কোভিড-১৯ চিকিৎসার ওষুধ এবং ভারত– মার্কিন মিত্রতা | The Background

Wednesday, September 23, 2020

Contact Us

Google Play

কোভিড-১৯ চিকিৎসার ওষুধ এবং ভারত– মার্কিন মিত্রতা

মিরাজুল হক

ডিসেম্বর-২০১৯। পুরনো করোনা প্রজাতির একটি নুতুন মিউট্যান্ট আরএনএ (RNA) ভাইরাসের প্রকোপ শুরু। তাই নামকরণ করা হল- কোভিড-১৯। এই ভাইরাসের জন্য আতঙ্ক ও বিশ্বজুড়ে মহামারী। মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে ক্রমশ বাড়ছে। সংখ্যাটি লক্ষ ছাড়িয়ে গেল। বিজ্ঞানী-চিকিৎসক ও WHO- সকলে কেবল  উদ্বিগ্ন নয়, বরঞ্চ অনেকটা বিভ্রান্তও। ভারতবর্ষের প্রায় ১৩০ কোটিরও বেশী মানুষ নজিরবিহীনভাবে ‘লকডাউনে’ বন্দী;  লোকজন বাড়িতে আটকে, অন্তরিণে।  লকডাউনের মত এত বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার আগে যে পরিমান হোম ওয়ার্ক করা দরকার ছিল, তা হয়নি। জাতীয় বিপর্যয়ের সামনে এখন আমাদের দেশ। অর্থনীতিবিদের মতে ‘নোটবন্দী’র থেকেও অনেক বেশী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মারাত্মক পরিনতির মুখোমুখি হতে হবে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে, অ্যান্টি– ভাইরাল ওষুধ হাতে গোনা দু -তিনটে আছে। অন্যদিকে, এই ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি, পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বা অনুশীলন করে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে, রোগটার অবসান করা বেশ কঠিন কাজ, এখন। তাই এই রোগের চিকিৎসা পুরোটাই সহায়ক(Supportive) ট্রিটমেন্ট। এরই মধ্যে কিছু চিকিৎসক, হাইড্রক্সিক্লোরকুইন(Hydroxychloroquine) জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করে, ভালো সুবিধা বা সুফল পেয়েছেন, রোগী ভালো হয়েছে বলে দাবিও করছেন। চিকিৎসকদের এই মতামতের উপর ভিত্তি করে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ২১ মার্চ টুইট করেছেন, যে হাইড্রক্সিক্লোরকুইন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিন এই রোগে খুবই ভালো কাজ করে,(“Hydroxychloroquine and Azithromycin– a real chance to be one of the biggest game changers in the history of Medicine”)।

মার্কিন দেশের FDA নামে বিশ্বখ্যাত সংস্থা ও ঐ দেশের অন্যান্য নামকরা  চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন, এ বিষয়ে পুরোপুরি নীরব, কোন মন্তব্যই করেনি । অন্যদিকে FDA সংস্থার বিজ্ঞানীরা, এই রোগে  হাইড্রক্সিক্লোরকুইন(Hydroxychloroquine) জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করা নিয়ে, দুভাগে বিভক্ত। মার্কিন দেশে চিকিৎসার বিধি নিষেধের আইন এবং FDA এর নির্দেশিকা প্রবল কড়াকড়ি নিয়মে মানা হয়। আবার বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি  , SANOFI জানিয়েছে যে, হাইড্রক্সিক্লোরকুইন(Hydroxychloroquine), এই কোভিড-১৯ রোগে ব্যবহার করা যাবে না (“Sanofi’s hydroxychloroquine is not indicated for use in COVID19 in any country”)। কিন্তু SANOFI-র সঙ্গে ট্র্যাম্পের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণই কি মার্কিন প্রেসিডেন্টের এত সক্রিয়তা? প্রশ্ন কিন্তু উঠে আসছে।

আসলে এই ওষুধের অনেক বিরূপ পার্শ্ব–প্রতিক্রিয়া আছে, যাকে এক কথায় বলা যায়, Cardiac Toxicity(যেমন, Ventricular Arrhythmia, QT Prolongation)। এই  বিরূপ পার্শ্ব–প্রতিক্রিয়ার কারনে বয়স্ক রোগীদের হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে ও রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে । তবে রান্ডামাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল-‘RCT’ পদ্ধতিতে এই ওষুধের পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে এবং তার ফলাফল পেতে এখনও অপেক্ষা করতে হবে । অন্যদিকে, বেশ কিছু চিকিৎসক নৈতিক দায়িত্বের(Ethical Obligation) উপর নির্ভর করে, এই ওষুধটি প্রয়োগ করছেন।

