বাংলার মুসলমান ও সন্ত্রাসবাদ | The Background

Saturday, October 24, 2020

Contact Us

Google Play

বাংলার মুসলমান ও সন্ত্রাসবাদ

আবু সিদ্দিক

 My name is Khan, and I am not a terrorist

Rizwan Khan in My Name is Khan

Everybody’s worried about stopping terrorism. Well, there’s a really easy way: stop participating in it.

Noam Chomsky

মুসলমান মাত্রই সন্ত্রাসবাদী নয়, ‘মাই নেম ই্যজ খান’ (২০১০) এই জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার নায়ক রিজওয়ান খানের বিখ্যাত উক্তি ‘মাই নেম ই্যজ খান, অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ টেররিস্ট’ সেটির প্রমাণ। এবং এই সিনেমাটি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি মৌলিক প্রতিবাদ।সন্ত্রাসের কোন জাত হয়  না। সন্ত্রাসীদের একমাত্র পরিচয়—তারা সন্ত্রাসী। কোন ধর্মের বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে এদের এক করে দেখার প্রবণতা আমাদের অজ্ঞতাকেই প্রমাণ করে।সিনেমার মূল যুক্তি যে পৃথিবীতে শুধুমাত্র দুধরনের মানুষ আছে—এক, ভাল মানুষ; দুই, মন্দ মানুষ। ভাল মানুষ মানুষের অনিষ্ঠ করে না, মন্দরা সেটিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। এই সহজ সত্যটি সব ধর্মের  জ্ঞানপাপীদের  বুঝতে কষ্ট হয়!আর এখান থেকেই গুরু, সব গোলমালের শুরু।

বাংলার মুসলমানরা শিক্ষা, অর্থ সবদিক থেকে পিছিয়ে এ কথা আগেই বলেছি। কিন্তু এরা কেউ সন্ত্রাসী নয়; এরা কখনও সন্ত্রাসী হতে পারে না। দিন আনা দিন খাওয়া বাংলার অগনিত মুসলমান ভীরু, দুর্বল, ও তারা সহজ সরল জীবনে অভ্যস্ত। বেশীরভাগ বাঙালি মুসলমানের গ্রামীণ জীবন চাল ডাল ‘প্যাটের’ ব্যাথাকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খায়। আর বাংলার শহুরে ছিটে ফোটা  মুসলমান ‘গেটো’ জীবন কাটায় কলুর বলদের ন্যায় ঘানি টানতে টানতে।আর বেশ কিছু বাঙালি মুসলমান ঘরের যুবকরা বাংলার বাইরে ছোট-বড়ো  শহরে নানা কাজে, বিশেষ করে নির্মাণ শিল্পে  সাময়িক ভাবে নিয়োজিত। এই ‘দেশান্তরি’ মুসলমান ভাইদের দূরপাল্লা ট্রেন ধরার জন্য উপচে পড়া ভিড়ের লম্বা লাইন নিউ কুচবিহার, নিউ জলপাইগুড়ি, বর্ধমান, শিয়ালদা ও হাওড়া স্টেশনে চোখে পড়ে।এরা ছয়মাস নয়মাস পরে অনেক গালিগালাজ খেয়ে, কিছু পয়সা নিয়ে গ্রামে ফেরে। বোনের বিয়ে দেয়, বুড়ো বাপ মার চিকিৎসা করায়, আর পারলে দুটি ইট গাঁথে চোখে স্বপ্ন, বুকে আশা নিয়ে।তারপর আবার পাড়ি দেয় বাংলার বাইরে ‘প্যাটের’ জ্বালায়। আর এই মুসলমানরাই নাকি সন্ত্রাসী! আর তাদের টিনের বা পাকাটির খারিজী মাদ্রাসাগুলি নাকি সন্ত্রাসের আখড়া! ভেজলামি আর কাকে বলে! ভেজাল খেয়ে, ভেজাল জীবন পালন করে, ভেজাল কথা বলা কোন অসম্ভব বাহাদুরি হতে পারে না। তা আজকাল যেখানেই যান, সবই ভেজাল আর ‘জালি’ মালে পাল্লা-পাল্লি, এ বলে আমাকে ‘দ্যাক’, ও বলে আমাকে ‘দ্যাক’! তাই বাংলার ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ মুসলমানদের কপালে অনেক গালিগালাজের  মধ্যে সন্ত্রাসী লেবেলটিও জোর করে সাটিয়ে দেওয়া হয়।

বাংলার মুসলমানদের সঙ্গে বিশ্ব মুসলমানের তুলনা হাস্যকর ও বেমানান। এমনকি বাংলারই শহুরে উর্দুভাষীদের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের মিলের থেকে গরমিল বেশি (ধর্ম যদিও এক)। আসলে, ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে আশরাফ ও আতরাফ ব্যতিরেখেও, আরও অনেক অমিল আছে। Irfan Engineer  লিখেছেন,

Muslims are divided into numerous sects such as wahabis, deobandis, ahle-hadis, bohras, khojas, memons, etc. Each sect claims itself to be more loyal adherent than the others.  Muslims are also divided on regional, class and caste lines, e g, sheikhs, ansaris, qureshis, pathans, syeds, bagwans, and so on. Sociologically, there is hardly any commonality  between these communities, except that they are all followers of Islam. These communities rarely mix with each other and zealously guard their own identities. Each sect maintains a separate mosque. The syeds, the sheikhs and the pathans consider themselves superior and the low caste converts like qureshis and ansaris in contempt. The uppercaste converts to Islam, like the bohras and the khojas, have strong prejudices    against other Muslims whom they address as ‘miabhai’.[1]

উপরে উল্লিখিত স্কিম অফ থিংস –এ  বাংলার মুসলমানদের কোথায় ‘ফিক্সেশন’ হবে তা আমার জানা নাই। শুধু মিয়াভাই শব্দটি উপহাসের সুরে মাঝে মাঝে কানে আসে কারো কারোর মাধ্যমে। সত্যিকথা বলতে কি, আমি বাঙালি  মুসলমান ঘরে জন্ম গ্রহণ করে এবং বাংলার সবুজ সোনালি খেত ও মাঠঘাট দেখে বড় হয়েছি। এখন কপাল গুনে আর একটু পরিশ্রমে দু এক পাতা বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারি। আর এই পড়তে গিয়ে দেখি বাংলার মুসলমানদের সব ফাঁকা।আসল মুসলমানরা এদের ‘শেরেক’ বলে, আর হিন্দুরা এদের শুধু মুসলামানই ভাবে, বাঙালি বলে কখনও কাছে ডাকে নি।বাংলার মুসলমানদের এই ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ অবস্থা দেশভাগের সত্তর বছর পরেও কিছুই সেরকম পরিবর্তন হয় নি। আর যদিও বা কিছু হয়ে থাকে, সেটুকু  খুব একটা বিশেষ কিছু নয়। তাই আমি বুঝতে পারি না বাংলার মুসলমানদের আসল আইডেন্টিটি কি? তাদের আইডেন্টিটি কি একক? না, অনেকগুলি আইডেন্টিটির মিশ্রন? উত্তরের অপেক্ষা না করে আমার মতে বাংলার মুসলমানদের আইডেন্টিটি আর বাংলার হিন্দুদের আইডেন্টিটি একই (ধর্ম ব্যতিরেখে, যদিও সেখানেও দীর্ঘ দিনের পাশা পাশি বাসের ফলে, বিবিধ মিল বিদ্যমান আজও)। এরা প্রথমে বাঙালি। পরে সে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ইত্যাদি।

