‘শের-য়ে-বঙ্গাল’ ফজলুল হক স্মরণ- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখনী থেকে | The Background

Saturday, November 28, 2020

Contact Us

Google Play

‘শের-য়ে-বঙ্গাল’ ফজলুল হক স্মরণ- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখনী থেকে

সম্পাদকের নিবেদন-

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, বাগ্মী, সুলেখক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর এক প্রবন্ধে ফজলুল হককে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে প্রথমেই লিখেছিলেন, বাংলার বাঘ বলতে সচরাচর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে বোঝালেও ‘কিন্তু সর্বভারতীয় সমাবেশে মুসলিম লিগের ১৯৩৭ অধিবেশনে লখনউ শহরের জনাকীর্ণ মণ্ডপ গমগম করে উঠেছিল ফজলুল হককে ‘শের-য়ে-বঙ্গাল’ জয়ধবনিতে’।

সেই শের-য়ে-বঙ্গালের জন্মদিন আজ। জন্ম ১৮৭৩ সালের ২৬শে অক্টোবর, বরিশাল জেলার চাখার গ্রামে। তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়েছে। মৃত্যু ১৯৬২-র ২৭ এপ্রিল।

২০০৯ সালে কলকাতা পৌরসংস্থা ফজলুল হককে স্মরণ করে একগুচ্ছ প্রবন্ধ বই আকারে প্রকাশ করে। উল্লেখ করা যেতে পারে, তিনি একসময় কলকাতার মেয়রও ছিলেন। বইটির প্রথমেই ছিল হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের এক সুদীর্ঘ লেখা- ‘শের-য়ে-বঙ্গাল’ ফজলুল হক শিরোনামে। সেই প্রবন্ধের শেষের দিকের বেশ কিছুটা অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি। তিনি সম্ভবত ১৯৯৮ বা ‘৯৯ সালের ৫ ডিসেম্বর এই প্রবন্ধটি লিখেছিলেন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের স্মৃতি মনে রেখে। দিনটি তাঁর প্রবন্ধেই উল্লেখিত আছে। সালটির উল্লেখ নেই। ইতিমধ্যে দু’দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত। কিন্তু হীরেন্দ্রনাথের কথাগুলি মনে হয় সমান তাৎপর্যবাহী।এখনও।

 …“একধরনের অদ্ভুত অস্থিরমতিত্ব সত্ত্বেও ফজলুল হকের তেজস্বী আত্মবিশ্বাস আজীবন তাঁকে এক বিশিষ্ট স্বাতন্ত্র্যে ভূষিত করেছিল, সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হিসাবে হৃদয়বত্তা ও আবেগপ্রবণতা ভুল পথে ঠেলে দিলেও তিনি কখনও নিজস্ব স্বকীয়তা হারাননি। মুসলিম লিগে থেকেছেন, আবার থাকেননি, লিগের ১৯৪০ লাহোর অধিবেশনে তিনিই পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপনের ভার পান (যদিও ‘পাকিস্তান’ বিষয়ে সেদিনের পরিকল্পনা পরে বিকৃত হয়ে যায়), অথচ জিন্নাহ-এর অবাধ একনায়কত্ব মানতে পারলেন না বলে তার পূর্ণ আস্থা পেলেন না। দেশ ভাগের পর স্বভূমি বরিশালে গিয়েও চুপচাপ থাকেননি। জিন্নাহ-এর মৃত্যু আর লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশকে বাঁচানোর জন্য মওলানা ভাসানি প্রমুখকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গড়লেন আর লিগকে হারিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হলেন ১৯৫৪ সালে। তখনই উর্দু ভাষা বাংলার ওপর চাপাবার বিরাট লড়াইয়ের সূচনা আর সেজন্যই কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার হক সাহেবের মুখ্যমন্ত্রীত্ব খারিজ করে দেয়।

