অভ্যাস, জীবনযাত্রার ধরন ও মানসিকতাকে ব্যাপক মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে জাতি গঠন হয় না, বরং জাতি গঠনের প্রক্রিয়া গুরুতর ভাবে বিঘ্নিত হয়। বাংলার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। দশ শতাংশের কম মানুষেরর স্বার্থ বাঙালির স্বার্থ বলে উপস্থাপিত হল। ধুতি-পাঞ্জাবি বাঙালির জাতীয় পোশাক (বহু বাঙালি মানু্ষ জীবনে ধুতি-পাঞ্জাবি পরেননি), দুর্গাপূজা বাঙালির জাতীয় উৎসব হল (জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ মুসলমানদের বাদ দিয়েই।) কমিউনিস্ট ‘ভদ্রলোক’ জ্যোতিবাবু, বুদ্ধবাবু ঐ মধ্যশ্রেণীর ধারারই এক্সটেনশন মাত্র।(সন্তোষ রাণা, প্রবন্ধ সংগ্রহ, গাংচিল ২০১৯, পৃষ্ঠা ১৬১)
ইতিহাসের পর্যালোচনা এটাই দেখায় যে বাংলার ভদ্রলোকশ্রেণি ১৯০৫ পরবর্তী কালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়েছে, আবার একই সঙ্গে ছোটলোকরা যাতে মাথা তুলতে ও কর্তৃত্বের অবস্থানে ছলে আসতে না পারে সেটাও সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। তাদের কাছে প্রথম দ্বন্দ্বটির চেয়ে দ্বিতীয় দ্বন্দ্বটি ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বরং ইংরেজ থাকুক, তবু ছোটলোক ও মুসলমানরা যেন মাথায় চড়ে না বসে।
দেশভাগের পর, পশ্চিমবাংলার ভদ্রলোকশ্রেণীর ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। এর একটা কারণ জনসংখ্যায় তাদের ঘনত্ব বৃদ্ধি। পূর্ববাংলা থেকে ভদ্রলোকশ্রেণীর প্রায় গোটাটাই এদেশে চলে আসেন এবং এর ফলে তাঁদের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতা পরবর্তী কালে তাঁরা এমনভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন যে, চাষা-জেলে-কুমোর-তাঁতি-তেলি-গোয়ালা ও মুসলমানদের ধারে কাছেও ঘেঁষতে দেননি।(সন্তোষ রাণা, প্রবন্ধ সংগ্রহ, গাংচিল ২০১৯, পৃষ্ঠা ১৪৭)
বাংলার ভদ্রলোকেরা বিহারের উঁচুজাতির মতো ছোঁয়াছুঁয়িতে তত বিশ্বাস করে না। সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ের ‘সদগতি’ দেখবার পর এটাকে তাঁদের অবাস্তব মনে হয়। বিয়ে-থার ব্যাপারেও তাঁরা অনেক উদার। অন্তত ভদ্রলোক স্তরের মধ্যে অসবর্ণ বিবাহ প্রায়ই চোখে পড়ে। বন্ধুকধারী দল বানিয়ে নিম্নবর্ণের ঘর জ্বালাতেও তাঁদের দেখা যায় না যেমনটা বিহারে আকছার চোখে পড়ে। কিন্তু ভদ্রলোক ও ছোটলোকদের মধ্যে শ্রমবিভাজনটি অপরিবর্তিত রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের মতো দক্ষতা ভারতের অন্য কোন রাজ্যের উঁচুজাতিরা দেখাতে পারেননি। পশ্চিমবাংলার মোটামুটি ভাল মাইনের চাকরির