ত্রিপুরাঃ ধর্মনিরপেক্ষতা কি শুধু মুখের বুলি? | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

ত্রিপুরাঃ ধর্মনিরপেক্ষতা কি শুধু মুখের বুলি?

স্বাধীন খসরু

 কয়েকদিন ধরে খুঁজছি খবর কাগজে। মূলধারা সংবাদমাধ্যমে খবরটা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই খবরটা তো প্রতিদিন প্রথম পাতায় আসা উচিত। ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরায় গত এক সপ্তাহে ডজন খানেক মসজিদের ওপর হামলা হয়েছে, মুসলমানদের বাড়িঘর-দোকানপাট ভস্মীভূত, লুটপাট চলছে। উত্তর ত্রিপুরা, পশ্চিম ত্রিপুরা, উনাকোটি, সিপাহিজেলা, গোমাতি- সর্বত্র একই চিত্র। প্রতিদিন আসছে এই অসহনীয় সংবাদ। সোশ্যাল মাধ্যম মারফত। বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলিও চেষ্টা করছে খবরগুলি তুলে আনতে। অথচ, মূলধারা সংবাদমাধ্যমগুলি নিশ্চুপ। মুখে রা নেই। ‘ভারতে সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম শ্রেণির বাংলা দৈনিক’ আনন্দবাজার অথবা ভারতের পয়লা নম্বর মিডিয়া গোষ্ঠী টাইমস গ্রুপের বাংলা দৈনিক এই সময়- আঁতিপাঁতি করে খুঁজুন এগুলি। পাবেন না ত্রিপুরার খবর।

শুধু এদের কথায় বলি কেন? তাকিয়ে দেখুন মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির দিকে। তারাও নিশ্চুপ। বাম-ডান কোন দলই ঝেড়ে কিছু বলছে না। শারদোৎসবের সময় ত্রিপুরার ঠিক পাশেই বাংলাদেশের কুমিল্লায় অশান্তি শুরু হলো। কারা করলো? কিভাবে হলো? এগুলি ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। তবে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। ত্রিপুরার এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত। বোঝাই যাচ্ছে।

হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা হইহই করে নেমে পড়েছে ত্রিপুরায়। বিধানসভার ভোটও এগিয়ে আসছে। ফলে মুসলমানদের সন্ত্রস্ত করার এটাই তো উপযুক্ত সময়। সাফসুতরো অ্যাজেন্ডা। কোন ধোঁয়াশা নেই। কিন্তু এই সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করতে উপযুক্ত প্রতিরোধ কোথায়? প্রতিবাদ কোথায় ধবনিত হচ্ছে?

আমরা ধরেই নিচ্ছি শাসকদল টুঁ শব্দটি করবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী  নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াতে ব্যস্ত। ১০০ কোটি কোভিড ভ্যাকসিন নাকি দেশে দিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে। এটা সত্যের অপলাপ। যাকগে, থালা চাপড়াতে তো আর বলেননি। ‘মন কি বাতে’ চলছে। চলবে। এইসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্‌ কাশ্মীরে গিয়ে নিহত পুলিশ আধিকারিকের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু দুই নেতার ত্রিপুরা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই, যেখানে তাঁদেরই দল ২০১৮ থেকে ক্ষমতাসীন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব, আলটপকা মন্তব্য করতে যিনি পিছপা হননা, তিনিও চুপচাপ।

বিরোধীদলগুলিও কি আশ্চর্যরকম নিশ্চুপ। কংগ্রেস আসন্ন উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন নিয়ে মহাব্যস্ত। ভোট যত এগিয়ে আসবে, ঐ রাজ্যের ২০ শতাংশ মুসলমানের ভোট পেতে ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি তাদের কন্ঠে আরও বেশি বেশি উচ্চারিত হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেকনজরে ত্রিপুরা। আর ত্রিপুরা তো শুধু নয়, গোয়াতেও তারা পর্যটক হয়ে গেছেন। নীতি-আদর্শের কোন বালাই নেই। অন্য দল ভাঙাও, আর ভোটে জেতার কসরত করো। দলনেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় মুসলমানদের মশীহ। তাঁর রাজ্যের মুসলমানরা বড়ই সুখে দিন কাটাচ্ছেন। এমনই তো বোঝাচ্ছেন ঐরাজ্যের বহু আঁতেল। তিনিও মুখে কুলুপ এঁটেছেন।

অন্যদিকে, সিপিআইএম, যারা ঐরাজ্যে এই সেদিন পর্যন্ত শাসন তখতে আসীন ছিল, তারাও রাজ্যের মুসলমান নিধনে সেইভাবে এগিয়ে আসেনি এখনও। দলীয় মুখপত্রে প্রতিবাদ ধবনিত হয়েছে। কিন্তু সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে দল যেন চুপচাপ। এই মাসেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু আক্রান্ত নিয়ে তাঁরা পথে নেমেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছেন; ত্রিপুরায় সংখ্যালঘুদের নিয়ে তো কিন্তু সেই ঝাঁঝ নেই। কেন্দ্রীয় কমিটির সদ্য হয়ে যাওয়া বৈঠকে এনিয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই। দলের সাধারণ সম্পাদক প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচটা ট্যুইট করেন। দেখছিলাম তিনিও গত এক সপ্তাহে এই বিষয়ে কোনকিছু বলেননি। মুসলমানরা শুধুই ভোটব্যাঙ্ক? নির্বাচন এলে মুসলমানদের কথা মনে পড়ে সব দলের। নচেৎ নয়।

সেই স্থানে গত জানুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া একটি দল-ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)- তার সীমিত শক্তি নিয়ে এই বিষয়ে সরব হয়েছে। তারা ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে। দাবি তুলেছে বিচারবিভাগীয় তদন্তের। আক্রান্তদের ও মসজিদগুলির রক্ষণাবেক্ষণে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের। ঐ দল হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া প্রিভেনশন অব কমিউন্যাল অ্যান্ড টারগেটেড ভায়োলেনস ( অ্যাক্সেস টু জাস্টিস  অ্যান্ড রিপ্যারাশনস) বিলটি পুনরায় সংসদে পেশ করার জন্য সরব হয়েছে। অন্তত হিন্দুত্ববাদীদের আস্ফালনের বিরুদ্ধে এই দলটি অন্যদলগুলির মতন নিরব নয়। ত্রিপুরার আক্রান্ত সংখ্যালঘু মুসলমানদের পক্ষে তাদের প্রতিবাদ উচ্চারিত।

কিন্তু নিরাপদবাবুরা কোথায় যাবেন?

ছবিঃ সৌজন্য ট্যুইটার

Facebook Comments