ট্রাম্প তালিবান তামাশা-৩ | The Background

Saturday, February 27, 2021

Contact Us

Google Play

ট্রাম্প তালিবান তামাশা-৩

এই বছরটি এক দুঃসহ বছর সবার কাছেই। কারুর কাছে এই সময়টা শেষই হচ্ছেনা, কেউবা ভাবছেন এক লহমায় শেষ হয়ে গেল বছরটা। এর মধ্যেই হয়ে গেল মার্কিন মুলুকে নির্বাচন। সেপ্টেম্বরে আমরা প্রকাশ করেছিলাম ট্রাম্প ও তালিবান তামাশা নিয়ে একটি লেখা। ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্প তো মার্কিন আধিপত্যবাদেরই প্রতীক। সুতরাং তাদের কারসাজিগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখা দরকার। সুতরাং সেই লেখার রেশ ধরে পরের পর্ব।

আবু সঈদ আহমেদ

এই পর্বটিতে যাওয়ার আগে কিছু প্রেক্ষাপট বুঝে নেওয়া জরুরি। যেরকম আফগান তালিবান, আলকায়েদা আর তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তানের(TTP) উৎপত্তি ও তাদের লক্ষ্য ইত্যাদি, কারণ TTP আলকায়েদার মতাদর্শ নিয়ে শুরু হয়েছে। আফগান তালিবান ছিল আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ যা ১৯৯৪এ শুরু হয়। এই সময় মোল্লা ওমর পাকিস্তানের মাদ্রাসায় পড়া ৫৩জন ছাত্রকে নিয়ে কান্দাহারের বিবাদমান তালুকদারদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। ছাত্রদল বা তালিবান নামটি সেই সময় থেকেই পাওয়া। এই সময় দুই অপহৃত বালিকাকে উদ্ধার করে তিনি স্থানীয় রবিনহুড হয়ে যান। সোভিয়েত পতনের পর শুরু হয় গুলবুদ্দীন হেকমাতিয়ার আর আহমদ শাহ মাসুদের গৃহযুদ্ধ, যাতে সাধারণ আফগানরা অতিষ্ঠ হয়ে গেছিলেন। এখন ভাবতে অবাক লাগবে কিন্তু শুরুর দিনগুলিতে আহমদ শাহ মাসুদের সমর্থন ছিল মোল্লা ওমরের প্রতি। হেকমাতিয়ারের বিরুদ্ধে  উত্তরের জোট ১০ লক্ষ ডলার তালিবানকে দেয়। কিছুদিন পরেই তালিবান স্পিন বোলডাক নামের এক ঘাঁটিতে এক অস্ত্রভাণ্ডার দখল করে নেয়। এখানে ১৭টি সুড়ঙ্গে যত অস্ত্র ছিল তাতে ৩ ডিভিশন সেনার রসদ হয়ে যেত। ৯৬এর সেপ্টেম্বরে তালিবান কাবুলের দখল নিয়ে নেয়।

মোল্লা ওমর মোল্লা রাব্বানির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের শুরা তৈরি করেন।

যেখানে আফগান তালিবানের কর্মকাণ্ড ছিল স্থানীয়, আলকায়েদার কার্যকলাপ ছিল বিশ্বব্যাপী।

আলকায়দার উত্থান হয় মক্তব আল খিদমত (পরিষেবার গ্রন্থাগার) থেকে। এই প্রতিষ্ঠান আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযম ১৯৮০র দশকের শুরুর দিকে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে লড়তে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি করেন। আযম ১৯৮৯এ নিহত হোন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হোন সৌদি ধনকুবের ইঞ্জিনিয়ার ওসামা বিন লাদেন যিনি এই সংগঠনকে আলকায়েদায় রূপান্তরিত করেন। যদি না আলকায়েদার উত্তরাধিকার মুসলিম ব্রাদারহুড আর আদি নেতৃত্ব আল জাওাহিরির হাতে না থাকতো, আলকায়েদার গতিপ্রকৃতি হয়তো অন্যরকম হত। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় পর্যন্ত পশ্চিমী গণমাধ্যমের প্রিয়পাত্র ছিলেন ওসামা। কিন্তু সব বদলে যায় উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সৌদি আরব থেকে পশ্চিমী দেশগুলি সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃত হওয়ায়। ১৯৯৮এ কেনিয়া ও তানজানিয়ায় দূতাবাস বিস্ফোরণ পশ্চিমী দেশগুলিতে আলকায়েদাকে পয়লা নম্বর শত্রুতে পরিণত করে। এই সময়গুলোতে তালিবানের অতিথি হয়ে আফগানিস্তানে ছিলেন ওসামা বিন লাদেন।

বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রে বিমানহানার প্রত্যুত্তরে আফগানিস্তানে আক্রমণ শুরু করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। তার কিছু আগেই আফগানিস্তানের উত্তরের জোটের নেতা তালিবান হামলায় নিহত হোন। মার্কিন জোটের কার্পেট বম্বিংএর মোকাবিলায় সেরকম কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পেরে কাবুল ছেড়ে চলে আসে তালিবান। অন্যদিকে কাতারে কাতারে আফগান বাস্তুহারা হয়ে পাকিস্তানের অরক্ষিত সীমানা পেরিয়ে আসতে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের 9/11 Commission Report এর ‘Dissent within the al-Qaeda leadership’এ দাবি করা হয়েছে মোল্লা ওমর মার্কিন বিরোধী হানাগুলির বিরোধিতা করেন। ৯/১১র প্রথম নিন্দা তিনিই করেন। মোল্লা ওমরের প্রমাণ ও নিরপেক্ষ আদালতের দাবির সামনে ওসামাকে হস্তান্তরের দাবিতে অনড় থাকে যুক্তরাষ্ট্র। কিছুদিনের মধ্যেই Operation Jawbreaker শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। গ্যারি শ্যোরেনের নেতৃত্বে ৭ই অক্টোবর ১কোটি ডলার নিয়ে আফগানিস্তানে আসে সিআইএ দল। আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী আধিকারিক আমরুল্লাহ সালেহের সাথে গুপ্তচর আঁতাত গড়ে তোলে সিআইএ। সালেহর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি নাকি আরও বেশি মার্কিন বিমানহানার পক্ষে ছিলেন।

এইসময় জোটবাহিনী আফগানিস্তানের দক্ষিণ ও পূর্বের প্রদেশগুলোতে Operation Anaconda, Valiant Shield, Mountain Lion, Snipe, Dragon Fury, Haven Denial, Warrior Sweep, Mountain Viper, Mountain Resolve, Mountain Sweep প্রভৃতি সামরিক অভিযান চালায়। খাইবারের অপরপ্রান্তে পাকিস্তানে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিপক্ষের পশ্চাদপসারণ আটকাতে কোন স্থলবাহিনীর ব্যবস্থা করেনি। যার পরিণতিতে ডুরান্ড লাইন পেরিয়ে ২৪৯টি পথ ধরে আলকায়েদা পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় ঢুকে পড়ে। জেনারেল মুশারফ ২০০১এর ডিসেম্বরে তোরাবোরার যুদ্ধের পর জেনারেল টমি ফ্রাঙ্কসের কাছে অভিযোগ করেন দেড়শোটি উপত্যকা দিয়ে জঙ্গিরা পাকিস্তানে ঢুকে পড়ছে। এর আগে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বুশ তাঁর বাহিনীকে জিজ্ঞেস করেন, “আমাদের কাছে কি পাক-আফগান সীমান্ত বন্ধ করার কোন উপায় আছে কি?” কাবুলে সিআইএর জঙ্গিদমন কেন্দ্রের আধিকারিক ক্রাম্পটন জবাব দেন, “বিশ্বে কোন সেনাই এটা বন্ধ করতে পারেনা।” ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে মার্কিন হানার সময় বাইকে করে পালিয়ে বেড়ানো হামিদ কারজাই আফগানিস্তানের মসনদে বসেন।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মুশারফ খাইবার, কুররাম আর ওরাকযাইয়ে জঙ্গি অনুপ্রবেশ আটকাতে তিন ডিভিশন সেনা মোতায়েন করেন। মুশারফের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি আইএসআই কর্মীদের সাথেসাথে তালিবান নেতাদেরও কুন্দুজ থেকে ২০০১এর নভেম্বরে উদ্ধার করে আনেন। এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা “Airlift of Evil” বলে থাকেন। কিন্তু এই একই সময়ে মুশারফ আলকায়েদাকে হীনবল করে দেন।