পূর্ব পাকিস্তানে তৎকালীন স্বৈরশাসন ফজলুল হক কিংবা আবুল হাশিমের মতো মানুষকে সহ্য করতে পারল না, কিন্তু ওদেরই অলক্ষ্য প্রভাবে গড়ে উঠেছিল এমন পরিস্থিতি যা ঘটাল বাংলাদেশের “তিমিরবিদার-উদার-অভ্যুদয়”, দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও যা এই উপমহাদেশে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্মাণ করল।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে(তখন বলা হত ‘প্রধানমন্ত্রী’),ফজলুল হক নানাদিক থেকে ব্যর্থ মনোরথ হলেও এমন স্পষ্টবাদিতা ও সাহস দেখিয়েছিলেন যা আজকের দিনে বিশেষভাবে স্মরণীয়। খুব সংক্ষেপে এখানে জানাই ২ আগস্ট ১৯৪২ তারিখে আভিজাত্যগর্ব জবরদস্ত লাট Sir John Herbert-এর ঔদ্ধত্যের জবাবে হক সাহেবের চিঠির কথা। সরকারি কাজে লাটসাহেবের হস্তক্ষেপে মানতে পারবেন না বলেছিলেন অকুণ্ঠে, উচ্চস্বরে। ‘যুদ্ধের প্রয়োজনে’ বাংলার জনজীবনে দুঃখ দুর্দশা বিকটভাবে বাড়ানো হচ্ছে বলে তাঁর প্রতিবাদ। দেশজুড়ে অসন্তোষের আগুন তখন ছড়িয়ে পড়েছিল, আর তারই প্রতিধবনি হক সাহেবের চিঠিতে।“As the head of the Cabinet I cannot possibly allow this attitude on your part to go unchallenged… I have detected your personal interference in almost every matter of administrative detail. You should allow Provincial Autonomy to function honestly rather than as a cloak for autocratic powers as if the province was being governed under section 93 of the Act” অনুবাদের দরকার নেই কিন্তু ভদ্র, সংসদীয় নীতিসঙ্গত ভাষায় এমন চপেটাঘাতে অহ্ঙ্কারী শ্বেতাঙ্গ লাটসাহেবের গণ্ডদেশ যে রক্তিম হয়ে উঠেছিল সন্দেহ নেই। হক সাহেবকে এর মূল্য দিতে হয়েছিল, তাঁকে অনতিবিলম্বে হটতে হয়েছিল। কিন্তু পরাধীনতার যুগে এ ধরনের সৎসাহস দেখাবার মতো মানুষ উচ্চপদস্থদের মধ্যে একান্ত বিরল।

