ট্রাম্প তালিবান তামাশা ৪ | The Background

Saturday, October 16, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

ট্রাম্প তালিবান তামাশা ৪

আবু সাইদ আহমেদ

পর্ব ৪

আলকায়েদা চতুরভাবে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সরিয়ে স্থানীয় বাহুবলীদের বসাচ্ছিল। নেক মহম্মদ আর বাইতুল্লাহ মেহসুদের মত লোকেদের অর্থ আর অস্ত্রের যোগান দেওয়া হচ্ছিল। কিছু দিনের মধ্যেই সামরিক অভিযান আর সাকাই ও সারারোগার মতো শান্তিচুক্তির মধ্যেও আলক্বায়েদা নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করছিল। উজবেকিস্তানের ইসলামি তেহরিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা তাহির ইয়ালদোচিভ আলকায়েদার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিলেন। শেখ এসা আলমিশরীর নির্দেশানুসারে, তিনি বায়তুল্লাহ মেহসুদকে বোঝান যে আসল লড়াই হচ্ছে পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে আর যারা আফগানিস্তানে লড়ছে তারা পথবিচ্যুত। একই সময় মৌলানা দাদুল্লাহর হাত দিয়ে মোল্লা ওমর বায়তুল্লাহ মেহসুদসহ ওয়াজিরস্থানের সকলকে বার্তা পাঠান যাতে অন্য কাজ ছেড়ে সকলে তালিবানের সাথে আফগানিস্তানে লড়াই শুরু করে। পাকিস্তানি তালিবান মোল্লা ওমরের এই বার্তা অগ্রাহ্য করে। আরব, চেচেন, উজবেক এমনকি উইঘুর মিলে প্রায় ৫০,০০০
বিদেশী জঙ্গি ২০০৬এর শুরুর দিকে ওয়াজিরস্থানে জড়ো হয়। এই উইঘুর জঙ্গিদের পাকিস্তান বিরোধী কার্যকলাপে শামিল হওয়া জিনজিয়াং ইস্যুতে পাকিস্তানের নীরবতার অন্যতম কারণ। তাহির ইয়ালদোচিভ আফগানিস্তানে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়ার বদলে পাকিস্তানে সেনার বিরুদ্ধে লড়বার ফতোয়া জারি করেন। আফগান তালিবান এতে ক্ষুদ্ধ হওয়ায় এই বিদেশি জঙ্গিদের সাথে ওয়ানার আফগান তালিবান নেতা মোল্লা নাজিরের সুর্হকদের লড়াই বাধে। এইধরনের লড়াই পরবর্তীতে এড়ানোর জন্য আলকায়েদা সমস্ত পাকিস্তানি তালিবানপথীগোষ্ঠীকে তেহরিক-এ-তালিবানের ঝাণ্ডার তলায় একত্রিত করে। বায়তুল্লাহ মেহসুদ এর প্রথম নেতা নিয়োজিত হোন। হাফিজ গুল বাহাদুর ও মৌলবি ফকির তাঁর নায়েব নিযুক্ত হোন।

