খায়-দায় ফজর আলী মোটা হয় জব্বার | The Background

Saturday, October 24, 2020

Contact Us

Google Play

খায়-দায় ফজর আলী মোটা হয় জব্বার

বাচ্চু মিয়া, ঢাকাঃ

এখন কোন কিছুতেই যেন কিছু এসে যায়না। সকালে  ঘুম থেকে উঠে পেস্তা চেরা চোখে খবরের কাগজ  উল্টে-পালটে  দেখেন ব্যবসায় শুধু লস আর লস। অবশ্য আশির দশকে শুরু হওয়া এই ব্যবসায়ীরা শ্রমিকের মজুরীর প্রশ্নে এসে সবসময়ই লোকসানই দেখে!  তাই তাদের উৎসে করসহ নানাবিধ সুবিধার রাস্তা করে দেয় ক্ষমতাসীনরা।

শ্রমিক পড়ি মরি করে বাস ধরে কনুইয়ের গুঁতো খেতে খেতে কারখানায় যাওয়ার পথে ভাবে সন্তানটি ঘরে কি খাবে। অন্যদিকে মালিক ঠিকই মালেশিয়ায় সেকেন্ড হোম অথবা কানাডার বেগম পাড়ায় বউ-সন্তানদের সেটেলে ব্যস্ত। সারাদিন শ্রমিক বসের (সুপারভাইজারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) মুখ ঝামা খেয়ে চায়ে ডোবানো বিস্কুটের মত নেতিয়ে বাড়ি ফেরার সময় শুনবে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ।

পাঠক হয়তো আশ্চর্য হবেন আমি কাদের কথা বলছি। খোলাসা করেই বলি আমি বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারক প্রায় ৩০০০ সচল পোশাক কারখানার ৪৪ লক্ষ শ্রমিকের কথা বলছি। যে শ্রমিকদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় বর্তমান যুগেও! আমি তাদের কথা বলছি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ জাগোনিউজ২৪.কম এর খবর হচ্ছে, চাকরি বাঁচাতে দিগুণ কাজে বাধ্য হচ্ছে পোশাক শ্রমিকরা। বিজিএমইএ’র সভাপতি ড.রুবানা হক সম্প্রতি বলেছেন,গত ৬ মাসে ৪৬ টি তৈরী পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর এর সঙ্গে সঙ্গে চাকরি হারিয়েছেন ২৫ হাজার ৪৫৩ শ্রমিক-কর্মকর্তা।

অন্যদিকে কম শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদনের প্রচলন শুরু হয়ে গেছে এ বছরের জানুয়ারী থেকে। কারণ ঐ সময় থেকে শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরী ৮ হাজার টাকা কার্যকর হয়।এরপর থেকেই কারখানাগুলো সতর্কতা অবলম্বন শুরু করে। দেখা যাচ্ছে যদি কোন শ্রমিক ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যায়, ফিরে এসে তারা আর কাজ পায়না তার জায়গাটি অন্য কেউ পূরণ করে নেয়। এরকম হাজারো অনিশ্চয়তা যখন গার্মেন্টস শ্রমিকদের। তখন আরেকদিকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ সম্পদ চলে যাচ্ছে গার্মেন্টস শিল্পের মালিকদের হাতে।

৭ সেপ্টেম্বর অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের সভাপতিত্বে, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য, সমাধান কোন পথে? শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। গত ৫ বছরে ধনকুবেরের সংখ্যা চীন ও হংকংয়ের সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। কিন্তু সংখ্যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ১৭.৩ শতাংশ বাংলাদেশে। ২০১৭ সালে ২৫৫ জন ধনকুবের পেয়েছে বাংলাদেশ। আর অন্যদিকে মানুষের শ্রমে সৃষ্ট সম্পদ দেশে থাকছেনা! বছরে দেশ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে!  ড. মইনুল ইসলাম আরও জানান, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আয় বাড়ার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। আর এই ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ এখন গার্মেন্ট মালিকরাই। বছরে দেশ থেকে যে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে এক্ষেত্রে এগিয়ে গার্মেন্ট মালিকরাই। কিন্তু এ খাতের শ্রমিকরা দরিদ্রই থেকে গেছেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন আবুল বারকাতের ভাষায়, দারিদ্র-বঞ্চনা-বৈষম্য-অসমতা- এসব সৃষ্টি ও পূনঃসৃষ্টির শেকড়ে আছে রেন্ট সিকিং। রেন্ট সিকিং ব্যাখাটি তার ভাষায়,বিত্তবান বা সম্পদশালী হওয়া যায় দু’ভাবে। প্রথম পদ্ধতিতে বিত্তবান-সম্পদশালী হওয়া যায় সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে – এটা রেন্ট সিকিং নয় ; এ পদ্ধতিতে সমাজের মোট বিত্ত-সম্পদ বাড়ে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে বিত্তবান-সম্পদশালী হওয়া যায় অন্যের সম্পদ গ্রহণ, অধিগ্রহণ, হরণ, দখল, বেদখল, জবরদখল, লুটতরাজ, আত্মসাৎসহ সমরুপী বিভিন্ন পদ্ধতিতে। দ্বিতীয় পদ্ধতির এসবই হচ্ছে `রেন্ট সিকিং’! আর এসবের সাথে যুক্ত যারা তারাই `রেন্ট সিকার’। আবুল বারকাত তার বাংলাদেশে দারিদ্র-বৈষম্য- অসমতার কারণ-পরিণাম ও উত্তরণের সম্ভাবনা গ্রন্থে `রেন্ট সিকার’ গোষ্ঠী নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