এরই সঙ্গে মনে পড়ছে স্বাধীনতাপূর্ব যুগেই ২৯ মার্চ ১৯৪৫ তারিখে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার অধ্যক্ষ(speaker) সৈয়দ নওশের আলী সাহেবের অবিস্মরণীয় উক্তি যা এ দেশের সংসদীয় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকা উচিত। ব্যবস্থাপক সভায় পরাজিত সরকারকে বাঁচাবার যে চেষ্টা লাটসাহেব তখন করেন, তাকে নাকচ করে দিয়ে তিনি কলকাতায় অকুতোভয়ে ঘোষণা করেনঃ “The Ministry is the creature of the House; The House can make or unmake The Ministry and the Governor is but the registering authority of the decision of the House”। দেশ যখন পরাধীন, যুদ্ধকালীন কড়াকড়ি যখন কঠোর, তখন এই উচ্চারণ বাস্তবিকই দেশের মানুষের বুকে বল এনেছিল। এই ‘নির্দেশ’ ছিল বলে স্বাধীনতা পরবর্তী বিধানসভায় অধ্যক্ষ বিজয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনের অনধিকার চর্চাকে বাধা দেবার নৈতিক সঙ্গতি পেয়েছিলেন। ফজলুল হককে স্মরণ করার সঙ্গে আমাদের অনেকেরই শ্রদ্ধেয় বন্ধু নওশের আলী সাহেবকেও অভিবাদন জানাই।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও লেখাটি অত্যন্ত দীর্ঘ হয়ে গেল। তবুও অবশেষে আমার মনের যন্ত্রণা প্রকাশ করতে চেয়েই একটি কথা জানাতে চাই। ফজলুল হকের মতো দেশব্রতী বাঙালির কথা আজকের ভারত রাষ্ট্রে এবং বামপন্থী শাসিত পশ্চিমবঙ্গেও মুসলমানদের কেমন যেন সংকুচিত ও এখনও মূলত বঞ্চিত অবস্থান দেখে কষ্ট হয় আর ভয় হয় যে এখানে (বিশেষত বিজেপি কেন্দ্রে বহাল হওয়ার ফলে)কার্যত ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ মুখোশ ছিঁড়ে গিয়ে ‘হিন্দুত্ববাদে’-রই আধিপত্য যেন চলেছে। বিরল আনন্দ পেয়েছিলাম যখন বছর খানেক আগে কলকাতা কর্পোরেশন সংবর্ধনা জানায় পশ্চিমবাংলার গ্রামের ছেলে, অর্ধ পঙ্গু অবস্থায় দুটি কাঠের পা নিয়ে যে ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার দিয়ে পার হয়েছে সেই মসুদুর রহমানকে। তার এই চমকপ্রদ সাফল্যে যেন দেখেছিলাম মুসলিম জনসাধারণেরই অগ্রগতির সূচনা। কিন্তু তারা এখনও অনেক পিছিয়ে; পাঁচজন বাঙালির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে একজন মুসলমান হলেও জীবনের সর্বক্ষেত্রেই তারা যেন পশ্চাদপদ। এর সংশোধন কেমন করে হবে তা ভিন্ন প্রসঙ্গ, কিন্তু কেন এমন হতে থাকবে? সবাই যথেষ্ট ভাবিত হচ্ছি বলে তো মনে হয় না।

আসন সংরক্ষণ সমস্যার সমাধান নয় জানি, কিন্তু এটা কি চিন্তার বিষয় নয় যে ১৯৯৬ সালে লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেন মাত্র ২১ জন মুসলমান? ১৯৫৭ সালে লোকসভায় নির্বাচিত হন মাত্র ১৯ জন মুসলমান; ১৯৬২ সালে ২০; ১৯৬৭ সালে ২৮; ১৯৭১ সালে ২৪; ১৯৭৭ সালে ৩১; ১৯৮৪ সালে ৪৪; ১৯৮৯ সালে ২৭; ১৯৯১ সালে ২৫! ‘টেলিগ্রাফ’ দৈনিক ৭ এপ্রিল ১৯৯৮ তারিখে একটি প্রবন্ধে দেখি যে ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, ওড়িশা, রাজস্থান আর তামিলনাডু সহ কুড়িটি রাজ্য থেকে একজন মুসলমানও জেতেননি। এটা ঘটেছে যদিও সারা দেশে শতকরা বারো হল তাদের জনসংখ্যা। শুধু মুসলিম নয়, এভাবে বঞ্চিত তফসিলি জাতি উপজাতির কম বেশি পরিমাণে ‘দলিত’ যারা। সরকারি ও সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থায় মুসলিম অনুপাত হল ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে শতকরা মাত্র দুই; ডাক্তারদের মধ্যে তারা ২.৫; “আই-এ-এস” শতকরা ২.৮৫; আই পি এস শতকরা ২; ইনকাম ট্যাক্স অফিসার শতকরা ৩.০১; ক্লাস ওয়ান অফিসার শতকরা ৩.৩; ব্যাঙ্ক কর্মচারী শতকরা ২.৮। ব্যক্তিগত মালিকানায় এর চেয়ে একটু ভালো অবস্থাঃ শতকরা প্রায় চার! এটাই কি চলবে?