বাংলার মুসলমানদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মেরও কোন যোগ নেই। দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে (যদিও সেগুলির স্থান ইসলামে নেই) এমন বড় করে রঙ মাখিয়ে মিডিয়া উপস্থাপন করে, যেন মনে হয় বাংলার আধপেটা নিরীহ প্রান্তিক ভীরু মানুষগুলি রাতারাতি সব সন্ত্রাসীতে পরিনত হয়েছে। ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি, বৌ-বাচ্চা ছেড়ে পাকিস্থান, আফগানিস্থান, বা সিরিয়াতে জঙ্গি ট্রেনিং নিতে সবাই পাছার লুঙ্গি তুলে, আর পায়ে প্লাস্টিকের চপ্পলের ফ্যাট ফ্যাট শব্দ করে দৌড় মারছে। সিমি, আই এস আই এস, তালিবান,  আল কায়দা, হরকাতুল জিহাদ (হুজি), বোকো হারাম, হামাস, হিজবুল্লাহ আরও হাজার সন্ত্রাসীর দলে যেন সবাই পাততাড়ি গুটিয়ে নাম লিখিয়েছে।ব্যাপারটি এমন হাস্যকর জায়গায় পৌচেছে, যে এখন সাইকেলের টায়ার ফাটলেও মুসলমানদের সন্দেহ করে ফরেন্সিক রিপোর্টর দাবি  করা হতে পারে যে সেটির পিছনে তাদের জঙ্গি হাত আছে কি না সেটি তদন্তের জন্য! এসবের পিছনে বাংলার তুলনামূলক শান্তির পরিবেশকে বিশিয়ে তোলার একটি ঘৃণ্য বিকৃত প্রচেষ্টা সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান।তাই বাংলার আপামর জনসাধারণকে সাবধান থাকতে হবে। প্রতিজ্ঞা করতে হবে আমরা যেন কোন ধর্মের বিকৃত দর্শনের ফাঁদে পা না দিই। আমাদের আজকে ধর্মের ব্যবসায়ীদের সনাক্ত করে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। ধর্মকে কাজে লাগিয়ে যারা নিজেদের টার্গেট পূরণ করতে চায়, তারা আর যাই হোক ধার্মিক নয়। আর এই সচেতনতাই  ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একমাত্র সহায়ক বলে আমি দাবি করি এবং সেটি বিশ্বাস করি।

সন্ত্রাসবাদ কি?সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তির মূল কারন কি? সন্ত্রাসের বহুবিধ রুপ এবং ইসলামের সঙ্গে তাদের যোগ, ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলি আমরা  এল আলি খানের[2]  কাছ থেকে জেনে নিই। Terrorism is basically a story of  violence. It is the pathology of unresolved grievances. When international institutions fail to resolve conflicts involving aggrieved populations, this systematic failure spawns violence in forms of terrorism (p.15). ব্যাপকার্থে, সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ধর্মের কোন যোগ নেই; এটি মানুষের বহুদিনের নানাবিধ ক্ষোভের আউটলেটের একটি হিংসাত্বক মাধ্যম মাত্র। কিন্তু এখন সন্ত্রাসের কথা বলতেই ধর্মের ব্যাপারটি অটোম্যাটিক চলে আসে।এবং স্বীকার করতেই হবে যে, ইসলামিক সন্ত্রাসের ত্রাস পশ্চমি দেশগুলির মাথাব্যাথার অন্যতম কারন হয়ে দেখা দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। একমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যার সম্ভব। কিন্তু উন্নতদেশগুলির সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও ক্ষমতার দাদাগিরি প্রদর্শন সেই পথটিকে বন্ধ করে রেখেছে। তাই ওয়েস্টার্ন মিডিয়া যা দেখাই, আমরা তাই দেখি, তারা যা আমাদেরকে খাওয়ায়, আমরা তাই খেতে ভালবাসি। একজন আমেরিকান সৈনিক বা সাংবাদিক আফগানিস্তানে বা পাকিস্থানে মারা গেলে বিশ্বের মিডিয়া তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আমাদের বুদ্ধির গোঁড়ায় আগুন দিতে থাকে। আর প্রতি মুহূর্তে বিশ্বব্যাপি হাজার হাজার অখ্রিস্টান শিশু ও নারির জীবন থেকে ঝরে পড়ার খবর কোন ‘খবর’ হতে পারে না। আমাদের ধী শক্তি এতই প্রবল! আমাদের বেশিরভাগ চিন্তাধারাই  পশ্চমি  দাদাদের থেকে ধার করা। আমাদের নিজস্ব কিছুই নাই! তাই বাংলার গরীব ও প্রান্তিক মুসলমানদেরকে কেউ কেউ সন্ত্রাসের সঙ্গে যোগ করে  দেখার উগ্র বাসনা ত্যাগ করতে পারছেন না।প্যালেস্তিয়ানদের সমস্যা, চেচেনদের সমস্যা, মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সম্যসা, আমাদের এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। এদের জীবনের কোন মুল্য নাই। জীবনের মুল্য আছে শুধু উন্নতদেশগুলির কিছু সাদা চামড়ার ধরিত্রীর মাতৃদুগ্ধ  হরণকারীদের!

