হয়ত বেঁচে গেলেন। অতঃপর? | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

হয়ত বেঁচে গেলেন। অতঃপর?

আবু সিদ্দিক
পরিচিত এক অধ্যাপক দাদা আমাকে লিখেছেন, ‘বাংলার মুসলমান আর বাংলার বাকিরাও এইটুকু বোঝে যে বিজেপি নামক আদ্যোপান্ত সাম্প্রদায়িক দলটাকে আটকাতে পারলে আপাতত অন্তত বেঁচে থাকাটা সম্ভব, সেটা সহজে ভোটবাক্সে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলার সাধারণ মানুষকে শতকোটি প্রণাম।আজকে কে জিতলো, তৃণমূল ভালো না খারাপ, আব্বাস কতটা সঠিক পছন্দ ছিলো, অথবা ভবিষ্যৎ কী—এই সমস্ত তর্কই অবান্তর। বাকি তর্ক, লড়াই—সব থাকলো। পরে লড়ে নেওয়া যাবে। আপাতত বিজেপি হেরেছে। সাম্প্রদায়িকতা হেরেছে। বাংলার মানুষ শ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারবে—এইটেই সবচাইতে বড় কথা। আশার কথা। ভরসার কথা। আর কিছুকাল না হয় বেঁচেই থাকি, আমি তুই আমরা সবাই, বাঁচার আনন্দে।’
২০২১ নয় ২০১৮ এ প্রকাশিত ‘বাংলার মুসলমান’ গ্রন্থে দাদার একথাটিই আমি লিখেছিলাম, ‘তাইতো শুনতে হয়, এখানে (পশ্চিমবঙ্গে) আর কিছু হোক বা না হোক মুসলমানরা কিন্তু শান্তিতে আছে। তা জীবন হারানোর থেকে সর্বস্বান্ত হয়ে শান্তিতে বাস করা তো ঢের ভালো। শিক্ষা নেই, অর্থ নেই, আত্মমর্যাদা নেই।আছে শুধু জড় জীবের ঘন কালো তমসাচ্ছন্ন নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায় সামগ্রিকভাবে হিন্দুদের তুলনায় অনেকটাই খারাপ অবস্থায় আছেন। অন্য রাজ্যের তুলনায় হিন্দু মুসলমানের অবস্থার ফারাক এখানে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশী। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে না, ফলে মুসলমানরা অন্য রাজ্যে যেমন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, এখানে তার সম্ভাবনা কম, এই আত্মতুষ্টির আড়ালে লম্বা-চওড়া ফাঁকগুলি আর হয়তো পুরোপুরি ঢাকা যাবে না।”1
প্রাণে বেঁচে থাকাটা বাংলার মুসলমানদের কাছেই বরাবরই একমাত্র চ্যালেঞ্জ। আর এক বন্ধু খুব সুন্দর বললেন, ‘মুসলমানরা কখনও নিজেদের আত্মনির্ভরতা বা ক্ষমতায়নের দিকে তাকিয়ে ভোট দেয় না। তাদের কাছে সেই অপশন কখনও ছিল না। আজও নেই। ভবিষ্যতেও থাকবে না। তারা ভোট দেবে শুধুমাত্র দাঙ্গা বা মৃত্যুকে সাময়িকভাবে ঠেকিয়ে রাখতে।’ দেখুন আমি রাজনীতির ছাত্র নয়। তাই আমার এ কথাগুলিতে অপরিপক্কতার স্বাদ পেতে পারেন। আপনারা যারা রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিত বলে দাবি করেন তাঁদের কাছ থেকে মূল্যবান বক্তব্য শুনতে আমি কান পেতে থাকবো।
মুসলমানদের এই প্রাণে না মেরে ধুক ধুক করে বাঁচিয়ে রাখার খেলায় ডান- বাম- অতিবাম সবাই বরাবরই ভীষণ পারদর্শী।
“One should not judge political parties by the labels they wear on their lapels or by the highsounding manifestoes issued by them, but by their actions. I will concede that Muslims have never had it as bad as now, when the BJP is in power. But they were never allowed to flourish under Congress rule either. Indira Gandhi and then Rajiv used the Muslim community as a vote bank. They were not interested in their future as Indian citizens. They ensured that like the Dalits, Indian Muslims remained poor and insecure, so they could be fooled into seeing the Congress as their only saviour….By encouraging regressive mullahs and orthodox leaders and treating Indian Muslims as a homogeneous mass, the Congress consigned the whole community to an intellectual and social ghetto. The Muslim closed his mind, he withdrew into himself as a tortoise withdraws into its shell. This helped the BJP demonize the community.”2
এ তো গেল সর্বভারতীয় কংগ্রেস দলের কথা। আসুন, মুসলমান ও আদিবাসীদের নিয়ে ভদ্রলোক বামেদের বাঁচিয়ে রাখার খেলার ঈষৎ হদিশ পাবেন সন্তোষ রাণার লেখায়,