পশ্চিমবাংলায় লেখাপড়ায় মুসলিম ও অন্যান্য বঞ্চিতরা যে ক্রমাগত পিছিয়েই রয়েছে এটা কি ঠিক? আমি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বার হবার সময় বছরের পর বছর দেখে আসছি যে প্রথম পঞ্চাশ কি একশো সফল প্রার্থীরা প্রায় সকলে বর্ণ হিন্দু- মুসলমান ও হিন্দুদের তথাকথিত নিম্ন শ্রেণীর দু’একজন ছিটকে-ছাটকে থাকতে পারেন। ভারি খারাপ লাগে যখন দেখি সাহিত্যিক শিল্পী প্রভৃতিদের সম্মেলনে বাঙালি মুসলিম উপস্থিতি একেবারে অত্যন্ত কম। বাংলা আকাদেমির দুটি প্রধান কমিটিতে ৭০/৭২ জনের মধ্যে মাত্র একজন মুসলিম।

রবীন্দ্র জন্মপক্ষ উপলক্ষ্যে উৎসবে বাংলা আকাদেমি আমন্ত্রণ (১-৫-৯৮)করলেন দুদিনব্যাপী উৎসবে চল্লিশজন গুণীকে, যাদের মধ্যে মাত্র একজন মুসলমান আর বাকি সবাই বর্ণ হিন্দু শুধু নয়, ‘দ্বিজ’!১৪ মে ১৯৯৮ তারিখে আকাদেমি কবি সম্মেলন ডাকলেন ৪১ জনকে যারা সবাই উচ্চবর্ণের হিন্দু! পশ্চিমবঙ্গ সরকার সুভাষচন্দ্রের স্মৃতিরক্ষার্থে ‘কমিটি’ নিয়োগ করলেন(৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)। যার সভ্য সংখ্যা বত্রিশ, যার মধ্যে একমাত্র মুসলমান হলেন বিধানসভার অধ্যক্ষ পদাধিকারী হাসিম আব্দুল হালীম! হাতের কাছে কাগজটা নেই কিন্তু মনে পড়ছে যে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে গানের বিরাট আসরে হয়তো বাংলাদেশ থেকে নিমন্ত্রিত দু একজনও থাকলেও পশ্চিমবাংলায় মুসলমান একজনও নেই। হয়তো- হয়তো কেন, এটাই ‘বাস্তব’- কিন্তু কী ভয়ঙ্কর বাস্তব!এর সঙ্গে কত কথাই জড়িত রয়েছে যা কি আমাদের যন্ত্রণা দেয় না?

ঐতিহাসিক কারণেই গান্ধী কথিত “heart unity”(“ছাতি সে ছাতি মিলানা”)আজও ঘটেনি। এর আভাস দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তো কতবার সবাইকে ডাক দিয়ে গেছেন, কিন্তু(আজ, যখন লিখছি ৫ ডিসেম্বর, বাবরী মসজিদ ধ্বংসের স্মৃতি মনে রেখে)জোর করে আশা করতে চাইছি রবীন্দ্রনাথ কথিত “মহাভারতবর্ষে” একদিন আমরা সবাই বাস করব-ফজলুল হকের মতো দোষে গুণে ভরা অথচ বৃহৎ ও মহৎ মানুষকে এ জন্যই স্মরণ করছি, অভিবাদন জানাচ্ছি।”

উপরের ছবি- ১৯৪০-এর শুরুতে বোম্বাইয়ে মুসলিম লিগ কাউন্সিল সভায় উপস্থিত ‘শের-য়ে-বঙ্গাল’ আবুল কাশেম ফজলুল হক (বামদিকে)। তাঁর পাশেই বসে আছেন কায়েদ-ই-আজম মহম্মদ আলি জিন্নাহ। উপস্থিত  লিগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দও। ডন/ হোয়ায়ে্ট স্টার আর্কাইভস থেকে। 

 

Facebook Comments