ভাষা আন্দোলনঃ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে | The Background

Saturday, February 27, 2021

Contact Us

Google Play

ভাষা আন্দোলনঃ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে

সাহিদুল ইসলাম

একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষাষা দিবস, বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন যাঁরা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে হয়-
“রক্ত শপথে আমরা আজিকে তোমারে স্মরণ করি
একুশে ফেব্রুয়ারী
দৃঢ় দুই হাতে রক্তপতাকা ঊর্দ্ধে তুলিয়া ধরি
একুশে ফেব্রুয়ারী
তোমাকে স্মরণ করি।।”  -তোফাজ্জেল হোসেন

মাতৃভাষার জন্য প্রাণদান সেদিন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। বিশ্ব ইতিহাসে এ এক বিরল দৃষ্টান্ত। ভাষা আন্দোলনের মূল চরিত্র ভাষার বিবর্তন নিয়ে নয়, প্রশাসনিক স্তরে কাজকর্মে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করা হলে বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। শুরু হয় বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন যা ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত।

১৯৪৭ সালের ১৪ই অগাস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। যার পশ্চিম অংশের নাম পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমানে পাকিস্তান) এবং পূর্ব অংশের নাম পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ)। হাজার মাইল ব্যবধানে অবস্থিত দুই অংশের মধ্যে কোনো ভৌগোলিক যোগাযোগ ছিল না। অথচ তাদের নিয়ে তৈরি হয় পাকিস্তান রাষ্ট্র, কেবলমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রচলিত ভাষা হল সিন্ধী, পাঞ্জাবী, পুশতু ও বালোচ। শাসন ক্ষমতা মুসলিম লীগের হাতে। যার নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল বৃহৎ ধনী ও সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামীদের হাতে। এঁরা সমগ্র পাকিস্তানে নিজেদের ক্ষমতা বিস্তার করতে উদ্গ্রীব হয়ে পড়েন। তাঁরা জানতেন পূর্ব পাকিস্তানের পাট, চা ও প্রাকৃতিক সম্পদের কথা। সেই সঙ্গে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাজার তাঁদের মুনাফার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
“তাই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আদমজী, দাদা, দাউদ, বাওয়ামী, সায়গল প্রমুখ পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহৎ পুঁজিপতি, পরবর্তীকালে যারা বাইশ পরিবার বলে কুখ্যাত হয়েছিল্পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প গঠন ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রচুরমূলধন বিনিয়োগ করেছিল। ঐ বৃহৎ ধনিকদের মালিকানাধীন একাধিক ব্যাংক ও জীবনবীমা কোম্পানীও পূর্ব পাকিস্তানে তাদের ব্যবসা প্রসারিত করেছিল।” (সুধীন রায়)
পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিপতিরা এইভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নিজেদের একচ্ছত্র অধিকার কায়েম করেছিল। এখানকার সম্পদ ও মেহনতি মানুষকে শোষণ করে যে বৃহৎ মুনাফা তারা করেছিল তা পাঠানো হত পশ্চিম পাকিস্তানে। এও এক ঔপনিবেশিক শোষণের নামান্তর। আর এ কাজে সম্পূর্ণরূপে তাদের সাহায্য করতো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকার। এদের দেখাদেখি পূর্ব পাকিস্তানের স্থানীয় ভূস্বামীরাও সাধারণ মানুষের ওপর শোষণের সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে জনগণের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। সাধারণ জনগণের মনে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছিল। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মন আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল অথবা আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। পর্যাপ্ত জলহাওয়ায় তা ১৯৫২-র ঐক্যবদ্ধ ভাষা আন্দোলনে পরিণতি পায়।
বাহান্ন’র ভাষা আন্দোলনকে কেবল ভাষার ভিত্তিতে দেখলে চলবে না। এর পিছনে রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের শোষণ শাসন। এরা কৃষক ও শ্রমিকদের বিপর্যস্ত করেছিল। সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবেশকেও তারা নস্ট করতে চেয়েছিল। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা ও সংস্কৃতিতে চাপা দিতে চেয়েছিল। এছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে তারা জনবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছিল। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা প্রচার করতে শুরু করলেন বাংলাভাষা হিন্দুর ভাষা। নিষিদ্ধ হল রবীন্দ্রচর্চা, চেষ্টা হল আরবী হরফে বাংলা লেখার। আরও ঘোষণা করলেন রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে উর্দুভাষার বিরোধিতা করার মানে হল ইসলামের বিরোধিতা করা। এইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার বাংলা ভাষার অসারতা প্রমাণ করে উর্দুভাষাকে বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দিতে চাইলেন। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নেমে এল উর্দু সাম্রাজ্যবাদের আক্রমণ। বুদ্ধিজীবি, ছাত্রসমাজসহ সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এই আক্রমণ মেনে নেয়নি। ‘একমাত্র উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’_এর প্রতিবাদে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন আব্দুস সালাম, আবুল বরকত, রফিকউদ্দীন, শফিউর, আব্দুল জব্বার প্রমুখ। বিশ্ববাসী দেখল প্রাণ দিয়ে কীভাবে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষা করতে হয়।
সুতরাং ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার প্রশ্নে গড়ে ওঠেনি। এর পিছনে ছিল পাকিস্তানের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের ইতিহাস। বুদ্ধিজীবি, ছাত্রসমাজ ও মধ্যবিত্ত জনগণের মনে জন্মেছিল দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। এই অসন্তোষের বারুদে অগ্নি সংযোগ করে ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের জমি প্রস্তুত হতে শুরু করে পাকিস্তান রাষ্ট্রসৃষ্টির সূচনালগ্নে। এই ভাষা আন্দোলন বাঙালির আবেগ, ভাষাপ্রীতি, ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে স্বমহিমায় দাঁড় করিয়েছে। তাই ২১শে ফেব্রুয়ারী শুধু বাঙালির মাতৃভাষা দিবস নয়, সমগ্র বিশ্ববাসীর মাতৃভাষা দিবস।

গ্রন্থঋণঃ
১) একুশে ফেব্রুয়ারী, সম্পাদনা দেবাশিস সেনগুপ্ত, বাণীশিল্প, কলকাতা।
২) মহান একুশে, সম্পাদনা মজহারুল ইসলাম, চিত্ত মন্ডল, প্রথমা রায়মন্ডল, নব্জাতক প্রকাশন কলকাতা।
৩) ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা, এম আর আখতার মুকুল, শিখা প্রকাশনী, ঢাকা।
৪) ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা, বাংলা আকাদেমী, ঢাকা।

Facebook Comments