নব্বই শতাংশ ও তার বেশি এই ভদ্রলোকদের দখলে। অপরদিকে চাষবাস, মাছধরা, হস্তশিল্প, মাটিকাটা, ইটভাটা, রাজমিস্ত্রি ও জোগাড়ে ইত্যদির ন্যায় কায়িক শ্রমের কাজগুলিতে অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখলেও এই ভদ্রলোকদের দেখা পাওয়া যায় না। এগুলি মুসলমান, আদিবাসী, তফসিলি জাতি ও অন্যান্য পশ্চাদপদ (পড়ুন পিছিয়ে রাখা) জাতির হিন্দু ও মুসলমানরা।(সন্তোষ রাণা, প্রবন্ধ সংগ্রহ, গাংচিল ২০১৯, পৃষ্ঠা ১৪৪)
এইড্যা কী করছেন? অমুক কইলেন অমুক, তমুক কইলেন তমুক। আপনার কী কহন আছে হেইডা কন দেখি! নতুন কিছুই নেই। আমরা বাবু ছা-পোষা লোক। আমরা কী কব? আর যদি বা কই, ভদ্রলোক-কচুরিপানার জঙ্গলের হেলদোল হবেনা। আমি এবিষয়ে নিশ্চিত। তবুও দু চারডা কথা কই, আপনারা যখন কইতে কইছেন।
আপনারা শিক্ষিত লোক। অল্পতেই বুঝবেন। তাই ইনিয়ে বিনিয়ে বলছি না। কথাডা হল যে ধর্ম ও রাজনীতি পৃথক থাকা কাম্য।যেমন রাষ্ট্রের কোন ধর্ম না থাকা কাম্য, প্রাত্যাহিক ব্যাবহারিক জীবনে মিথ্যা কথা না বলা কাম্য, ঘুষ না খাওয়া কাম্য, ধান্দাবাজি না করা কাম্য, —এসবই কা্ম্য। কিন্তু এত কাম্য কাম্য করেই তো আজকের অকাম্যের পাহাড়ের চুড়ায় পৌঁছেছি। মুসলমানরা ‘ধার্মিক’ হয়ে হজ, মাদ্রাসা, মসজিদ এ সব নিয়ে মেতে থাকবেন, কথা বলবেন। এরা আবার রুটি- রুজির কথা কেন বলছেন, ভিক্ষা নয় অধিকার চায়। এটা তো ওদের পক্ষে কাম্য নয়। দেখুন, আমরা ভদ্রলোক। সমাজে তো আমাদের একটা স্থায়ী না-রঙ-চটা মান্যতা আছে। শিল্প-সাহিত্য- সঙ্গীত- রাষ্ট্রচিন্তা- রাজনীতি-অর্থনীতি-এসব তো আমাদের একচেটিয়া। আমরা তো বাপু আমাদের ছেলে মেয়েদের মাঠের চাষা, রোদের মুনিশ, কারখানার মজুর, ভ্যানবালা, রাজমিস্ত্রি এসব হতে দিতে পারি না। এটি কাম্যও নয়। আপনি কি কন? আমাদের শারীরিক গঠন, মনের পরিপক্কতা, স্কিনের উজ্জ্বলতা, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-এর বেড়া কী একদিনে তৈরি করতে পেরেছি। কত নদী পথ হারিয়েছে, কত তারা খসেছে—আপনারা তলিয়ে দেখেছেন! আমরা সর্বহারার সাথে ছিলাম, মূলের সাথে ছিলাম, এবার ফুলের সাথে ঘর বাঁধব।আমরা ভদ্রলোক। ধান্দাবাজিতে এ ওয়ান –আপনাদের মতো ‘ছোটলোকরা’ আমাদের ধারে কাছে আসতে পারবে না। আমাদের ন্যায়নীতি-আদর্শ-রসবোধ-এসব একসময় ছিল বটে।অস্বীকার করছি না। আজ বিশ্বউষ্ণানয়নের তাপে, পুঁজিবাদের চাপে শকুনের মতো বিস্তৃত নীল আকাশ থেকে হঠাৎ বিলুপ্ত হতে চায় না।