নারী, তুই পাপিষ্ঠা! | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

নারী, তুই পাপিষ্ঠা!

মঞ্জরী ভট্টাচার্য

পৃথিবীর সব মানুষ মিলেমিশে যাবে, পরিবার, রাষ্ট্র, ধর্ম – কেউ কোনো দেয়াল তুলবে না – এরকম একটা অবস্থান আজ শুধু কল্পনাই করতে পারি আমরা। সদরে অন্দরে যখন জাঁকিয়ে বসেছে লিঙ্গ বৈষম্যে বিভাজিত পুরুষ-নারীর জীবন ও জগৎ- তখন ভারতবর্ষের প্রত্যেক দেশের বকুল-পারুলদের মা, দিদিমা পিতামহী আর প্রপিতামহীদের সংগ্রামের ইতিহাসকে যে পাঠানো হবে অন্ধকার নির্বাসনে, তাতে আর আশ্চর্য কি! আজ থেকে প্রায় আটবছর আগে স্বাধীনতা দিবসের মাত্র কিছুদিন আগে এক কিশোরী কলেজ ছাত্রীকে প্রকাশ্য জনপথ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে যখন নির্মমভাবে গণধর্ষণ চালায় উন্মত্ত কিছু পুরুষ, সেদিন মনে হয়েছিল পটকাবাজি পুড়িয়ে স্বাধীনতা দিবসের প্রাককালে আধুনিক সভ্যতার গালে কে যেন ঠাস করে চড় মেরে নিশ্চুপ করে দিল সবকিছু। স্বাধীনতা পালনের হুজুগে আসলে এভাবেই প্রতিবছর হারিয়ে যায় নারী স্বাধীনতার প্রাথমিক শর্তগুলি । অথচ দুটোর কোনোটাই কিন্তু পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। ভারতের মতো একটি স্বাধীন দেশে শুধুমাত্র পুরুষপ্রতাপকে মদত দিতে গিয়ে ধর্মপ্রতাপ আর রাষ্ট্রপ্রতাপ একসঙ্গে জোট বাঁধে একটি মেয়ের ইজ্জত কেড়ে নিলে! কিসের স্বাধীনতা আর কিসের আধুনিকতা আমাদের?
মেকী স্বাধীনতা পালনের আস্ফালনকে ভেঙে খানখান করে প্রতিদিন জয়ী হয় ক্ষমতার পাশবিকতা- মানুষের শিক্ষা, সুস্থ রুচিবোধ, চিত্তবোধকে ছাপিয়ে জয়ী হয় মানুষের আদিম জান্তবতা। জয়ী হয় তার কারণ, সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক আজও অধিকাংশই ক্ষমতার সম্বন্ধে নির্ণীত। মেয়েরা আজও যৌনবস্তু বলেই স্বীকৃত, আর সে কারণেই যৌননিগ্রহের ভয়ে শুধু যে তার প্রকাশ্য পথেঘাটে ঘুরে বেড়াবার স্বাধীনতা নেই তা-ই নয়; ঘরেও নারী অসুরক্ষিত – যদি সে কারো আশ্রিতা হয়, যদি সে তরুণী হয় কিংবা যদি সে সহায়সম্বলহীন কোনো নারী হয়। ক্ষমতার সম্বন্ধ যখন অর্থনৈতিক, সামাজিক বৈষম্য ডেকে আনে তখন সেটা বুঝতে পারি, কিন্তু যখন আক্রমণের বিপরীতে থাকে শুধুই মেয়েরা আর সেই আক্রমণটা হয় যৌন; তখন একটি দেশের, একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বড় একপেশে মনে হয়। এই স্বাধীন দেশে প্রকাশ্য জনপথ থেকে অপহরণ করে একটি নাবালিকাকে ধর্ষণ করা হয়, আট বছরের শিশুকন্যা দাদুর হাতে নিগৃহীতা হয়, কন্যাসমা পুত্রবধূ সম্ভ্রম হারান শ্বশুরের উদগ্র লালসার কাছে, আটত্রিশ বছরের শ্রমিক মহিলাকর্মী সকালে কারখানা যাবার পথে ধর্ষিতা, বে-আব্রু হয়ে পড়ে থাকেন নির্জন পথের ধারে এমনকি আটান্ন বছরের প্রৌঢ়া মহিলাও রেহাই পাননা উন্মত্ত লোভী ‘খাদক’ এক পুরুষের কামনার হাত থেকে। শৈশব থেকে বার্ধক্য কোথাও যৌন নিগ্রহ থেকে মুক্তি নেই নারীর।