মুজাহিদীনদের সাথে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রেগন

এর পরের কয়েক বছর এই অঞ্চলের জন্য ছিল বিভীষিকাময়। লাল মসজিদ থেকে ম্যারিয়ট হোটেল, সন্ত্রাসের তাণ্ডবে প্রাণ হারান ৭০,০০০ সাধারণ মানুষ। নিহত হোন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভূট্টো। ৪৬০০০ বর্গকিমি এলাকা জুড়ে চলতে থাকে সেনা অভিযান। ১৮০০০ সন্ত্রাসী নিহত হয় এবং ৪০০টনের মতো বিস্ফোরক বাজেয়াপ্ত হয়। লেফট্যানেন্ট জেনারেল তারিক খান অপারেশন শেরদিল নামে অভিযান চালিয়ে বাজাউরে জঙ্গিদমন করেন। ৫০০র বেশি সেনাকর্তা প্রাণ হারান। বিতাড়িত হওয়ার পর ৬৫০০এর মত তেহরিক-ই-তালিবান জঙ্গি জামাত উল আহরার ও হিজব উল আহরারসহ অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে আফগানিস্তানে পুনর্মিলিত হয়। তারা তেহরিকইতালিবানের প্রধান মুফতি আবু মনসুর আসিম, ওরফে নুর ওয়ালি মেহসুদের আনুগত্য ঘোষণা করে। এরপর, তেহরিক-ই-তালিবান নয়া জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামী রাজ্য বা দায়েশের আফগান শাখা যা খোরাসান প্রদেশের ইসলামী রাজ্য(ISKP বা খোরাসানি দায়েশ) নামে পরিচিত, তাদের সাথে কৌশলগত আঁতাত গড়ে তোলে। এরা আফগান তালিবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। খোরাসানি দায়েশের প্রথম বাহিনী হাফিজ সঈদ খানের নেতৃত্বে ১৪ই জুলাই,২০১২ গঠিত হয়। পাকিস্তানী তালিবানের নিম্নলিখিত ৮টি সশস্ত্র গোষ্ঠী খোরাসানি দায়েশে যোগ দেয়।
১. হাঙ্গুর খালিদ মনসুর
২. মুখপাত্র শাহিদুল্লাহ শাহিদ
৩. পেশাওয়ারের মুফতি হাসান সোয়াতি
৪. খাইবারের গুল জামান ফাতেহ
৫. কুররামের হাফিজ দওলাত খান
৬. ওরাকজাইয়ের হাফিজ দওলাত খান
৭. ওয়াজিরস্তানের আব্দুল বাসার মেহসুদ
৮. বাজাউরের আবু বকর
আফগান ও পাকিস্তানি তালিবানের আদর্শগত ফারাক বেশ লক্ষণীয় ছিল। পাকিস্তানি তালিবানের দারাদামখেল গোষ্ঠী পেশাওয়ারের আর্মি পাব্লিক স্কুলে হামলা করে। মার্কিন হানায় কাবুলের পর, আফগান তালিবান রেহবারি শুরার অধীনে বহুকেন্দ্রিক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। রেহবারি শুরার আগে থেকেই জালালুদ্দীন হাক্কানি ২০০২ সালে প্রথম মার্কিন বিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি ৪ প্রদেশের ৪৬টি জেলাতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মাসসুলীন নিয়োগ করেন। ২০০৩ এর জুনে রেহবারি শুরা পোশাকিভাবে গঠিত হয়। কিছু বিশেষজ্ঞ একে কোয়েটা শুরা বলে থাকেন কিন্তু দলিলিভাবে এরকম কোন নাম নেই। এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা ছিলেন তালিবানের বরিষ্ঠ নেতারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মোল্লা আব্দুল গণি বারাদর ( তালিবান আমলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী), মোল্লা দাদুল্লাহ, মোল্লা ফারুক, মৌলবি আখতার মহম্মদ মনসুর (প্রাক্তন অসামরিক বিমানমন্ত্রী) আর মোল্লা গুল আগা ইশাকযাই। আফগানিস্তানে মার্কিন ব্যর্থতার বড় কারণ ছিল সেনাকর্তাদের প্রযুক্তি আর অস্ত্রশক্তি নিয়ে কি কৌশল নেওয়া উচিৎ তা নিয়ে বিভ্রান্তি। যার ফলে ভূমিপুত্র তালিবানরা লাগাতার তাদের টেক্কা দিতে থাকে। অন্যদিকে কাবুলের সরকারের অধীনস্থ কর্মীদের লাগামছাড়া দূর্নীতি জনগণের মধ্যে এই প্রশাসনের জনপ্রিয়তা কমাতে থাকে। প্রতিটি জোটসেনাকর্তার নিজের নিজের আলাদা রণকৌশল ছিল। যার পরিণতিতে তালিবানবিরোধী অভিযান কার্যত ১০টি পৃথক যুদ্ধে পরিণত হয়। মার্কিন হানার শুরু থেকে ১৭ বছরে ১৮ জন সেনাপ্রধান নিযুক্ত হোন। তাঁদের নিজেদের প্রত্যেকের ১০০দিনের পরিকল্পনা ছিল। এই রণকৌশলের প্রভেদ জোতের মধ্যে জটিলতা তৈরি করে। যার ফলে তালিবান আবার পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
২০১৬তে গুলবুদ্দীন হেকমাতিয়ারের কাবুল সরকারের সাথে সমঝোতা শান্তিপ্রক্রিয়ার আলাদা অধ্যায়ের সূচনা করে। একই বছর আফগান যুদ্ধ শেষের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৮তে পাকিস্তানে জয়ী হোন তালিবানের সাথে সমঝোতার পক্ষে সওয়াল করা ইমরান আহমেদ খান নিয়াজি। প্রথমে ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক গরম থাকলেও ২০১৯এর জুলাইয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইমরানের জনসভা সব হিসেব উল্টে দেয়। আস্তে আস্তে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বিদায়ের প্রক্রিয়া মসৃণ হতে থাকে। যার ফলশ্রুতিস্বরূপ ২০২০র ২৯শে ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয় দোহা চুক্তি।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক মার্কিন নির্বাচনে পরাজিত। ওবামা আমলের উপরাষ্ট্রপতি ঘাগু রাজনীতিক জোসেফ বাইডেন নির্বাচিত হয়েছেন। ভবিষ্যতে কি হবে তা ভবিষ্যৎই বলবে, কিন্তু বিগত দুই দশকজুড়ে ঘটে চলা ঘটনাবলি কূটনীতি ও সমরবিদ্যার এক অপরিহার্য অধ্যায়ের নিদর্শন রেখে গেছে।

আগের তিনপর্বের জন্য নীচে দেখুন
প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব  তৃতীয় পর্ব
Facebook Comments