পাকিস্তানে প্রায় ৬৭০ আলকায়েদা সদস্য ধরা পড়ে যার মধ্যে আবু যুবাইদা, খালিদ শেখ, রামজি বিনালশিবহ, ইয়াসির আল-জাযিরি, খালিদ বিন আত্তাশ, ইয়ুলদাশেভ, আহমেদ গাইলানি, আবু ফরাজ, আবু লাইথ যার অন্যতম।

 ফাইল ফটো। 

যেসময় পাকিস্তানের তরফে ডুরান্ড লাইন বরাবর ৬০০কিলোমিটার জুড়ে ৬৬৫টি টহলচৌকিতে ৭৫০০০জন সেনা মোতায়েন ছিল সেখানে মার্কিন জোটের তরফে ২৫০০০ সেনা সম্বলিত মাত্র ৬৯টি চৌকি ছিল যা মোটেই সীমানা পাহারা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না।  শেখ এসার মত আলকায়েদার তাত্ত্বিক নেতারা পাকিস্তানের কাবাইলি এলাকাকে তাদের কৌশলগত আঙিনা হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। তাঁরা সরল স্থানীয় জনতার আতিথেয়তার পাঠানরীতির সুযোগ নিয়ে এঁদের মেহমান হতে থাকেন। আফগানিস্তানে আক্রমণে মার্কিন জোটসঙ্গী মুশারফের সামনে এটা একটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। অর্থনীতি-কূটনীতিতে বিপাকে পড়া মুশারফ যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান আক্রমণের সহায়তা করে ধর্মীয় মহলে চক্ষুশূল হয়েছিলেন। আফগানিস্তান থেকে আসা এই উদ্বাস্তুর ভিড় যার মধ্যে তালিবান জঙ্গিরাও ছিল, মুশারফকে আরও কোণঠাসা করে দেয়। বেশ কয়েকবার প্রাণঘাতী আক্রমণের মুখে পড়েন মুশারফ। তালিবানদের পুরোপুরিভাবে নিকেশ করার আগেই যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে নতুন যুদ্ধ, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে। ফলে অসমাপ্ত যুদ্ধ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে মুশারফের  জন্য। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের আফগান উপজাতি অধ্যুষিত কাবাইলি এলাকায় সেনা অভিযান চালিয়ে নতুন দুশমন তৈরি করেন মুশারফ। এই অভিযানের কঠোর বিরোধিতা করে বিশ্বজয়ী প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান খান অভিহিত হন তালিবান খান নামে। এই অভিযানের পর থেকে পাকিস্তানে শুরু হয় সন্ত্রাসবাদের নয়া অধ্যায়। লাল মসজিদ অবরোধ ছিল মুশারফ জমানার অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। মুশারফের পতনের পরেও সন্ত্রাসবাদ চলতে থাকে। ম্যারিয়ট হোটেল, সৈন্যপ্রশিক্ষণকেন্দ্র যার অন্যতম শিকার হয়। ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদেই নিহত হন বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রের হামলার মূল অভিযুক্ত ওসামা বিন লাদেন।

অন্যদিকে তালিবান পতনের পর আলোচনার ভিত্তিতে আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতিভিত্তিক আফগান ইসলামী প্রজাতন্ত্র। পাশতুন নেতা হামিদ কারজাই যিনি যুদ্ধের সময় বাইকে করে মার্কিন সাহায্যের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, শপথ নেন নতুন রাষ্ট্রপতিরূপে। উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দেশ ভারতেও হিন্দুত্ববাদী বাজপেয়ী সরকারের পতন ঘটে নির্বাচিত হয় জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট। বামপন্থীদের সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীরূপে শপথ নেন প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর ও অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে ভারতের ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও তালিবান সম্পর্কে ভারতের সরকারি ও সামাজিক মনোভাব ছিল বরাবরের মতই নেতিবাচক।

Reference:

#“An Enemy We Created: The Myth of Taliban-Al Qaeda Merger” by Alex Linschoten and Felix Kuehn

#“Directorate S” by Steve Coll

#“Inside Al Qaeda and Taliban” by Saleem Shahzad

#“Beyond Tora Bora” by Ali Jan Aurakzai

#“Taliban at War” by Antonio Giustozzi

 

Facebook Comments