রূপকথার নায়ক চুনী গোস্বামী | The Background

Tuesday, October 27, 2020

Contact Us

Google Play

রূপকথার নায়ক চুনী গোস্বামী

নাফিস আনোয়ার

ফুটবল প্রিয় বাঙালির কাছে ময়দানের উত্তমকুমার ছিলেন তিনি। নায়কের মতই চেহারা তাঁর। জনপ্রিয়তাও ছিল সুপারস্টারদের মতই, এমনকি তা খেলা ছাড়ার অনেক পরেও। নিজের সেরা সময়ে ফিরিয়েছেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে ট্রায়ালে যাওয়ার প্রস্তাব। ১৯৬২-র জাকার্তা এশিয়ান গেমসের সোনাজয়ী ভারতীয় ফুটবল দলের অধিনায়কও তিনিই। আবার দুর্ধর্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট টিমের ওয়েসলি হল, চার্লি গ্রিফিথ, লেস্টর কিংদের ব্যাট হাতে সামলেছেন‌ বুক চিতিয়ে, সুইংয়ে মাত করে তুলে নিয়েছেন রোহন কানহাইদের উইকেটও। বাংলার ক্রিকেটদলের অধিনায়ক হয়ে দলকে তুলছেন রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে।  চুনী গোস্বামীর জীবনটার দিকে তাকালে রূপকথা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবু শেষমেশ তিনি ভারতীয় ফুটবলের রাজা, প্রথম মেগাস্টার। এই অসময়ে ৮২ বছর বয়েসে চলে গেলেন সেই রাজা।

 পেলের সঙ্গে কলকাতায়। ২০১৫।

ভালো নাম সুবিমল গোস্বামী। জন্ম পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। অথচ চিরকালীন ঘটি বাঙালের যুদ্ধে ইস্টবেঙ্গল না হয়ে তিনি আজীবন মোহনবাগানের সৈনিক! এই ক্লাবের সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ। মাত্র ৮ বছর বয়সে মোহনবাগানের জুনিয়র দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন চুনী গোস্বামী। ১৯৫৪ সালে ১৬ বছর বয়স থেকে সিনিয়র দলে। তারপর দীর্ঘ ১৪ বছর একটানা খেলে অবসর সেই মোহনবাগানেই। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ পাঁচবছর দলের অধিনায়ক। তাঁর নেতৃত্বে এসেছে চোদ্দোটা ট্রফি। তার মধ্যে আছে টানা চারবার লিগ (১৯৬২-৬৫), টানা তিনবার  ও শিল্ড (১৯৬০-১৯৬২), টানা তিনবার ডুরান্ড কাপ  (১৯৬৩-৬৫) জয়ের অনন্য নজির। মোহনবাগানের হয়ে ২০০-র বেশি গোল আছে তাঁর। খেলা ছাড়ার পরেও নানাভাবে আজীবন জড়িয়ে ছিলেন এই ক্লাবের সাথে। ২০০৫ সালে মোহনবাগান রত্নে ভূষিত করে ক্লাব। ভারত সরকার ১৯৮৩-তে দিয়েছে পদ্মশ্রী সম্মান। হয়েছেন কলকাতার শেরিফও।

 পদ্মশ্রী সম্মান গ্রহণ করছেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে চুনী গোস্বামীর অভিষেক ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৮-র টোকিয়ো এশিয়াড ও ১৯৬০র রোম অলিম্পিকে তাঁর খেলা নজর কাড়ে সবার, বিশেষত অলিম্পিকের বিখ্যাত সেই ম্যাচে যেখানে ফ্রান্সের সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছিল ভারতীয় দল। তারপর এলো সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখর। ১৯৬২ জাকার্তা এশিয়ান গেমসে তাঁর নেতৃত্ব স্বর্ণপদক জয় করল ভারতীয় ফুটবল দল। ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ গোলে হারাল ভারত। সেমিফাইনালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সঙ্গে ৩-২ গোলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের জয়সূচক গোলটিসহ চুনী গোস্বামী করলেন দুটি গোল। এরপর তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৬৪তে এএফসি এশিয়ান কাপ ফুটবলেও রুপো জয় করে নেয় ভারত ইস্রায়েলের তেল আভিভে। সেই ৬৪-তেই মালয়েশিয়ায় মারডেকা কাপেও ফের রুপো এলো তাঁর নেতৃত্বে। ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে সেই সময়টিই।  খ্যাতির মধ্যগগনে থাকাকালীন মাত্র তিরিশ বছর বয়সে চুনী গোস্বামী অবসর নেন ফুটবল থেকে।

 ভারতীয় ফুটবলের প্রথম মেগাস্টার।

তারপর ক্রিকেট। ১৯৬২-৬৩ মরশুমে বাংলা দলে অভিষেক। ৪৬ ম্যাচে একটি শতরান সহ ১৫৯২ রান ৪৭টি উইকেট। দু’বার খেলেছেন রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে, ১৯৭১-৭২ সালে দ্বিতীয়টির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি নিজেই আর প্রথমটিতে ১৯৬৮-৬৯-এ দুই ইনিংসেই বাংলার সর্বোচ্চ  রান ছিল তাঁরই। তার সাথে ১৯৬৬-র কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া ইন্দোরের সেই ম্যাচ। মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের দলের হয়ে ভয়ঙ্কর ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমকে পরাজিত করার সেই ম্যাচে ব্যাটে বলে ফিল্ডিংয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স ছিল চুনী গোস্বামীর, দুই ইনিংস মিলিয়ে নিয়েছিলেন ৮টি উইকেট! আবার হকি আর টেনিসটাও অনেকের চেয়েই ভালো খেলতেন তিনি! নিঃসন্দেহে ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদদের অন্যতম চুনী গোস্বামী।

ভারতীয় ফুটবলের প্রথম মেগাস্টার তিনি। জনপ্রিয়তার নজির নিয়ে আছে নানান গল্পও। শুধু তাঁর ছবি আটকানো খামে ভক্তদের লেখা চিঠি ঠিকানা ছাড়াই পৌঁছে যেত তাঁর বাড়িতে। সেই সময়ের ডামাডোলের বাজারে গভীর রাতে নাকা চেকিংয়ের সময় ‘আমি চুনী গোস্বামী’ বললেই স্যালুট করে গাড়ি ছেড়ে দিত পুলিশ। অনেক পরে মোহনবাগান ক্লাবের কর্মকর্তা হিসাবে গিয়ে দিল্লি বা কেরলে দল জেতায় ফুটবলারদের ছেড়ে তাঁকে মাথায় তুলে নেচেছে দর্শক– প্রাক্তন ফুটবলার সুব্রত ভট্টাচার্য শুনিয়েছেন সেই গল্পও। ভারত তথা বাংলা আক্ষরিক অর্থেই হারালো একজন কিংবদন্তিকে।

 ভারতীয় ফুটবলের ত্রিরত্ন।

পিকে-চুনী-বলরাম, ময়দান কাঁপানো ত্রিরত্নের প্রথম দুজন চলে গেলেন পরপর দুই মাসে। মাঠটা যেন দিন দিন খালি হয়ে যাচ্ছে এক এক করে। তবু আপামর ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল থেকে যাবেন চুনী গোস্বামী। সবশেষে অভিন্ন হৃদয় বন্ধু পিকে-র সেই কথাটি দিয়েই শেষ করি, তিনি বলতেন– গোঁসাই-ই সেরা‌।

বিদায় চুনী গোস্বামী।

 

Facebook Comments