তবে এই ওষুধটি আমাদের দেশে ম্যালেরিয়া, রিউমাটেড আরথাইটিস এবং   “এস-এল-ই” জাতীয় অসুখে দীর্ঘদিন ধরে  নিয়মিত ব্যবহার করা হয়।  ‘SARS -COV-2’ রোগে, এই ওষুধের প্রয়োগ সম্পর্কে কিছুটা পরীক্ষা নিরীক্ষা(VITRO– trail outside the Body) হয়েছে। অভিজ্ঞতাজনিত বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ  চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রচলিত নয়, গৃহীত বা স্বীকৃত নয়। তবে একদল চিকিৎসক মনে করেন, প্রোফাইলাক্সিস হিসেবে এই ওষুধটি ব্যবহার করা উচিত। আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক,  ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ(ICMR)– এর সুপারিশ মেনে, এই ওষুধ ব্যবহারের যে নির্দেশিকা দিয়েছে, তাতে চিকিৎসা হিসাবে এই হাইড্রক্সিক্লোরকুইন (Hydroxychloroquine) এর ব্যবহার নেই; নাগরিক সাধারনের খাওয়ার নিদান দেওয়া হয় নি।  শুধুমাত্র  চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য, যারা সরাসরি রুগীর সেবায় যুক্ত, কেবল তারা  প্রোফাইলাক্সিস হিসেবে এই ওষুধটির ব্যবহার  করার নির্দেশ দিয়েছে। ফ্রান্সে, ইতিমধ্যে, প্রায় শতখানেক হার্ট সম্বন্ধীয় রোগ বেড়ে গেছে এই ড্রাগ ব্যবহারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর বেশ কিছু পরামর্শদাতা এই  হাইড্রক্সিক্লোরকুইন (Hydroxychloroquine) নিয়ে এখন অতি সক্রিয় হয়েছেন। বর্তমানে  এই রোগের প্রকোপের প্রেক্ষাপটে, মার্কিন প্রশাসন অনেকটা অসহায়। তাই ভারত থেকে এই ওষুধ আমদানি করার জন্য খুবই সক্রিয় ও ক্ষিপ্র । এদিকে ভারত সরকারের এই ওষুধ রপ্তানির উপর আগেই বিধি নিষেধ জারি করেছে। এখন প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্পের এই ওষুধ পাঠানোর জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ , অনেকটা  ‘দাদাগিরি‘র সুরে হুমকি। আবার প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্পের সংগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী মোদীজির আবেগের সম্পর্কের বন্ধুত্ব । তাই মোদী সরকার পুরো ইউ- টার্ন নিয়ে, রপ্তানির উপর আরোপিত নিষেধ তুলে নিয়ে, এই ওষুধ মার্কিন দেশে পৌঁছে দিয়েছে ।

কোভিড ১৯ রোগে  এই ওষুধ নিয়ে আমারা অধিকাংশই হুজুগে বাড়াবাড়ি যেন না-করি। অন্য রোগী , যেমন এস- এল-ই ও রিউমাটিজিম রোগীদের কথা যেন ভুলে না- যাই ; তাদের কাছে এটা প্রায় জীবনদায়ী। তাছাড়া, এপিডেমিওলজিকাল অঙ্কে, এই কোভিড ১৯ রুগীর সংখ্যা নিখুঁত ভাবে আগাম বলা অসম্ভব। তাই এই ওষুধের যোগান বনাম চাহিদা কেমন দাঁড়াবে, তার ভবিষ্যৎবানী করা বেশ কঠিন। তবে কেন্দ্র ও  রাজ্যের  ড্রাগ কন্ট্রোল জাতীয় সংস্থা, ওষুধ কোম্পানি, পাইকেরি ও  খুচরো বিক্রেতার মধ্যে ভালো সমন্বয়ের প্রয়োজন।

আমাদের দেশে এখন উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রবল হাওয়া। এই ওষুধের রপ্তানি নিয়ে, মোদী সরকারের মহান কর্মকাণ্ড নিয়ে একটা প্রচার চলেছে। মার্কিন দেশে ওষুধের মার্কেটে ভারতের  আধিপত্য বাড়বে, একটা গর্বের ব্যাপার ইত্যাদি। কিন্তু কঠিন বাস্তব হল, ভারতের বিভিন্ন কোম্পানি অনেক আগে থেকেই মার্কিন দেশে ওষুধ রপ্তানি করে থাকে। এবং নিম্ন মানের ওষুধ রপ্তানি করার জন্য মার্কিন FDA, ভারতের বড়বড় ফার্মা কোম্পানিদের ওষুধ রপ্তানির উপর বিধি নিষেধ জোরালো ভাবে আরোপ করেছে। কয়েকটা উদাহারণ দেওয়া যাক।

ভারতের সান ফার্মা (SUN Pharma) কোম্পানির ওষুধ রপ্তানির উপর মার্কিন  FDA  নিষেধ সতর্কতা জারি করে এবং এই কোম্পানির গুজরাটের কারখানাটিকে বাতিল করে। Dr Reddy’s Laboratory,  লান্সওপ্রাজল নামে একটি ওষুধের  প্রায় ৫৮, ৬৫৬টি বোতল রপ্তানি করেও, নিম্নমানের কারণে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। রানবাক্সি নিম্নমানের কারণে বেশ কিছু ওষুধ মার্কিন দেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

দেশের এই উগ্র জাতীয়তাবাদীর হাওয়া, ট্রাম্প ও মোদীর আবেগের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে, জরুরী ভিত্তিতে এই হাইড্রক্সিক্লোরকুইন (Hydroxychloroquine) রপ্তানির পরে, তবে কি মার্কিন FDA, ভারতের ওষুধ  রপ্তানির উপর বিধিনিয়ম কিছুটা শিথিল করবে?

 

 

 

 

Facebook Comments