মুক্তি নেই কারণ, যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষই একমাত্র কর্তা। নারীর ইচ্ছে-অনিচ্ছের তোয়াক্কা না করে খুব সহজেই তাকে ভোগ্যবস্তু বানিয়ে ফেলা যায়, হয়তো আক্ষরিক ভাষায় এরই নাম ধর্ষণ। সেক্ষেত্রে প্রকাশ্য জনপথে, ট্রামে, বাসে, হাটে, ময়দানে নারীর শ্লীলতাহানির জন্য পুরুষের ক্ষমতার আস্ফালন তো বহু দূরবর্তী কল্পনা – সমাজ অনুমোদিত পবিত্র বিবাহ বন্ধনেও কি সবসময় থাকে মেয়েদের ব্যাক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনো মূল্য ? থাকতে পারে না যদি সেই সম্বন্ধের আড়ালে কোথাও ক্ষমতার ব্যাকরণ নিহিত থাকে। এ-কারণেই বলেছি, এই খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক থেকে নারীর মুক্তি নেই কোথাও। ইদানীং প্রায়ই অনেককে বলতে শুনি, কিছু পোষাক নাকি প্রলুব্ধ করে পুরুষকে; এমনও শোনা যায়, পারিবারিক সংস্কার রোধ করতে পারে ধর্ষন। পরোক্ষে অপরাধীর পক্ষ সমর্থন করে যারা এভাবে তৈরি করতে চান সমাজের একপেশে নিয়ম-কানুনগুলো, তাদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, ফুলের মতো নিষ্পাপ পাঁচ-ছ’বছরের শিশু কিভাবে প্রলুব্ধ করতে পারে পুরুষের দৃষ্টিকে? পারিবারিক শিক্ষা-সংস্কার কি শুধুই একচেটিয়া মেয়েদের জন্য? আসলে আমরা নিজেদের যতই “progressive” বলি না কেন, সেই জায়গায় পৌঁছুতে আমাদের এখনো ঢের বাকি, যে মূল সমস্যাটা পোষাক, সাজসজ্জা থেকেও আরও অনেক গভীরে – মানসিক দৃষ্টিভঙ্গীর ভেতরে। শালীন, ভদ্র, সভ্য পোষাকেও যে নারীরা নিগৃহীতা হন পথে-ঘাটে, তার কারণ সমাজে আজও নারীরা যৌনসর্বস্ব, যৌনসামগ্রী বলেই বিবেচিত। ক্ষমতার এই আস্ফালনে কোনো মানবিক সম্পর্ক যে আদৌ তৈরি হতে পারে না সেই বিষয়টিই ভেবে দেখা হয় না কখনো।
আর ঠিক এই কথাটিই মাথায় ঘুরপাক খেতে খেতে চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে, তা একদম অন্যরকম দৃশ্য। রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’-র সেই মুহুর্ত, যেখানে প্রকৃতি জলদান করছে পিপাসার্ত আনন্দকে, জলের রূপকে নারীর অপার প্রেম নেমে আসছে তৃষিত প্রেমিকের হৃদয়ে; নাট্যবিষয়ের মূল্যায়নে এমন ভাবনাও উস্কে দিয়েছেন অনেকে। সেই বিতর্কে প্রবেশ না করে এভাবেও বলা যায়, ভাগ্যবিড়ম্বিত, চিরলাঞ্ছিত একটি নারীর জীবনে শুধু ভালোবাসা অর্জনের নয়, ভালোবাসা প্রদানেরও যে সূক্ষ্ণ অনুভূতি জড়িয়ে থাকতে পারে; নারী-পুরুষের প্রেমের সম্বন্ধে নারী শুধু যে যৌনবিষয় মাত্র নয়, হয়ে উঠতে পারে বিষয়ীও – নৃত্যনাট্য সৃষ্টির অবকাশকালে রবীন্দ্রনাথের সূক্ষ্ণ অবচেতনে সেরকম কোনো প্রতিক্রিয়া রঙ ছড়িয়েছিল কি না আমরা জানি না, কিন্তু এতোগুলো বছর পেরিয়ে আসার পরও যখন নারীকে পুরুষের সমকক্ষতা দাবি করতে হয় লিঙ্গ বৈষম্যের বিপরীতে – তখন এরকম একটি অমোঘ প্রেমের দৃশ্য আমাদের স্বপ্ন দেখায় শ্রেণী-বৈষম্যহীন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। ক্ষমতা ও বৈষম্যের বাইরে গিয়ে যে সম্পর্ক তৈরি করবে সমাজে মানবিক সমতা; বাস্তবে এমন সম্পর্ক আকাশ-কুসুম কল্পনা মনে হলেও রবীন্দ্রনাথ বলেই বোধহয় সেই কল্পনার অঙ্কুরোদ্গম সম্ভব হয়েছিল।
আপনারা হয়তো বলবেন মেয়েদের অবরোধের বন্ধন আজ অনেকটাই শিথিল, কিন্তু নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করেও ক’জন ধর্ষিতা নারী ফিরে যেতে পারেন সমাজের মূলস্রোতে? কারণ, বাঁচার অধিকার চাইতে গেলে সমাজই তাকে তর্জন করে হুঁশিয়ার করে দেয়–
“তোমার শরীরে অন্য পুরুষের থুতু লেগে আছে, অন্য পুরুষ-থুতুর গন্ধ।”
তার বঞ্চিত জীবনের খোঁজ রাখি আমরা ক’জন ? অনিবার্যভাবে তখন উঠে আসে যে প্রশ্নটি তা হলো, স্লোগানে স্লোগানে পথ অবরোধ করে, মঞ্চ-সভা-সমিতি করে, সহরে প্রশাসনিক নিরাপত্তার কড়া বেষ্টনী চেয়ে নিগৃহীতার জন্য সুবিচার চাওয়া হয় যখন, সবকিছু মিটে গেলে সেই মেয়েটির একটি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ খোলা থাকে কোথায়? সহজ খোলা পথ হয়তো নেই, কিন্তু প্রতিরোধের ভাষা তো আছে, আছে আত্মসুরক্ষার হাতিয়ার। যদিও সেই ভাষাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার কূটকৌশল সমাজে নতুন নয়, তবু এই আগুন লাগা পৃথিবীতে মেয়েদেরই খুঁজে নিতে হবে প্রতিবাদের ভাষা– ‘নয়তো মরতে হবে পুড়ে’।
এই কথাগুলোর মধ্যে প্রখর প্রতিবাদ যেমন আছে, তেমনি আছে এক নতুন জীবনবোধের আভাস । নতুন ভাষা খুঁজে নেওয়া মানে তো নতুন বিশ্বাস, নতুন ভালোবাসা খুঁজে নেওয়া ।                                                                                                                                  “ঘর/ আমার ঘর!/ কী করে, খুঁজে পাবো আমার ঘর!”

– এসব পংক্তির মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট মেয়ের কথা নেই, আছে প্রত্যেকটি মেয়ের দেখা স্বপ্নের কথা– যারা নিশ্বাস ভরে নতুন জীবন নিয়ে বাঁচতে চায়; হতে চায় এক নতুন আদমের সঙ্গিনী; প্রতীক্ষা করে সেই পুরুষের জন্য যার ভালোবাসায় রোমাঞ্চিত হবে সে। অবিশ্বাস নয় বিশ্বাসই করতে চায় সে, তার গর্ভস্থ সন্তানের উপর থাকবে তার দয়িতের করতলের স্পর্শ। কিন্তু এই কল্পনা যতদিন না বাস্তবায়িত হয়, ততদিন দেখতে হবে আমাদের এই দৃশ্য –

“আম্রপালী পালিয়া যায়, পেছনে তার সমাজ তাড়া করে/  আম্রপালী বাঁচতে চায়, সমাজ চায়  প্রমাণলোপ হোক।”

অস্তিত্ব- দ্বিতীয় সংখ্যা 

 

Facebook Comments