‘মুহাররম’ নিয়ে দু’চার কথা | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

‘মুহাররম’ নিয়ে দু’চার কথা

আতিউর রহমান

মহরম নয়; শব্দটি ‘মুহাররম’৷ ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাসের নাম৷ মুহাররমের শব্দগত অর্থ হল পবিত্র বা সম্মানীয় বা মর্যাদাপূর্ণ৷ আর এই মাসের দশম তারিখ “আশুরা” নামে বিশেষভাবে পরিচিত। আমরা যে ছুটিটা ভোগ করি সেটা আসলে আশুরার ছুটি৷ এই ‘আশুরা’ আসলে কী? ইসলামের ইতিহাসে এর তাৎপর্য কী? আরবী “আশারা” শব্দ থেকে আশুরার উৎপত্তি। আশারা মানে দশ, আর আশারাকেই বিশেষ সম্মান সহকারে ‘আশুরা’ বলা হয়। বহুকাল আগে থেকেই ১০ই মুহাররম তথা আশুরার দিনটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে ইসলাম মানসে। এই মাসের সঙ্গে জুড়ে আছে অনেক বিজয় আর গৌরবময় ঐতিহ্যের স্মৃতি। এ মাসের কথা উল্লেখও রয়েছে পবিত্র কুরআনে। পবিত্র আল কুরআনে সূরা তাওবার ৩৬ নং আয়াতে বর্ণিত আছে, যে মাসগুলিতে  যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম করা হয়েছে তার মধ্যে মহরম অন্যতম। বহুবিধ কারণে এ মাসটি মুসলমানদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মানবতার দিশারী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) জগতবাসীর প্রতি তাঁর দায়িত্ব অর্থাৎ মানুষকে শান্তির পথে আহ্বান শুরু করেছিলেন এই মুহাররম মাসে। এই মাসের ১০ তারিখ বা আশুরার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর এক ভয়ংকর, বীভৎস, নিষ্ঠুর, নির্মম ও কলঙ্কজনক ঘটনা।  মুহাম্মদ (সাঃ) এর মৃত্যুর মাত্র পঞ্চাশ বছর পর ফুরাত নদীর তীরে কারবালার কংকরময় প্রান্তরে তাঁর অন্যতম প্রিয় দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রাঃ) তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মোয়াবিয়া পুত্র এজিদের সঙ্গে অসম যুদ্ধে ৭২জন সৈন্যসহ শহীদ হন। অবশ্য কারবালার এই করুণ ট্র্যাজেডির পরেই ইসলাম নবরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে বলেই ইসলামী গবেষকদের বিশ্বাস। তাঁদের মতে ‘কারবালার এই আত্মত্যাগের পরেই ইসলাম আরও প্রাণবন্ত হয়েছে’। তাই আশুরার দিন নবীজির প্রিয়তম দৌহিত্র হজরত হোসাইন(রাঃ)-এর মৃত্যু ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে অন্যমাত্রা এনে দিয়েছে৷

প্রশ্ন হল হযরত হোসাইন(রা)এর মৃত্যুর কারণ কী? আমরা জানি এজিদের সঙ্গে  হোসাইন(রাঃ) এর যুদ্ধ৷ কিন্তু যুদ্ধের কারণ কী?  হিজরী ৬০ সনে পিতার মৃত্যুর পর এজিদ বিন মুয়াবিয়া নিজেই নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসাবে ঘোষণা করেন। কিন্তু তিনি ছিলেন পথভ্রষ্ট৷ ইসলামে যেখানে মদ্যপানকে চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাকে তিনি বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। এছাড়া, আরও কিছু অবৈধ কাজকে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন৷ মোটের ওপর শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী, যাকে বলে জালিম৷ এই সকল কারণে হজরত হোসাইন(রাঃ) শাসক হিসেবে এজিদকে মানতে অস্বীকৃত হন৷ যার ফলশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত  কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয়৷ এই যুদ্ধেই শিমার নিজে ইমাম হোসাইনের(রাঃ) কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে তাকে হত্যা করে। আর সেই বেদনাহত দিনটা হল হিজরী ৬১ সালের ১০ই মুহাররম অর্থাৎ আজকের দিনটা৷