এখন জিহাদ আর সন্ত্রাসকে এক করে দেখা হচ্ছে। ইসলামে জিহাদের কথা বলা হয়েছে শুধুমাত্র আত্মরক্ষার তাগিদে। এবং জিহাদ কখনও মুসলিমরা আগে করবে না, একথা কুরানেই বলা আছে। The notion of jihad is being attacked and equated with terrorism. For fourteen hundred years, Muslims have used the Quran’s concept of jihad do defend themselves against oppression, alien domination, and persecution. Generally Muslims live in peaceful way and the notion of jihad and hijra are non-operational. Jihad and hijra are reactive, and not proactive strategies. They are responses, not gratuitous initiations. Muslims are inspired by the notion of jihad to fight, but the reason for fighting is persecution. Terrorism experts distort this fact to argue that Muslims are addicted to violence because jihad is the mystical promptings for killing. They opine that Islamic terrorism is addictive, metaphysical, and incorrigible, always finding new excuses to perpetuate violence. Nothing is farther from the truth (Khan, 6-7).

Islam is not a religion of compulsive warriors designed to resolve their conflicts only through the use of force. Muslims have no a priori, ontological commitment to violence. Islam is a religion of peace and teaches its followers to show ‘forgiveness’ and they are frequently advised not to be cruel and inhumane.  But Islam is not a utopian ideology. It is rather a practical religion. It supports ‘balanced’ view of life. And under ‘specific circumstance’, for in case of persecution, brute force is allowed to be used as a means of prevailing a way of justice to the persecuted (Khan, 171).The Basic Code, consisting of the Quran and Prophet’s Sunna, strongly disapproves a do-nothing, fatalistic approach to oppression. Stoic indifference to a state of servitude, occupation, tyranny, religious persecution, and so on is not a part of the Islamic way of Life. Oppression is not God’s Will. And subordination to oppression is not God’s way. Prayers alone are not enough. God helps them who help themselves (Khan, 170).

Generally Muslims are peaceful and forgiving people. However, they are prepared to die and kill if their Islamic way of life is in extreme jeopardy. This militancy is a unique element in the realm of spirituality, which distinguishes Islam from the more pacifist religion of the world (Khan, 177). There are different forms of jihad in Islam, such as spiritual jihad, military jihad, and financial jihad.  Spiritual or peaceful jihad is a primary duty as are the daily prayers and fasting. The aim of this jihad is to become a spiritually free human being who submits to none bot God. At the individual level its emphasis is on the purgation of the self by overcoming the forces of greed, impatience, revenge, and deliberate falsehood. Spiritual jihad shuns all forms of violence, and instead conducts a peaceful struggle, without causing physical harm to anybody’s life and property (Khan, 178-79).

বাংলার মুসলমানদের মধ্যে মিলিটারি জিহাদ বা ফিনানশিয়াল জিহাদ অনুপস্থিত। তাদের সে শক্তি ও সামর্থ্য কিছুই নেই। এবং সেই জিহাদের পরিস্থিতি বাংলা তথা সারা ভারতেও তৈরি হয় নি। ভারতীয় মুসলমানরা ইসলামের দর্শনে অনড়। মুসলমান দেশগুলিতে যখন শুধুই অন্ধকার, তখন ভারতের বুকে মুসলমানরা তুলনামূলক সুখে শান্তিতে আছে। গণতন্ত্র তাদের বড় হাতিয়ার। তাদের মধ্যে জিহাদ আছে ঠিকই, সেটি হল জিহাদের শান্তিপূর্ণ বা আধ্যাত্মিক রুপ। আর এই জিহাদ হিন্দু ধর্মেরও মূল কথা। এই জিহাদের আসল সারমর্ম হল  আত্মার মুক্তি— নিজেকে লোভ, মিথ্যা, হিংসা, প্রতিশোধ স্পৃহা, অস্থিরতা কে জয় করে। এই জিহাদের মাধ্যমে একজন পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পারে, আত্ম-শুদ্ধিকরণ ও আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমে। সব ধর্মের মূল কথা – ‘নিজেকে জানো’ (know thyself)। এবং এই নিজেকে জানা বা চেনার কাজটি ইসলামিক আধ্যাত্মিক জিহাদের প্রধান উদ্দেশ্য। অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরব কবি ও সুফি সাধক আবুল আলার কবিতাগুলি উপরের কথার প্রমাণ স্বরূপ,

