পার্থ সেনগুপ্ত (১৯৪০-২০২১): এক দীপ্তময় জীবনের কথা | The Background

Monday, August 2, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

পার্থ সেনগুপ্ত (১৯৪০-২০২১): এক দীপ্তময় জীবনের কথা

হাসিবুর রহমান

সদ্য পিতৃহারা নীলাদ্রি সেনগুপ্ত তাঁর বাবাকে কেওড়াতলা শ্মশানে দাহ করার অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। একদিকে ভয়াল করোনা আবহে মুহুর্মুহু লাশের গাড়ি ঢুকেছে শ্মশানে। এরই মাঝে সাংবাদিক ফোনে জানতে চাইলেন “আপনার পুণ্যাত্মা পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটা প্রশ্নের উত্তর চাই– শুনেছি আপনার একমাত্র কন্যার নাম  ‘রোকেয়া’?”

নীলাদ্রি বাবু উত্তর দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন, আমার বাবা শখ করে নাতনির নাম রেখেছিলেন রোকেয়া সেনগুপ্ত।”

ব্রাহ্মণ হিন্দু পরিবারে সুপরিচিত মুসলমান নামের ব্যবহার কোন সাধারণ ঘটনা নয়। বিশিষ্ট সমাজকর্মী, শিক্ষা- সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণপুরুষ পার্থ সেনগুপ্ত মুসলমান নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নিজের জননী রূপে পরিচয় দিতেন, আজীবন বিভিন্ন লেখায় ও কথায় তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেছেন।

পার্থ সেনগুপ্ত স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন, সমাজ চেতনা, ও বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণের কর্মপ্রয়াসে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ষাটের দশকে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর আবির্ভাব। ১৯৪০ সালে ১লা জুন কলকাতার মানিকতলায় এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম, পৈতৃক নিবাস হাওড়া জেলায়। পিতা কালীচরণ সেনগুপ্ত ছিলেন খ্যাতনামা আইনজীবী, তিনি পরে বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। মাতা সরজীবালা সেনগুপ্ত। প্রাথমিক লেখাপড়ার সূচনা হয়েছিল স্কটিশ মিশনারি স্কুলে এবং স্কটিশ চার্চ কলেজে। কিন্তু স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে ১৯৬১ সালে বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হয়ে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকে কলেজ ইউনিয়নের সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের কলকাতা জেলা কমিটির সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

উত্তর ও মধ্য কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ, দমদম মতিঝিল কলেজ, স্কটিশ চার্চ কলেজ দিলীপ চক্রবর্তী, শৈবাল মিত্র, সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তীর মতো উদীয়মান বামপন্থী ছাত্রনেতারা পরবর্তীকালে রাজ্য রাজনীতিতে সুপরিচিত হন। উল্লেখ্য, ষাটের দশকে এই সময়ে কলকাতায় ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন প্রতুল লাহিড়ী।

শ্যামল চক্রবর্তী বিদ্যাসাগর কলেজে ছাত্র ফেডারেশনে পার্থ সেনগুপ্তর জুনিয়র কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে সিপিআইএম দলে বিভাজন সৃষ্টি হলে বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশন ৬৬তে বিভাজিত হয়। ১৯৬৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন নিয়ে ভর্তি হন, পাশ করে ১৯৬৫-র শেষ দিকে ভবানী সেন সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘কালান্তর’ পত্রিকাতে পার্থ সেনগুপ্ত ও দিলীপ চক্রবর্তী তরুণ সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। মূলত তিনি পত্রিকা অফিসে সম্পাদকীয় বিভাগে  যুক্ত ছিলেন। সাংবাদিক জীবনের শুরুতেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন খাদ্য আন্দোলনের বীভৎসতা। ৬৬-র খাদ্য আন্দোলনের সময় জীবন বাজি রেখে শহরতলীর, গ্রাম গঞ্জের বিভিন্ন খবরা-খবর সংগ্রহ করেছেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তী স্মৃতিচারণা করে বলেছেন– পার্থ ছিল আমার বন্ধু ও সহকর্মী, ৬৬র খাদ্য সংকটের সময় মানিকতলায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তীব্র গোলাগুলির সম্মুখীন হয়েছিলাম, কোনরকমে প্রাণ ফিরে পায় আমরা, সেই সময় সরেজমিনে গিয়ে খাদ্য আন্দোলনের শহীদ নুরুল ইসলামের খবর করি দুজনে।”