এছাড়া আমাদের অভিযোজন ক্ষমতার ধার ও ভার বোঝার মতো পরিপক্কতা আপনাদের মতো মাথা মোটাদের কখনও আসবে না। তাই আমার ছোটলোক ভাই বোনেরা, বিনীত অনুরোধ, সমান প্রতিনিধির দাবী, অধিকারে্র দাবী তুলে আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক পরিমণ্ডলের নিরবিছিন্ন হেজিমনিতে ফাটল ধরাতে আসবেন না। আপনারা না পরকালের চিন্তা করতেন? হঠাৎ করে ইহকালের ক্ষমতার হিজিবিজি জটিল সমীকরণে কেন নাক গলাতে আসছেন? আমরা করে খাব-উদর ও চাওয়া-পাওয়া পূর্তির পরে যদি উচ্ছিষ্ট কিছু থাকে আপনাদের লগে রাখব। কথা দিছি। এর বেশি কিছু চাইবেননা। ‘ছোটলোকরা বড্ড বেড়েছে’। আর যদি চান তাহলে ছেড়ে কথা কমু না— সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক বলে দাগিয়ে দেব। তহন কিন্তু আপনি আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, প্রতিবেশী, বা শুভাকাঙ্ক্ষী একথা বেমালুম ভুলে যাব। দোষ দেবেন না। এ স্বভাব আমাদের রক্তে শাশ্বত কাল থেকে প্রবাহমান। হলফ করে কইলাম। সুযোগ-সময় আসলে মিলিয়ে নেবেন।
বাঙালি মুসলমান ‘মাথা মোটা’ বলে সুপরিচিত কারন পার্টির জন্য, একমাত্র পার্টিকে ভালবেসে, সে শহিদ হয়েছে। গ্রাম বাংলার ভোট করে বাঙালি মুসলমান। মারা যায় বাঙালি মুসলমান কর্মী। আর নির্বাচনের সুফল ভোগ করেন শহুরে ভদ্র নেতাগন।যে বাবুরা মুসলমানের গায়ে টক টক, আঁশটে গন্ধ পান, মুসলমানদের যারা লেঠেল, চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, সন্তান তৈরির কারখানা ভেবে মনে মনে চাঁপা আনন্দে আত্মহারা হন, সেই বাবুদের বাবুয়ানা এই গরীব, বর্বর,অশিক্ষিত, পিছিয়েরাখা, নিষ্পাপ বাঙালি মুসলমানদের ভোটের উপর নির্ভরশীল। নেত্রী/নেতারা ইচ্ছে মতো বাঙালি মুসলমানদের ব্যবহার করেন, এবং কাজ ফুরিয়ে গেলে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেন। বাঙালি মুসলমানের আত্মসমালোচনা কোথায়? আরও কতদিন সে এই ভাবে ‘লাথি’ খেতে থাকবে?
আজ নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। আর ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। সব ক্ষমতার উৎস এই বাঙালি মুসলমানের ভিতর সুপ্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে। অন্তরাত্মাকে জাগিয়ে প্রকৃত মানুষের পূর্ণ মর্যাদায় আত্মঅহংকারের সাথে বাঁচার অধিকার তার আছে।নির্লিপ্ত কলুর বলদের ন্যায় ঘানি টেনে কী হবে? এই প্রশ্ন বাঙালি মুসলমানের কাছে আজ খুবই প্রাসঙ্গিক। আর শুনছি নাকি টুপি পরা দাড়ি রাখা এক মুসলমান নেতা এইসব প্রশ্ন সামনে আনতে চাইছেন। আর তাতেই নাকি লিবারেল (পড়ুন ইললিবারেল) ভদ্রলোকদের গায়ে গরম তেলের ফোস্কা পড়ছে। অবশ্য সবই এর ওর মুখে শোনা। কাগজ পড়ি না, আর ‘ইডিওটিক থিং’ও ঘরে নেই।
ফটো সৌজন্য- ফাউন্টেন ইঙ্ক

Facebook Comments