এক হাড়জিরজিরে মানুষ ও বন্দুকধারীরা | The Background

Saturday, October 16, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

এক হাড়জিরজিরে মানুষ ও বন্দুকধারীরা

তানিয়া লস্কর

ভাবুন, আপনার জীবনের ৩০/৪০ বছর ব্যয় করে, রক্ত-জল-ভালবাসা দিয়ে একটি বাড়ি সাজালেন। অথচ আচমকা একদিন সেই বাড়ির দিকে ধেয়ে এলো ১২০০ জনের এক বিশাল সৈন্যবাহিনী। আপনি দেখতে পাচ্ছেন আপনার ছেলেমেয়েদের মাথার উপর থেকে ছাদ চলে যাচ্ছে। আপনি বুঝতে পারছেন এর জেরে আপনাকে একদিন নাগরিকত্বহীন হতে হবে। আপনার কাছে কাঁচা বাঁশের লাঠি আর হাড়জিরজিরে বুক নিয়ে পুলিশের দিকে ধেয়ে আসা ছাড়া আর কি উপায় বাকি থাকে? ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন মইনুল হক। তিনি হয়তো জানতেন মরতে তাকে হবেই। হয় আজ লড়ে মরতে হবে আর  নাহলে ১০/১৫ বছর পর বৃষ্টিতে কিংবা বন্যায় নিজের সব কাগজপত্র হারিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে গিয়ে মরতে হবে। তিনি আগেরটা বেছে নিয়েছেন। এটা শুধু একজনের জীবন বৃত্তান্ত নয়। গত নির্বাচনের পর থেকে অসমে গৃহহারা হয়েছেন প্রায় বিশ হাজার মানুষ। প্রথমে করিমগঞ্জ জেলার লঙ্গাই পাহাড়ে। এরপর নগাঁও, শোণিতপুর, মরিগাও এবং বিশ্বনাথ চারিয়ালিতেও এমন তথাকথিত বেদখল জমি উদ্ধারের জন্য সেনা নামানো হয়েছে।

  নির্বাচন এবং অসমের সভ্যতা, সংস্কৃতি বাঁচনোর যুদ্ধ

অসমের ২০১৬ থেকে নির্বাচনগুলো নাকি সভ্যতা ও সংস্কৃতি বাঁচানোর যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ২০১৬তে রীতিমতো ফলাও করে শরাইঘাটের ‘শেষতম যুদ্ধ’ বলে প্রচার করা হয়েছিলো। ২০২১ এর নির্বাচনকে ‘সভ্যতা সংস্কৃতি বাঁচানোর যুদ্ধ’ বলা হয়েছে। তখনই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা জায়গায় জায়গায় বলেছেন যে অসমের ১৭০০ বিঘা জমি তথাকথিত ‘বেদখলকারী’দের হাত থেকে উদ্ধার করে আদিবাসিন্দাদের হাতে সমর্পিত করা হবে। সেইমতো ফলাফল ঘোষণার দু’সপ্তাহ পরই করিমগঞ্জ জেলার লঙ্গাই ফরেস্ট রেঞ্জের একটি সংখ্যালঘু বস্তি থেকে প্রায় ২০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা এবার নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট না করার জন্য নির্বাচনী প্রতিহিংসা মেটাতে তাদের সাথে এমন করা হয়েছে।  সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবছর জুন মাসের ৭ তারিখে মূখ্যমন্ত্রী দলবল নিয়ে দরং জেলার ‘গরুখুটি’ গ্রাম পর্যবেক্ষণ করতে জান। এবং ফিরে এসে নিজের ট্যুইটার হ্যান্ডেল থেকে ট্যুইট করে জানান যে প্রায় ১২০ বিঘা জমি নাকি অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। সেগুলো উদ্ধার করে ‘কার্যক্ষম ভাবে’ সেগুলো ব্যবহার করা হবে। এরপর গত ২৩ তারিখে সেখানে পুলিশ এবং সৈন্যবাহিনী পাঠানো হয়। সুতরাং একথা খুবই স্পষ্ট যে প্রত্যেকটি উচ্ছেদই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। ঐতিহাসিকভাবে জাতিবিদ্বেষী সংখ্যাগুরু জণগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতেই এই সব করা হচ্ছে।