ষাটের দশকের শেষের দিকে যুক্ত হন নিরক্ষরতা দূরীকরণ আন্দোলনের সঙ্গে। আরও কয়েকজনকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি। এই প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শুরু থেকেই। সাক্ষরতার আন্দোলনের একজন প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিত ছিলেন তিনি। এই সময় তিনি বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা এস এ ডাঙ্গের অত্যন্ত স্নেহভাজন হিসেবে  পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মঙ্গোলিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সন্মেলনে অংশগ্রহণ করেন সাক্ষরতা আন্দোলনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে। প্রতিষ্ঠা করেন সাক্ষরতা প্রকাশন, যা সত্তর-আশির দশকে বিভিন্ন গ্রন্থের সুলভ মূল্যে প্রকাশের বিষয়ে একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে। নিরক্ষরতা অভিযানের সাংগঠনিক তহবিল গঠন করে সমাজের দুর্গত মানুষদের সাহায্যও করা হতো। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দুর্গত মানুষদের জন্য পার্থ সেনগুপ্ত নিজ উদ্যোগে এই তহবিল থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ সাহায্য করেন।

ষাটের দশকের শেষ দিক থেকেই ( ১৯৬৬) সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বেসরকারিভাবে নিরক্ষরতা দূরীকরণ গণসংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। আক্ষরিক অর্থে তিনি ছিলেন নিরক্ষরতা দূরীকরণ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন উপাচার্য সত্যেন সেন তাঁর কর্মকান্ড দেখে অভিভূত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সামরিক কার্যালয় নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। অধ্যাপক শান্তিময় রায়, ফুলরেনু গুহর মতো প্রখ্যাত মনীষীরা তরুন ছাত্র সমাজকর্মীদের এসব কাজে প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করতেন। সমকালীন সময় কলকাতায় ঘটে যাওয়া ৬৪র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পার্থসেনগুপ্তর মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। শান্তিময় রায়, ফুলরেনু গুহর মতো ধর্মনিরপেক্ষ , উদার মনীষীদের সহচর্যে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান। কলকাতা ও শহরতলীর দুশো মুসলমান বাড়ি দাঙ্গায় ভষ্মিভূত হয়, হাওড়া জুট মিলে বহু মানুষ খুন হয়। দুর্গত মানুষদের আশ্রয় ও সাহায্য দানের জন্য পার্থ সেনগুপ্ত নির্ভীকভাবে মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছান। হতাশাগ্রস্ত সংখ্যালঘু মুসলমান শহরবাসীদের জন্য অন্যত্র চলে না যেতে আশ্বস্ত করেন। নব্বইয়ের দশকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় ঠিক একই ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ।

যাইহোক সাক্ষরতা প্রকাশন সংস্থা থেকে বেরিয়েএসে পরবর্তীকালে তিনি বিশ্বকোষ পরিষদ গঠনের কাজে সামিল হন বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে সঙ্গে নিয়ে। এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলায় ২৪ খণ্ডের বিশ্বকোষ প্রকাশনার উদ্যোগ নেয়। প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি বিষয় নিয়ে তৈরি এই বিশ্বকোষ স্বাধীন ভারতের কোনও দেশীয় ভাষায় বিশ্বকোষ প্রকাশনার নিরিখেও একটি উদাহরণ হয়ে আছে।

পশ্চিমবঙ্গের যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রাক্কালে অবিসংবাদিত নেতা সৈয়দ বদরুদ্দোজা ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন পার্থ সেনগুপ্ত। তিনি লিখেছেন, “সৈয়দ বদরুদ্দোজা স্মৃতি আমার জীবনের শেষ দিন অব্দি মনে থাকবে। ১৯৬৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনের কাজে তাঁর বাড়িতে প্রায় সন্ধ্যায় যেতাম, যুক্তফ্রন্টের প্রচারাভিযান, বক্তাদের তালিকা প্রস্তুত করতে হতো, যুগ্ম আহ্বায়ক সুধীনকুমার ,বরদামুকুটমণি ,সৈয়দ বদরুদ্দোজা মাথার উপর থেকে পরামর্শ দিতেন। একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে তাঁর আতিথিয়তা, স্নেহধন্য হওয়ার  সুযোগ আমাকে চিরকালের মতো গর্বিত করেছে। সেকালের তরুণ আমি আজ বৃদ্ধ, তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা , শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ, দেশপ্রেমিক আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি।”

রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে জ্যোতি বসু, ভূপেশ দাশগুপ্ত, বিনয় চৌধুরী, প্রমোদ দাশগুপ্ত অনেকের স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। বামপন্থী দল বিভাজিত হলে তিনি সিপিআই এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং ব্যক্তিগতভাবে বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট ছিল। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকটে দলের বাইরে থেকেও সিপিআইএম দলকে গঠনমূলক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন। তাঁর দাদা কামাখ্যা প্রসাদ সেনগুপ্ত সত্তরের দশকে নকশাল গণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেও তিনি হিংসা মূলক এই রাজনীতি পছন্দ করেননি।

নকশাল আক্রমণে কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগর মূর্তি ভাঙার পর পার্থসেনগুপ্ত এর নেতৃত্বে ইন্দুভূষণ নন্দ, শৈবাল মিত্র, প্রণব মুখার্জি, দিলীপ চক্রবর্তী-সহ আরও কিছু বিশিষ্ট জনকে সঙ্গে নিয়ে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেন।

সেই উপলক্ষে প্রাপ্ত অর্থে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মূর্তিটি পুনরায় নির্মাণের ব্যবস্থা করেছিলেন তাই নয়, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মূর্তি নির্মাণ করেন। বিদ্যাসাগরের অবমাননাকে মুছে দিতে বহুমাত্রিক ভাবনা তাঁর মনে স্থান পেয়েছিল। প্রকাশ করলেন বিদ্যাসাগর রচনাবলী। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা চেতনা ও কর্মোদ্যোগকে সামনে রেখে কলকাতা, মেদিনীপুর, কারমাটারে অনেক সভা-সমিতি ,আলোচনা ,পুস্তিকা প্রচারাভিযান করেন।  বিদ্যাসাগরও রোকেয়ার শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারমূলক চিন্তা চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভাগ পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে নিরন্তর কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করেছেন পার্থসেনগুপ্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন,–কোন জাতির উত্থানের  পশ্চাতে থাকে গভীর সাংস্কৃতিক চেতনাবোধ। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এই সংস্কারমুখী চেতনা গড়ে তুলতে না পারলে জাতির উত্তরাধিকার বিপন্ন হবে। উত্তর ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বিকাশ গড়ে না উঠলে বিশেষ করে বিভাগ পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপন্নতার সম্মুখীন হবে সন্দেহ নেই। সমাজ জীবনে এই সংকটের অতলস্পর্শী গহবর  থেকে আলোকবর্তিকা রূপে মুসলমান সমাজের কৃতীদের সুলুক সন্ধানী ছিলেন তিনি। পার্থ সেনগুপ্তের গড়ে তােলা সংস্থা বিশ্বকোষ পরিষদ  সাহিত্য ও  সমাজ জীবনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর কর্মকাণ্ডকে সংক্ষেপে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, দেশভাগের পর মুসলিম কবি, সাহিত্যিকদের লেখা ও অবদান মানুষের মন থেকে বিস্মৃত হচ্ছে। আর তা পুনরুদ্ধার করে সামনে নিয়ে আসার দায়িত্ব তিনি যেন একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন । রোকেয়া এবং বেগম সালাউতুন নিসা-র অবদান ও স্মৃতিকে জাগরুক করার জন্য তাঁর প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না ।

দীর্ঘ অর্ধশতকের বেশি সময় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পুনর্নির্মাণে তাঁর বলিষ্ঠ প্রয়াস বাঙালি মুসলমান জীবনে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বিশ্বকোষ পরিষদের প্রকাশনার নেপথ্যে তিনি উদার সংস্কৃতিমনা সমাজ গঠনের লক্ষ্যে মৌলভী মুজিবুর রহমান, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, নতুন আলোকে  সিরাজউদ্দৌলার পুনর্মূল্যায়নে ‘সালাম জাহাপানা’ স্মারক সুবর্ণ লেখ, ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির স্মারক সুবর্ণ লেখ’, দানবীর হাজী মহসিনের দ্বিশত মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে  ‘হে মহাজীবন সুবর্ণ লেখ’, ‘হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন ও প্রাসঙ্গিকতা’, ‘রবীন্দ্রনাথ স্মরণে-মননে একগুচ্ছ প্রবন্ধ চয়নের চোখ’, ‘রোকেয়া রচনাসংগ্রহ’ ও সম্পাদনা সহ বহু গ্রন্থ প্রকাশ করে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।

