শাসকদলগুলির দেশপ্রেমের রাজনীতি ভারতীয় উপমহাদেশে | The Background

Tuesday, October 27, 2020

Contact Us

Google Play

শাসকদলগুলির দেশপ্রেমের রাজনীতি ভারতীয় উপমহাদেশে

আবু সঈদ আহমেদ

 ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের এক বড় সময় উপনিবেশবাদের অন্ধকার ছায়া ঘনিয়ে এসেছিল। এই দেশগুলি তথাকথিত স্বাধীন হওয়ার পরেও একে অন্যের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তাই উপমহাদেশের রাজনীতিতে ‘দেশপ্রেম’ একটা বড় বিষয়। রাজনৈতিক প্রচারকর্মে একে অন্যকে দেশদ্রোহী দাগানোটা এখানকার রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বিরল কোন বিষয় নয়।

উপমহাদেশের দক্ষিণের রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার এর আগের বেশ কিছু সরকারের মতই দেশপ্রেমের কড়া মেজাজের গ্রাহক। তামিল সমস্যার বিপরীতে সিংহলী জাতীয়তাবাদ এই দেশের সব সমস্যার মোকাবিলায় আনা হয়। অন্যদিকে, উত্তর প্রান্তের নেপালেও ‘কমিউনিস্ট সরকার’ থাকা স্বত্ত্বেও জাতীয়তাবাদের হাওয়া প্রবল। ভারতের অতি-দক্ষিণপন্থী সরকার ও মধেশী সমস্যা এতে বড় ভূমিকা নিয়েছে। জাতীয়তাবাদের জোশে নয়া মানচিত্র প্রকাশ করেছে। যাতে ভারত-শাসিত তিনটি এলাকা নিজেদের বলে দাবি করেছে নেপাল!

নয়া মানচিত্র প্রকাশে পিছিয়ে থাকেনি পাকিস্তানও। কাশ্মীরকে বিতর্কিত এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে তুলে এনে জুনাগড়কেও নিজেদের দাবির আওতায় রেখেছে। জন্মলগ্ন থেকে ভারতের সাথে তো বটেই সোভিয়েত কিম্বা মার্কিন আগ্রাসনের সময়কালে সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের শাসনকার্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে সামরিক বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা সাড়ে তিন দশক ধরে এই দেশের ভাগ্য-নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সামরিক শাসক মেজর ইস্কান্দার মির্জা ও জেনারেল আইয়ুব খানের হাত ধরে উঠে আসা জুলফিকার আলি ভূট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি আর জেনারেল জিয়াউল হকের ইসলামী জামহুরিয়াতী ইজতিহাদের বর্তমান সংস্করণ পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) ক্ষমতা উপভোগ করেছে ২৬ বছর। এই দলগুলিকে সরিয়ে পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফের সভাপতি ইমরান খানের রাজনীতিও নিজেকে দেশপ্রেমিক ও অন্যদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও দুর্বল বিদেশনীতির জন্য দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে।উপমহাদেশে ক্রিকেটকে ধর্মের আসন দেওয়া হয়। এই খেলার কুশলীরা হয়ে ওঠেন আপামর ভক্তের ভগবান। সুদর্শন চেহারার অধিকারী ইমরানের তার সাথে ছিল, তার মায়ের নামে করা শওকত  খানম ক্যান্সার হাসপাতালে সমাজসেবা করার জনপ্রিয়তা। তবুও ক্ষমতার স্বাদ পেতে ইমরানকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দুদশকেরও বেশী সময়। ক্ষমতায় এসেও বজায় রেখেছেন ধর্মীয় ভাবাবেগ, জাতীয়তাবাদ আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নের মিশেল।

পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘স্বাধীন’ হয় বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতার জন্য আহ্বান করা শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগ আর কালুরঘাট বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি – এই দুই দলই মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের নেতাদের ভূমিকা তুলে ধরে রাজনীতি করে গেছে। উপরন্তু লীগ-নেত্রী তথা সেখানকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতপ্রীতি নিয়ে আক্রমণ করে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া জামাত-ই-ইসলামের সাথে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির জোটকে বিঁধতে ছাড়ে না আওয়ামী লীগ।

এবার আসা যাক ভারতের কথায়। ১৮৮৫ সালে দল গঠনের বহু পরে স্বাধীনতার প্রস্তাব নিলেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকার কথা ফলাও করে প্রচার করতে ছাড়ে না ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। নিজেদের সেরা সময়ে তারা বিভিন্ন পন্থায় প্রচার করে গেছে, সশস্ত্র বিপ্লবী পন্থার চেয়ে গান্ধীজির অহিংসা কেন বেশী কার্যকর ছিল। জাতীয়তাবাদের ভাবধারা প্রচারের সময় খুব সন্তর্পণেই চাপা দিতে পেরেছে স্বাধীনতার আগে ও পরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কংগ্রেসের ব্যবহার ঠিক কেমন ছিল। কংগ্রেসেরই জাতীয়তাবাদ, হিন্দীপ্রেম, গো-রাজনীতির রাস্তা ধরেই হিন্দু মহাসভা, জনসঙ্ঘ-র পর্যায় পেরিয়ে ক্ষমতায় আসে আরএসএস—র প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি। নিজেদেরকে ইসলামী ও চৈনিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ত্রাতার ভূমিকা দিয়ে, অন্যদের পরিবারবাদ, দুর্নীতি কিম্বা নমনীয়তার জন্য দেশদ্রোহী আখ্যা দিতে চূড়ান্ত সফল এই দল। যদিও এই দলের মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ব্রিটিশপ্রীতির জন্য দেশদ্রোহিতার অভিযোগ অন্যান্য বিরোধী তো বটেই কংগ্রেসের তরফ থেকেও জোরালো হয় নি। তাতে করে হয়তো নিজেদের ইতিহাসের আবেদন নিবেদন পর্ব কিম্বা রাজনীতির ‘বন্দে মাতরম’-খ্যাত আনন্দমঠ উপন্যাসের মূলভাবটাই যে ব্যুমেরাং হয়ে যায়। এক অলীক দেশপ্রেম-র ‘খুড়োর-কল’ ঝুলিয়ে, তাকে সর্বরোগহর দাওয়াই হিসাবে মানুষের মগজে প্রবিষ্ট করার চক্রান্তে শামিল প্রায় সব ‘জাতীয়তাবাদী’ দল! এদের কথায় সব আছে, প্রচারে মায়াকান্নাও আছে, শুধু নেই নিজেদের দেশের মানুষের প্রতি সামান্যতম দায়বদ্ধতা! শাসক নিজের নিজের দেশের মানুষের মননে এক ভণ্ড দেশপ্রেমের রাজনীতি প্রবিষ্ট করিয়ে নিজেদের অপশাসন দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক ক্ষোভকে সামাল দিতে চায়। যখন সামনে কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই, মানুষের সার্বিক উন্নয়নের নেই কোন প্রকৃত রোডম্যাপ, তখন এই দেশপ্রেমের উত্তুঙ্গ আস্ফালন ও তার প্রচারের একটাই লক্ষ্য, আসল সমস্যা থেকে মানুষের নজর এক অন্যখাতে বইয়ে দেওয়া। তবুও শেষরক্ষা হয়না, জনতা একদিন জাগবেই এবং সে তার প্রতি হওয়া অবিচারের প্রতিকার চেয়ে, হয়ে উঠবে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

সৌজন্য- সরলরেখা বুলেটিন

 

Facebook Comments