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, বেদখলকারী এবং অসমের জাতিবৈরিতা

গোলাগুলির ঘটনার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে তথা সরকারের তাঁবেদারী করা নিউজ চ্যানেলগুলোতে গরুখুটির মানুষকে বেদখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। এটা অসমে নতুন কিছু নয়। এনকাউন্টার, পুলিশ কাস্টডিতে মৃত্যু, নাগরিকত্ব হরণ সব কিছুকে ন্যায়িকরণ করতে একটি রাম বাণ যুক্তি দেওয়া হয় সেটি হল পীড়িতরা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।  সেই নেলি-গহপুর,  চাউলখোয়া হত্যা থেকে শুরু করে এই ২০২০ পর্যন্ত এই একই পরম্পরা চলে আসছে। অথচ এর পিছনে যে সামাজিক তথা আইনি পৃথকীকরণের এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে সেটা খুব স্বাভাবিকভাবেই চেপে যাওয়া হয়। ১৮৩৩ সাল থেকে যখন ‘grow more food policy’ এই নীতির ভিত্তিতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে কয়েক হাজার মানুষকে অসমে নিয়ে আসা হয় তখন থেকেই তাদেরকে সামাজিকভাবে পৃথকীকরণের রাজনীতি শুরু হয়। জাতিবৈরী আন্দোলনকে মান্যতা দিয়ে ১৯১৬ সালে ‘লাইন সিস্টেম’ নামে একটি নিয়ম চালু করা হয়। যার মাধ্যমে ম্যাপের মধ্যে লাইন কেটে বঙ্গমূলীয় মুসলমানদেরকে শুধু নদীর চর এবং অনুর্বরতা জমী ছাড়া অন্য কোথাও বসতি স্থাপন করতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তাদের জীবন অবধারিতভাবে নদীকেন্দ্রিক হয়ে উঠে। এরপর নদী ভাঙন, ভূমিকম্পের জন্য নদীর গতিপথ পাল্টানো ইত্যাদির ফলে তাদের এক জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় বসতি স্থাপন করতে হয়। এভাবেই ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম কাটা পড়ে যায়। কাগজপত্র নষ্ট হয়। তারা শিক্ষা-দীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে যান। সব ক্ষমতা হারিয়ে তারা যেদিন নিঃস্ব হন সেদিন রাজার হস্ত তাদের কাঙালের ধনগুলোও চুরি করতে এগিয়ে আসে। তারপর একদিন তারা ‘শকুন’ ‘উইপোকা’ ইত্যাদি নানা অভিধায় অভিহিত হন।

এই রাতের শেষ নেই

ঘরুখুটিতে দ্বিতীয় যে ছেলেটি মারা গেছে সেই শেখ ফরিদ এর পকেট থেকে উদ্ধার হয়েছে তার আধার কার্ড। এতো অনিশ্চয়তার মধ্যেও সে আধার সংগ্রহ করতে পোস্ট অফিস গিয়েছিল। সে হয়তো ভেবেছে বাড়িঘর সব হারিয়ে যাওয়ার আগে পরিচয়টুকু পাকাপোক্ত করে নেওয়া ভালো। অসমের ধর্মীয় তথা ভাষিক সংখ্যালঘু জণগণের জীবনে গত কয়েকদশক ধরে এই একই ধারায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ‘বাঙাল’ খেদা, বহিরাগত, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী প্রতি দশকে শুধু পরিভাষা ছাড়া আর কিছুই বদলাচ্ছে না। বদলানোর রাস্তাটা ঠিক কোনটা। মইনুল হকের মতো লাঠি আর বুক নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। নাকি শেখ ফরিদের মতো আধার, এনআরসি, ভোটার তালিকা ইত্যাদি ঠিক করতে অফিসে অফিসে দৌড়ানো। পথ যেটাই হোক জাতিবৈরী রাষ্ট্র কিন্তু আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না। এমন অবস্থায় দরিদ্র সংখ্যালঘু জনতার কাছে খোলা আকাশের নীচে বসে অজানা ইশ্বরের দরবারে কেঁদে ফরিয়াদ করা ছাড়া আর কি বা করার থাকে।

 

 

Facebook Comments