নবী ও বেহেশত সম্পর্কে তিনি বলেন,

আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন ঈশ্বর নাই—এ সত্য কথা।

মনেই আছেন নবী।

অন্ধকারে বেহেশত খুঁজে মরে যে মানুষ

সেতো তোমার আমার মধ্যে।

এখানে ক্ষিতিমোহন সেনের দেওয়া হিন্দু ধর্মের ব্যাখার সঙ্গে আবু আলার দর্শনের ইসলাম অনেকটা মিলে যায়। সেনের মতে, উপনিষদগুলি গড়ে উঠেছে ব্রহ্ম  ও আত্মার তত্ত্বকে কেন্দ্র করে।ব্রহ্ম  শব্দটির অর্থ সর্বব্যাপী ঈশ্বর।আর আত্মা অর্থে  জীবাত্মা বা জীবের অস্মিতা। উপনিষদের দৃষ্টিতে ব্রহ্ম  আর আত্মা   অভিন্ন। সেই পরম এক প্রত্যেক জীবের মধ্যে প্রকাশ করছেন নিজেকে। এই ভাবনার মধ্যেই   অধিকাংশ হিন্দু ধর্মচিন্তার মর্ম কথাটি বলা হয়ে গেছে। এরই উদাহরণ শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদ। এই তত্ত্ব ব্রহ্ম  থেকে স্বতন্ত্র কোনও বিশ্বের অস্তিত্বকেই স্বীকার করে না।[3]

‘মনেই আছে নবী’ যার অর্থ মনের আধার আত্মাই সবকিছুর মুলে।অথবা তার আর একটি বিখ্যাত কবিতা আমরা উল্লেখ করতে পারি যেখানে ধর্মের বাহ্যিক প্রকরণের বিরুপের কথা বলা হয়েছে; এটিও এক ধরণের জিহাদ।

আনুষ্ঠানিক আরাধনা ও অলস প্রার্থনা

ত্যাগ কর। উৎসর্গিত মেষ থেকে থাক দূরে।

তোমার পানের জন্য ভাগ্য আনবে বয়ে

পেয়ালা ভর্তি নিদ্রা কিংবা দুঃখ।[4]

এখন জিহাদের এই শান্তিপূর্ণ রুপকে আড়াল করে তার মিলিটারি চেহারাটি তুলে ধরা হচ্ছে। অধ্যাপক জিয়াউদ্দীন সরদার তাই মন্তব্য করেন,  জেহাদ শব্দটি এখন একটিই অর্থ বহন করছে—পবিত্র যুদ্ধ। এটিও অবনমনের এক উদাহরণ কারণ, শব্দটির অন্তর্বস্তুর  বিকৃত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তার আধ্যাত্মিক, বৌদ্ধিক ও সামাজিক বিষয়গুলিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সন্ত্রাসবাদসহ যে কোন ধরনের যুদ্ধের স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে জেহাদ কথাটিকে।সুতরাং কোনরকম নৈতিকতা ব্যতিরেখে ধর্মীয়   ধ্বনিমাধুর্যহীন ও অর্থশূন্যভাবে যে কোন ব্যক্তি আর এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে জেহাদ ঘোষণা  করতে পারেন। জেহাদের প্রথম দিকের অর্থ এর থেকে বড় বিকৃতি আর হতে পারে না বা বিকারের দিক থেকে আর এগিয়ে যাওয়া যায় না। ব্যক্তি স্তরে অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম, বুদ্ধিগত প্রচেষ্টা ও সামাজিক গঠনসহ তার জন্মগত বিষয়গুলি—এসবই উবে  গেছে।[5] 

কুরানের যে ছয়টি ভার্সকে  নিয়ে এত বিতর্ক ও যেখান থেকে মুসলমানরা জিহাদের অনুপ্রেরণা পায় বলে সবসময় অভিযোগ করা হয় সেগুলি হল,

