ধর্মনিরপেক্ষতার ভান চলছে, চলবে | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

ধর্মনিরপেক্ষতার ভান চলছে, চলবে

নাজিব আনোয়ার  

যোগীরাজ ও মমতারাজের মধ্যে কি কিছু তফাত আছে? অথবা ধরুন, ত্রিপুরা সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যেও কি কিছু তফাত আছে? মনে হয় না। উত্তর প্রদেশ এবং ত্রিপুরা চালায় বিজেপি, পশ্চিমবঙ্গ চালায় তৃণমূল কংগ্রেস। তফাতটা শুধু এটাই। কিন্তু হিন্দুত্ব চলছে, চলবে- সেটা কড়া না নরম; সেটা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে।

সংখ্যালঘু মুসলমান-আদিবাসী-দলিতদের উপর এই সরকারগুলি যে ধরণের অত্যাচার-অবিচার নামিয়ে এনেছে, সেটা দেখলে তাজ্জব বনে যেতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান গণধোলাই-এর শিকার হচ্ছে ও সংবাদের শিরোনামে আসছে এই খবর। গত আগস্টে সুরাফ হোসেন ভয়ানক ভাবে প্রহৃত হলেন পরিবারশুদ্ধু। সুরাফ নিজেই পুলিশ। মার খেলেন একদল পুলিশের হাতেই। দিনেদুপুরে। এই ঘটনায় তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রীও আহত হলেন। তাঁর পেটের সন্তান নষ্ট হয়ে গেল। খাঁকি উর্দি পরা পুলিশের অশ্রাব্য গালিগালাজ ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কথাবার্তা।

গত মাসে কোচবিহারে ভর সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফেরার পথে আক্রান্ত হলেন একজন মসজিদের ইমাম। দুস্কৃতিরা তাঁকে তীর মেরে বসলো। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল তাঁকে। মইদুল ইসলামের কথা ধরুন। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। লড়াকু মানুষ। সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে নিয়ত সোচ্চার। তাঁকে নাস্তানাবুদ করতে পুলিশ উঠেপড়ে লাগলো।

কিন্তু এখন আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি। ধর্মীয় জলসাতেও আপত্তি উঠছে। বাধা আসছে। ভারতীয় সমাজে ধর্মের গুরুত্ব অনুধাবন করে আমাদের সংবিধান রচয়িতাদের ২৫ নম্বর থেকে ২৮ নম্বর ধারায় পর্যন্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সম্বন্ধে বক্তব্য রয়েছে। সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে প্রত্যেক ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম গ্রহণ, ধর্ম পালন, ও ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা আছে।

কিছুদিন আগে ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী নবী দিবস উপলক্ষে কলকাতার কাছেই ভাঙড়ে একটি জলসা করতে চেয়েছিলেন। নানান অজুহাতে তা নাকচ হয়ে যায়। গত ৭ই নভেম্বর, রবিবার, তিনি আবার একটি জলসা করতে চেয়েছিলেন। আগাম অনুমতি দেওয়ার জন্য পুলিশকে জানানোও হয়। কিন্তু স্থানীয় তৃনমূল  কংগ্রেস নেতা কাইজার আহমেদ ও তার বাহিনী বাধা দিতে থাকে। পুলিশের একাংশের যোগসাজশে রবিবার সভায় আসা মানুষদের বেধড়ক পেটানো হয়, কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে ছত্রভঙ্গ করা হয়। পীরজাদা আব্বাসের অভিযোগ, ইসলাম সম্পর্কে নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করে পুলিশ।

এর আগে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জলসার উদ্যোক্তা, আহলে সুন্নাতুল জামাতের সদস্যদের নানানভাবে সন্ত্রস্ত করে যাচ্ছিল কাইজার বাহিনী। শনিবার রাতে তারা চড়াও হয় আসাদুল মোল্লার বাড়ি ও কারখানায়। ভাঙচুর, লুটপাট চলে দেদার। পরিবারের মানুষদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি চলে। পরিবারের এক অন্তঃস্বত্বা মহিলাকে গুরুতর আহত অবস্থায় কলকাতার এক হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। পুলিশ এখানে নীরব দর্শক। রাজনীতিক-গুন্ডা-পুলিশের চক্র বড়ই স্পষ্ট।

রেখে-ঢেকে বলার কোন মানেই হয় না। ধর্মনিরপেক্ষতার ভান করে মুসলমানদের ধোঁকা দিচ্ছে তৃণমূল সরকার। শারদোৎসব হবে মহাসাড়ম্বরে; দেওয়ালি ও কালী পুজো হবে ধুমধাম করে। এমনকি, ছট পুজোও ঘটা করে হতে থাকবে। কিন্তু নবী মহম্মদ (স)-এর জন্মদিন পালন চলবে না। ইসলামী জলসায় যোগ দিতে গেলে লাঠিপেটা খেতে হবে; কাঁদানে গ্যাস খেতে হবে; তাড়া খেতে হবে। আপনাকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

আর সেই মেরুদন্ডহীন বুদ্ধিজীবীদের দেখুন। বছরের শুরুতে বিজেপি’র যাত্রাভঙ্গ করতে এককাট্টা হয়েছিলেন। ‘তৃণমূল কংগ্রেস ফেরাও’- রণহুংকারে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল। তৃণমূল ফিরল। দুরন্তভাবে। এখন মুসলমান-আদিবাসীরা আরও কোনঠাসা হচ্ছে, মার খাচ্ছে। বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চুপ। সাড়াশব্দ নেই। সুবিধাবাদই তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাদের কিছু যায় আসে না।

পশ্চিমবাংলায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) অনেকদিন থেকেই শাখা বিস্তার করেছে। এটা সবাই জানে। বিজেপি ক্ষমতায় আসুক, কি তৃণমূল ক্ষমতায় থাকুক- আরএসএসের কিছু এসে যায়না। মুসলমান-আদিবাসী-দলিতদের পিষে দেবার কর্মসূচীর কোন বাধা না হলেই হল।

পুনশ্চঃ জনৈক বিখ্যাত সাংবাদিক পরে পত্রিকার সম্পাদক হয়েছেন। সেই পত্রিকায় ভাঙড়ের দুষ্কৃতিদের নেতা কাইজার আহমেদের অনেক প্রশস্তিমূলক লেখা বেরিয়েছিল। অর্থ বড় বালাই। তাঁকে তো পত্রিকা চালাতে হবে। প্রশস্তি চলতে থাকুক।

 

 

Facebook Comments