পদ্ধতিটা এরকম,উপরতলার ধনীরা জনগণের সম্পদসহ নীচতলার মানুষের কাছ থেকে অর্থ – সম্পদ হাতরে নেবে কিন্তু নীচতলার মানুষ বুঝতেই পারবেনা কিভাবে কি হয়ে গেলো!  আর `রেন্ট সিকিং’ এর এই প্রক্রিয়ায় রেন্ট সিকার’দের সাথে রাজনীতি ও সরকারের এক অশুভ সমস্বার্থের সম্মিলন ঘটে যা দূর্ভেদ্য – যে ত্রিভুজটি দারিদ্র – বৈষম্য – অসমতা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে।

যার বাস্তব চিত্র বর্তমান আমাদের দেখিয়ে দেয়,কিভাবে ব্যবসায়ীরা রাজনীতি গ্রাস করছে। বর্তমানে জাতীয় সাংসদের ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী।  সংসদ এবং রাজনীতি এখন লোভনীয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতে শ্রমিক যে দ্বিগুণ কাজে বাধ্য হচ্ছে তা জোর গলায় বলার লোক এরও অভাব। সম্প্রতি জাপানে কাজের চাপে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আর সেই মৃত্যুকে সংজ্ঞায়িত করেছে একটি নির্দিষ্ট শব্দ – কারোশি। যার আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায় অত্যাধিক কাজের ফলে মৃত্যু। পাঠক হয়তো ভাববেন অত্যাধিক কাজ থেকে কিভাবে মৃত্যু হয়?  প্রধানতম মেডিকেল কারণটি হলো কাজের চাপ,উদ্বেগ ও না খেয়ে থাকার ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পারার ব্যর্থতা কিংবা কাজ করতে করতে জীবনের সব আনন্দ হারিয়ে ফেলে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে অহরহ। শুধু জাপানই নয়, এশিয়ার আরো নানা দেশে দেখা যাচ্ছে কারোশির প্রবণতা। জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তারা বলেছে, কারোশি হলো কোন কর্মির আকস্মিক মৃত্যু, যখন সে একমাসে ৮০ থেকে ১০০ ঘন্টার বেশি কাজ করে।

আমাদের পোশাক শ্রমিকরাও বর্তমানে এই অঘোষিত কারোশির শিকার হতে যাচ্ছে ।  জীবন-যাপন উপযোগী মজুরী যেমন নেই,তেমনি নেই কাজের নিশ্চয়তা। এরকম পরিস্থিতিতে বাধ্য হচ্ছে হাড় ভাঙা খাটুনি খাটতে। বাধ্য হচ্ছে দ্বিগুণ কাজ করতে। এই সেক্টরে সংগঠনের সংখ্যা প্রায় ৬০/৭০ টি কিন্তু দু’চারটার বেশি কেউ কথা বলার খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এ খাতের শ্রমিকদের সমস্যা একটি গল্প দিয়ে শেষ করি।সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠিন শাসনকালে একজন রেড স্কোয়ারে পোস্টার লাগাচ্ছিলেন। কোন লেখা ছাড়া সাদা পোস্টার। কঠিন শাসনে সবসময়ই পোস্টার লাগানোটা অপরাধ। যদি তা গুণকির্তন ছাড়া হয়। সে অনুযায়ী যে পোস্টার লাগাচ্ছিলেন তাকে আটক করে কেজিবি আধিকারিকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।সেই আধিকারিক বেচারা প্রশ্ন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে উঠলেন, তবু কোন উত্তর পেলেন না। শেষ পর্যন্ত বললেন, শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দাও, তোমার পোস্টার সাদা কেন? কিছু লেখা নেই কেন?  উত্তরে যিনি পোস্টার লাগাচ্ছিলেন তিনি বললেন, সবাইতো সবকিছু জানেই, এতো সব জায়গাও হবেনা এই পোস্টারে তাই লিখিনি।

লেখক বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের কর্মি

Facebook Comments