Fight in God’s cause against those who fight you, but do not overstep the limits: God  does not love those who overstep the limits (2: 190). Kill them wherever you encounter them, and drive them out from where they drove you out, for persecution is more serious than killing. Do not fight them at the Sacred Mosque unless they fight you there. If they do fight you, kill them—this is what such disbelievers deserve– (2: 191) but if they stop, then God is most forgiving and merciful (2: 192). Fight them until there is no more  persecution, and worship is devoted to God. If they cease hostilities, there can be no  [further] hostility, except towards aggressors (2: 193).  A sacred month for a sacred month: violation of sanctity [calls for] fair retribution. So if anyone commits  aggression against you, attack him as he attacked you, but be mindful of God, and know that He is with those who are mindful of Him (2:194). Spend in God’s cause: do not contribute to your destruction with your own hands, but do good, for God loves those who do good (2: 195).  [6]

কুরানের এই অংশটিকে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা ও সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞরা যে যার সুবিধার্থে ব্যাখ্যা করছে তৎকালীন প্রসঙ্গকে ব্যতিরেকে। আর এখানেই যত সমস্যার সৃষ্টি। ইসলামের উদারতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বা ইসলামকে কালিমালিপ্ত করতে কুরানের এই ভার্সগুলিকে উল্লেখ করা হয় তাদের যুক্তির অনুকূলে। এম এ এস আব্দেল হালিম তাই ব্যাখ্যা করেছেন,

‘Slay them wherever you find them (2:191)’ thus translated by Dawood and taken out of context, has been interpreted to mean that Muslims may kill non-Muslims wherever they find them. In fact the only situations where the Qur’an allows Muslims to fight are in self defence and to defend the oppressed who call for help (4:75). The pronoun ‘them’ here refers to ‘those who attack you’ at the beginnig of previous verse. Thus the Prophet and his followers are here being allowed to fight the Meccans who attack them.

‘wherever you find them’ or ‘come up against them’ is similarly misunderstood. the Qur’an simply reassured the Muslims that they could defend themselves when attacked, even if they killed their attackers, whether within the sanctuary or outside it. And these six verses concerning war impose many restrictions on Muslims to fight and the language of the said verses  is one of restrain that strongly appeals Muslims’ conscience. In the six verses there are four prohibitions; seven restrictions (one ‘until’, four ‘if’, two ‘who fight you’); as well as many warnings like ‘in God’s cause’, ‘be findful of God’, ‘God does not love those who overstep the limits’, ‘be mindful of God’, ‘He is with those who are mindful of Him’, loves ‘those who do good’ and ‘God is most forgiving and merciful’. The underlying message is crsytal clear. The message of the Qur’an is one of peace and tolerance but at the same time it allows self defence.[7]

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, কুরান কথায় কথায় জিহাদ বা পবিত্র ধর্মযুদ্ধের অনুমতি দেয় না। কুরানের বার্তা হল মুখ্যত শান্তি ও সহিষ্ণুতা। রাস্তায় অমুসলিমদের দেখা হলেই অ্যাটাক করতে হবে বা অমুসলিমদের সঙ্গে সুখে শান্তিতে মুসলিমদের পাশা পাশি বাস করা যাবে না, ইত্যাদির ন্যায় উগ্র ও মনুষ্য ধর্মের পরিপন্থি কথা- বার্তার প্রশ্রয় কুরানে নেই।কুরানের ভুল ব্যাখ্যা করে বলা হচ্ছে যে এই ধর্মগ্রন্থই যত ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়ি। কুরান ধর্মযুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়েছে একমাত্র আত্মরক্ষার কথা ভেবে। মুসলমানদেরকে যদি কেউ  ভিটে মাটি ছাড়া করতে বাধ্য করে বা মুসলমানরা যদি এক্সট্রিম পারসিকিউশনের কবলে পড়ে, সে ক্ষেত্রে কুরান  মুসলমানদের হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বলে নি। আত্মরক্ষার জন্য তাদেরকে হয় জিহাদ নয় হিজরার পথ অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছে। জিহাদের সারমর্ম এটিই। এর সাথে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের কোন সম্পর্ক নাই।