“বাংলার ভদ্রলোকেরা বিহারের উঁচুজাতির মতো ছোঁয়াছুঁয়িতে তত বিশ্বাস করে না। সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ের ‘সদগতি’ দেখবার পর এটাকে তাঁদের অবাস্তব মনে হয়। বিয়ে-থার ব্যাপারেও তাঁরা অনেক উদার। অন্তত ভদ্রলোক স্তরের মধ্যে অসবর্ণ বিবাহ প্রায়ই চোখে পড়ে। বন্ধুকধারী দল বানিয়ে নিম্নবর্ণের ঘর জ্বালাতেও তাঁদের দেখা যায় না যেমনটা বিহারে আকছার চোখে পড়ে। কিন্তু ভদ্রলোক ও ছোটলোকদের মধ্যে শ্রমবিভাজনটি অপরিবর্তিত রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের মতো দক্ষতা ভারতের অন্য কোন রাজ্যের উঁচুজাতিরা দেখাতে পারেননি। পশ্চিমবাংলার মোটামুটি ভাল মাইনের চাকরির নব্বই শতাংশ ও তার বেশি এই ভদ্রলোকদের দখলে। অপরদিকে চাষবাস, মাছধরা, হস্তশিল্প, মাটিকাটা, ইটভাটা, রাজমিস্ত্রি ও জোগাড়ে ইত্যদির ন্যায় কায়িক শ্রমের কাজগুলিতে অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখলেও এই ভদ্রলোকদের দেখা পাওয়া যায় না। এগুলি মুসলমান, আদিবাসী, তফসিলি জাতি ও অন্যান্য পশ্চাদপদ (পড়ুন পিছিয়েরাখা) জাতির হিন্দু ও মুসলমানরা।”3
এক্ষেত্রে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ ভূমিকা আছে। আর এই ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীদের বেহাল দশার আত্মসমীক্ষার দিকটিই সেখ মুজিবর রেহমান সম্প্রতি দ্যা হিন্দু তে এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘The Secular narrative of Bengali intelligentsia will continue, no doubt. But it is also time to introspect and ask why it failed to be adequately organic, and failed to stop the obituary of secular Bengal from being written under its nose.’4 আশা দুরাশা হতে বাধ্য কি না তা আগামি দিন বলবে! এখন দেখার সময়। রাখঢাক অনেক হয়েছে। খেলা এখন সামনে সামনে।
আজকের দিনে যারা কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলছেন শুধুমাত্র এই ভেবে যে মো-শার বিজয়রথ বাংলা থামিয়ে দিয়েছে, দিদিই একমাত্র উজ্জ্বল বিজেপি বিরোধী মুখ সারা ভারতবর্ষে, আমি আপনাদের সাথে একশো শতাংশ একমত। দ্বিমতের কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না। এবং আমার নেইও। শুধু শুনুন খুশবন্ত সিং-এর বিশ্বাসের কথা আরও একবার কারণ বাংলার বিধানসভার আসনে এখন বিজেপি ক্ষমতাশালী বিরোধী দল।
A movement built on hate can only sustain itself by continually creating fear and strife. Those of us today who feel secure because we are not Muslims or Christians are living in fool’s paradise. The Sangh is already targeting Leftist historians and ‘Westernized’ youth. Tomorrow it will turn its hate on women who wear skirts, people who eat meat, drink liquor, watch foreign films, don’t go on annual pilgrimages to temples, use toothpaste instead of dant manjan, prefer allopathic doctors to vaids, kiss or shake hands in greeting instead of shouting ‘Jai Shri Ram…’ No one is safe. We must realize this if we hope to keep India alive. (The End of India, p. 73)
আশা করি যেসব শিক্ষিত উদার সংস্কৃতিবান বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ তথা আরও চুয়াত্তরটি বিধানসভার হিন্দু ভাই বোনেরা বিজেপির হাত শক্ত করেছেন, নিশ্চয় সব জেনে বুঝেই করেছেন। দেখবেন মুসলমানদের ঘর দখল করতে গিয়ে আপনার ঘরটি অনলে ভস্মীভূত না হয়। তখন কিন্তু কেঁদে কূল পাবেন না। কারণ ঘর আবার তৈরি করার জন্য মুসলমান রাজমিস্ত্রিরা আর তখন বেঁচে থাকবে না হয়তো।
বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন তাঁরা তাদের আদর্শ বাংলার মানুষদের সামনে আরও বেশি বেশি করে তুলে ধরবে। এবং একাজের আর এস এস এর শাখাগুলি সক্ষম হবেন, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। নীরদবাবু বলেছেন বাঙালির হিন্দুত্ব যতটা না হিন্দু ধর্মের প্রতি ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয়, তার থেকে ঢের বেশি তার মুসলমান বিদ্বেষের থেকে।5 মুসলমানদের কলঙ্কিত করতে, তাদের নানাবিধ অবদান ভারতের ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে এরা বদ্ধপরিকর। বাংলার মানুষ রবীন্দ্রনাথ সুভাষ যত ভুলবে ও গুরু গোলওয়াকার ও সাভারকারের দিকে আকর্ষিত হবে ততই বাংলার উদারতার মৃত্যু ঘটবে। ঘটতে বাধ্য। সেখানে আজ পঁচাত্তর কাল দুশো পঁচাত্তর হবে না তার ঠেকা কে নেবে। মুসলমানরা না নিশ্চয়। কারণ এরা ডাঙ্গায় লাফ দিলে আগুনে পুড়বে, আর জলে নামলে কুমিরে খাবে। ভাবুন গর্বিত হিন্দু, ভাবুন গর্বিত মুসলমান। আমরা কেউ কৃষক নই, আমরা কেউ মজুর নই, আমরা কেউ শ্রমিক নই, আমরা কেউ মানুষ নই। আমরা শুধু হিন্দু-মুসলমান।
এখন একটু পেছনের দিকে তাকাতে অনুরোধ করি। দেখুন খোদ দিদির আমলেই সঙ্ঘের কাজ কর্মের বাড়বাড়ন্ত কি রকম হয়েছে এই বাংলার বুকে। আর আর এস এসের শক্তি বৃদ্ধি মানেই ফ্যাসিস্টদের শক্তি বৃদ্ধি একথা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না। ভাবুন। ভাবা প্র্যাক্টিস করুন।ধর্মীয় মেরুকরণের এই বিষ রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের আপামর মানুষকে খাদের কিনারে নিয়ে যাবে না তো একদিন?
“The RSS’ work in Bengal can be divided into three phases. The first between 1939 and 1953, offered them a mix of favourable and unfavourable conditions. The second, and the longest, from 1953 to 2008, was mostly about working in difficult conditions with little hope of the situation turning favourable. The third beginning in 2009 Lok Sabha election, when the Left front suffered a massive setback, winning only 15 seats out of 42. Meantime more than two dozen organizations affiliated with RSS had built up their networks in different parts of the state. And from 2011 when TMC came to power and 2020 number of social work project conducted by these organizations were more than double (less than 200 in 2011 to 450 in 2020). As each RSS outfit grew, the cumulative strength of the Sangh Parivar—showcased in massive rallies on the occasion of Ram Navami in 2017—announced the arrival of the RSS in Bengal even before the BJP marked its arrival. Now in Bengal 1600 shakhas are functioning with regular activities.”6
আজকে যদি রেজাল্ট উল্টো হতো তাহলে কী হতো? নিশ্চয় হিন্দু ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ওয়ালাদের ঘর বাড়ি ছারখার হতো না অতটা যতটা হতো মুসলমানদের। ক্ষতি সবদিক দিয়ে মুসলমানদের। বিজেপি আসুক আর না আসুক। তবে আবার বলছি জানে তো বেঁচে গেলাম পাঁচ বছরের মতো। পরের কথা পরে হবে। আসুন বুক ভরে অক্সিজেনযুক্ত বাতাস নিই। আর এক স্বরে বলি বাঁচা গেলো। কবির কথায় শেষ করি আজ, ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ কিন্তু একে কি সত্যিই বাঁচা বলে? বাংলার মুসলমানরা কি এভাবেই পালিয়ে পালিয়ে বাঁচবে? এ প্রশ্ন এখন অপ্রাসঙ্গিক, অবান্তর, অতিবাস্তব, অনভিপ্রেতও বটে। ভেবে খুশি যে কিছু কথা এখনও বলা যাচ্ছে। এটিই বা কী কম পাওনা!

Reference:

1. আবু সিদ্দিক, বাংলার মুসলমান, কলকাতাঃ সোপান, ২০১৮, পৃষ্ঠা ১২৮।

2. Khushwant Singh, The End of India, New Delhi: Penguin, 2003, pp. 113-115.

3. সন্তোষ রাণা, প্রবন্ধ সংগ্রহ, কলকাতাঃ গাংচিল ২০১৯, পৃষ্ঠা ১৪৪।

4. https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/in-bengal-its-advantage-bjp/article34256061.ece

5. নীরদচন্দ্র চৌধুরী, আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ, অখণ্ড সংস্করণ, কলকাতাঃ মিত্র ও ঘোষ, ১৪২১, পৃষ্ঠা ১০১।

6. https://theprint.in/opinion/from-nowhere-to-everywhere-how-rss-grew-in-west-bengal-to-benefit-bjp/645542/

মতামত লেখকের নিজস্ব। 

Facebook Comments