বাঙালি মুসলমান নারী জীবনের পথিকৃৎ রোকেয়ার চিন্তা চেতনা তাঁকে গভীর ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত উপন্যাস, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র ছোট ছোট পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে রোকেয়া স্মারক বক্তৃতা, সেমিনারের আয়োজন করে রোকেয়া চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ২০১৬ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে  কলকাতার আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে ‘রোকেয়া মিনার’ গড়ে তুলে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া কলকাতার পানিহাটিতে রোকেয়ার পৈত্রিক জমিতে নির্মিত কবরস্থান রক্ষা, তথাস্থানে অবৈধভাবে দখলকৃত ভূমি উদ্ধারে প্রতিবাদী হয়েছেন। শুধু তাই নয় পার্ক সার্কাসে রোকেয়া সাখাওয়াত উদ্যানের জমি দখলের প্রশ্নে কড়া সুর চড়িয়েছেন। রোকেয়ার স্মৃতি বিজড়িত যেকোন প্রশ্নে তিনি ছিলেন বরাবর আপোষহীন যোদ্ধা। কেউ রোকেয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে অকপট উত্তর দিতেন– আমার জননী রোকেয়াকে নিয়েই জানা ফুরোলো না, অন্য কিছু ভাবি কী করে!

 সৈয়দ বদরুদ্দোজা স্মারকগ্রন্থের’ আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন অনষ্ঠানে। ১৫ মার্চ ২০২১।

তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের, দর্শনের নেপথ্যে ছিল এক গভীর মানবিক মূল্যবোধের ভান্ডার। রাজনীতির সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সমাজে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের সহাবস্থান, ভ্রাতৃত্ববোধ, ধর্মনিরপেক্ষ, উদার  চেতনা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আক্ষরিক অর্থে প্রচার বিমুখ কর্মোদ্যোগী পার্থবাবু ইতিহাসের অবহেলিত পাঠ্যাংশের পুনরুদ্ধারে কখনো ৫নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্মরণ সমিতি, কখনো বা শহীদ তিতুমিরের স্মরণসভার আয়োজন করেছেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় মুর্শিদাবাদে গড়ে ওঠে সৈয়দ বদরুদ্দোজা অতিক্রান্ত জন্মশতবর্ষ সমিতি এবং সমিতির পক্ষে চলতি বছরের ১৫ মার্চ অশক্ত শরীরে ‘অনন্য জননায়ক সৈয়দ বদরুদ্দোজা স্মারকগ্রন্থের’ আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। জীবনের অন্তিম পর্বে ইচ্ছা ছিল ভাষা শহীদ আবুল বরকতকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা এবং সম্ভব হলে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা। কিন্তু জীবনের আকস্মিকতা তাঁকে থমকে দিলো–৯ইজুন বুধবার গভীর রাতে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে।

পার্থ সেনগুপ্ত ছিলেন একনিষ্ঠ সমাজকর্মী, সফল প্রকাশক, বিশিষ্ট সংগঠক। পেশাদার লেখক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল না ঠিকই কিন্তু সামাজিক প্রয়োজনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা সম্পন্নপার্থ বাবু মানবতার লঙ্ঘন চোখে পড়লেই প্রতিবাদে মুখর হতেন। ছাত্রজীবন থেকেই গান্ধীবাদী নেতা বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক রেজাউল করিমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সংগঠনের কাজে যখনই মুর্শিদাবাদ আসতেন তিনি বহরমপুর রেজাউল করীমের সঙ্গে দেখা করে নানা বিষয়ে পরামর্শ নিতেন। তাঁর ভাষায়–  রেজাউল করীম সাহেব ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মুহুর্ত প্রতীক, তাঁর সমন্বিত উদারনৈতিক জীবনবোধ আমাকে গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

অতি সাম্প্রতিক ‘সৎ ভাবনা মঞ্চ’, ‘সংবিধান বাঁচাও কমিটি’ দেশজুড়ে এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে কলকাতা, মালদা, মুর্শিদাবাদে  বহু সভা-সমিতিতে বক্তব্য রেখেছেন, কিংবা মুর্শিদাবাদের জলঙ্গিতে জঙ্গীমূলক কার্যকলাপের মিথ্যা অভিযোগে ধৃতদের পক্ষ নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র করাঘাত করেছেন।

তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাঁর কর্ম চেতনা ও উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন পথ দেখাবে।

Facebook Comments