১০ই মহরম বা আশুরা ইসলামের ইতিহাসে কারবালার নিষ্ঠুরতম ঘটনার ছাড়াও যেসব কারণে গুরুত্বপূর্ণ  সেগুলি হল

১৷ আজকের দিনেই আসমান ও জমিন সৃষ্টি করা হয়েছিল,

২৷ পৃথিবীর প্রথম মানব আদম(আঃ)কে সৃষ্টি করা হয়েছিল

৩৷ নবী মুসা (আঃ) এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

৪। হজরত নুহ (আঃ) কিস্তি ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিলেন এবং তিনি জুদি পর্বতশৃঙ্গে নোঙর ফেলেছিলেন এইদিনেই।

৫। এই দিনে হজরত দাউদ(আঃ)-এর তওবা কবুল হয়েছিল, নমরুদের কবল থেকে হজরত ঈব্রাহীম(আঃ) উদ্ধার পেয়েছিলেন

৬। হজরত আইয়ুব (আঃ) দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলেন।

৭। এইদিনে হজরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ উর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। আবার হাদিসে বর্ণিত আছে যে ‘১০ই মহররম কেয়ামত সংগঠিত হবে’ (আল হাদীস)। অবশ্য উপরোক্ত ঘটনাগুলোর কোনো কোনোটির সঙ্গে গবেষকরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন ৷

উপরোক্ত ইতিহাসের নিরিখে বোঝা যায় যে বিভিন্ন কারণে আজকের দিনটা ইসলাম জনমানসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন৷ তবে কারবালার ঘটনার পর থেকে এদিনটি অত্যন্ত শোক ও বেদনার সঙ্গে তামাম মুসলিম বিশ্বে পালিত হয়৷

এখন আমরা দেখতে অভ্যস্ত বড়ো বড়ো লাল সবুজ পতাকা,হাতে অস্ত্র,মুখে শোকগীতি (মর্সিয়া) এবং পাগলের মতো করে হায় হোসেন, হায় হোসেন (মাতম) করতে করতে মিছিল(তাজিয়া)৷ মানুষের ভিড়৷ একসাথে অনেক মানুষের হাতে অস্ত্র৷ বিভিন্ন জেলায় এবং শহর কলকাতায় এ ধরনের তাজিয়া বা মিছিল খুব চর্চিত একটি বিষয়৷ মুর্শিদাবাদের লালবাগে তো আশুরা পালনের জন্যই নবাবী আমলে ইমামবাড়া বা ইমাম বাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ এইরকম ইমাম বাড়ি আমাদের বাংলা এবং বাংলাদেশে অনেকগুলো রয়েছে৷ এই সব স্থলকে আশ্রয় করে আজকের দিনের শোকাবহ রূপ জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়।

ইসলামী  নিয়ম অনুযায়ী ধর্মপ্রাণ মুসলমান আজকের দিনটাকে পালন করেন রোজা,নামাজ, দোয়াদরুদ, গরীব অসহায় হতদরিদ্র মানুষকে দান খয়রাত ইত্যাদির মধ্য দিয়ে৷ মুহাররম পালনে লাঠি খেলা ,জারি গান ইত্যাদি মনোরঞ্জনকর দিকও দেখা যায়৷ এগুলি মূলত লোকাচার৷  এই লোকাচারের হাত ধরে অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সম্মেলনের যে একটা ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে এ কথা স্বীকার করতেই হয়৷ এমনকি, এসব লোকাচারে অন্য ধর্ম সংস্কৃতির  প্রভাব আছে একথাও স্বীকার করতেই হবে। তবে, অস্ত্র কোনভাবেই মানুষের মনে  সুপ্রভাব ফেলেনা৷

১০ই মহরম বা পবিত্র আশুরা আসলে ত্যাগ, তিতিক্ষা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিক্ষা দেয় আমাদের৷ সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে এবং জালিমের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে সোচ্চার হওয়ার সাহস জোগায়৷

 

 

Facebook Comments