ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ২১শে ফেব্রুয়ারি | The Background

Monday, August 2, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ২১শে ফেব্রুয়ারি

সাহিদুল ইসলাম

ফেব্রুয়ারীর একুশ তারিখ

         দুপুরবেলার অক্ত

  বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?

         বরকতের রক্ত।”

                                   – আল মাহমুদ

বরকতের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। ভাষার জন্য প্রাণদান এই প্রথম। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাঙালির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা দিতে প্রাণ দিয়েছিলেন আবুল বরকত, রফিকুদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমান, আবদুস সালাম, আবদুল জব্বার, আবদুল আউয়াল, অহিউল্লাহ। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে- The  UNESCO General Conference in its closing session on 17 November, 1999 adopted the… resolution proclaiming International Mother Language Day to be observed on 21 February every year as proposed by Bangladesh. জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর ষষ্ঠ ভাষা বাংলার ক্ষেত্রে এই দিনটি, ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ ভাষা শহিদ দিবস।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। তৈরি হয় নতুন দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্থান। পাকিস্তানের আবার দুটি বিভাগ- পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। কৃষিজ সম্পদ ও  প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের সরকার (মুসলিম লীগ) ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের আজ্ঞাবহ।  ঐ সরকারের গণবিরোধী নীতি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়ে চলেছিল। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের পূঁজিবাদী শোষণ, অন্যদিকে স্থানীয় শাসকের সামন্তবাদী শোষণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চার করে। এই অবস্থায় ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুসলিম লীগের প্রধান নেতা এবং পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায়  ঘোষণা করলেন, ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ছাত্রসমাজ চাপিয়ে দেওয়া এই ভাযানীতি মেনে নেয়নি। ইতিপূর্বে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের জন্মলগ্নে যে প্রশ্নটি উঠে এসেছিল তা হল- ‘রাষ্ট্রভাষা কি হবে?’

১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য বীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রশ্ন তোলেন বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের কাজের ভাষা করতে হবে। তাঁর প্রস্তাব না মেনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বললেন ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এই প্রস্তাব সমর্থন করলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। আরও বলা হল যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ উর্দুকেই নাকি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেতে চায়। এতে বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, রাজনীতিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন। ২৬শে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট করল ছাত্ররা। ১৯৪৯ এর এপ্রিল মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ আরবি হরফে বাংলা লেখার সরকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে। ১৯৫০ এর ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় সরকার উর্দু ভাযার সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য কমিটি নিয়োগ করে এবং কোনরকম ঘোষণা ছাড়াই ঐ ভাযা ব্যবহার শুরু করে। জিন্নাহ-এর মৃত্যুর পর লিয়াকত আলি খান খাজা নাজিমুদ্দিনকে পাকিস্তানের গভর্নর পদে বসান। ১৯৫১তে লিয়াকত আলি খান নিহত হলেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে বসলেন খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি ১৯৫২-র জানুয়ারিতে ঢাকায় এলেন। ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। আগুনে যেন ঘি পড়ল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে আন্দোলন তীব্র হল। শুরু হল উত্তাল বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল। ছাত্ররা শ্লোগান তুলল- রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ৩০শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট হল। গঠিত হল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ। পরিষদ ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

অবশেষে এল সেই বেদনাঘন করুণ দিন। সরকার আন্দোলন দমনে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করল। ছাত্রদের সভা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। শ্লোগান উঠল- রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। পরে, ছাত্ররা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে রাস্তায় নেমে ১৪৪ ধারা ভাঙতে লাগল। হল লাঠি চার্জ। ইটপাটকেলও চলল ছাত্রদের তরফে। ছাত্র-পুলিশ খণ্ডযুদ্ধ। যুদ্ধংদেহী ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশ এঁটে উঠতে না পেরে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করল। শহিদ হলেন রফিকউদ্দিন আহমদ। রফিকের মাথার খুলি উড়ে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত শহিদ হলেন মেডিকেল কলেজের ভেতর। মারা গেলেন আবদুস সালাম। আট-নয় বছরের অহিউল্লাহ গুলিতে মারা গেল। জীবন দিয়ে এঁরা মাতৃভাষার মর্যাদা রাখলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২- নতুন এক ইতিহাস রচিত হল। মাতৃভাষার সম্মানে জীবন উৎসর্গ- চমকে উঠল আবিশ্ব। এই আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত ছিল ১৯৭১-এর বাংলাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা।

ভাষা আন্দোলন চলেছিল ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত। ওই বছর পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল। আসলে বাঙালির মাতৃভাষার প্রতি অদম্য ভালবাসার ইতিহাস বেশ পুরনো। যখনই তার ভাষার উপর দমন নীতি নেমে এসেছে সে তখনই গর্জে উঠেছে। প্রাচীন কালের বাঙালি কবি ভুসুকু পাদ গর্জে উঠে বলেছিলেন ‘আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী’। ব্রাক্ষ্মণ্যতন্ত্রের কঠোরতা যখন বাংলা ভাষার উপর নেমে আসে তখন ভুসুকু থেমে থাকেননি। মধ্যযুগের অনুবাদ সাহিত্য শাখার কবিরা শাসকের ও সমাজবিধির নিয়ন্ত্রাদের রক্তচোখ উপেক্ষা করে একের পর এক বাংলা ভাষায় সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ করে গেছেন। ২১শে ফেব্রুয়ারির এই বিশেষ দিনে আমরা সেই সব শহিদদের স্মরণগাথা রচনা করি যারা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। সালাম, বরকত, রফিক ছাড়াও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে ১৯৬১-র ১৯শে মে শিলচরের ১১ জন ভাষা শহিদদেরকেও।

Facebook Comments