এখন জিহাদের আধ্যাত্মিক রুপ মুছে  ফেলে তার মিলিটারি রূপটিকে জাহির করার উগ্র প্রচারের বিকৃত মানসিকতা ইসলামিক দেশগুলিকে গ্রাস করেছে। এবং এর পিছনে পশ্চিমি   সাম্রাজ্যবাদ ও  বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠীর ধর্মীয়  নেতারা মূলত দায়ি। এছাড়া সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতার বাস্তবতা অনেকাংশেও দায়ি।মুসলিম দেশগুলিতে  বেকার যুবকদের মধ্যে ইসলামের শান্তিপূর্ণ আদর্শগুলিকে এমন ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় যে তাদের মনে হয় যে, জিহাদের মাধ্যমে শহিদ হওয়া একটি অতুলনীয় মর্যাদা ও গর্বের ব্যাপার, আর তার স্থান স্বর্গের প্রথম সারিতে একেবারে পাঁকা। এছাড়া মোটা টাকার প্রলোভন তো আছেই। জিহাদ এখন একটি রমরমা ব্যবসার আকার নিয়েছে। আয়েশা জালালের দক্ষিণ এশিয়ার জিহাদ সম্পর্কে আশ্চর্যরকমের বিশ্লেষণী ক্ষমতা আমাদের অবাক করে।তার বাস্তবের নিরিখে ইসলামিক জিহাদের বিশ্লেষণ থেকে আমরা অনেক অজানা কথা জানতে পারি। পাকিস্থানের জিহাদি মাদ্রাসাগুলির কাজকর্মের ছবি তার লেখায় নিম্নরূপ,

Most of the madrassas in Pakistan have a sectarian base. The curricula are often modeled on the eighteenth century Waliullah and Nizami modes of Muslim education. Students  are forced to memorize the Quran in order to be religious functionaries later.  The teacher  is not merely a facilitator; he is a seer divinely endowed with unquestionable authority. Stiff discipline is matched with an isolationist worldview. The beliefs of each sect are  sacred. Muslims who do not adhere to them are immediately declared infidels. Students are taught to refute the beliefs of the other sects. They are particularly taught to hate all manifestations of Western modernity. The hatred for secular and rational forms of knowledge transformed madrassas into factories for turning  out a deadly form of  religious bigotry. Pitched battles between Barelvis, Deobandis, and Ahl-i- Hadith, are fought out against the backdrop of a flourishing black market in arms and drugs ( Jalal, pp. 276-77). [8]

মুসলমান যুবকরা কেন জিহাদে আকৃষ্ট হচ্ছে? শুধু কি মোটা টাকা না শহিদ হয়ে চিরস্বর্গ বাসের অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছে? না আরও কিছু এক্সট্রা? The appeal to Jihad is best understood against the backdrop of popular ideas about fighting in the way of Allah to gain the ultimate honour of being a martyr. By eulogizing death on the battle field as the highest tribute to Islam, the militants have made a compelling incentive, the promise that jihadis can achieve worldly status as well as religious sanctity simultaneously. Many young men and some women enlist their names in jihad to die for God’s cause. Martyrs’ families are promised material comforts, respect, and the greatest reward of all—a guaranteed place in paradise. Parents whose sons have died in killing an infidel, instead of mourning, celebrate their deaths by distributing sweets and offering prayers to Allah. Jihad has become a roaring business in Pakistan because it appeals to the imagination of people whose prospects otherwise are severely limited. Death offers worldly glory and a place in heaven hereafter whereas their lives on earth would otherwise hold nothing but oppression and humiliation.

Jihadis are convinced that there is, besides the lure of unearned fat money, more honour and prestige in jihad than in any other profession. Jihad is thought to be the only honourable thing left to Muslims. And the personal ambition of the leaders of different sects always outweighs ethical considerations. Consequently, the extreme rivalry, verbal abuse, and gory clashes between different sects have become normal incident rather than an exception one. In sheer excitement the jihadis often flaunt their weapons in the streets, teasing school girls, exhorting money and other services from the local shopkeepers. Displaying weapons in fashion has been a symbol of immaculate Islamic heroism to them. All militant outfits attribute miracles to their men and highlight them as modes of Islamic ethics, purity, and heroism. Such illuminating and alluring portrayals generate a sheer enthusiasm for the jihadis. The sectarian clerics’ crude rhetoric paint a dazzling canvass before the eyes of the jihadis, where fantasy and passion, blood and glory blend in exquisite ways to blur distinctions between the imaginary and the rational,  the spiritual and the temporal (Jalal, pp. 287-89).

১।   Die now, die now, in this Love die: when you have died in

this Love, you will receive new life…

Be silent , be silent; silence is the sign of death; it is because

of life that you are fleeing from the silent  one.

২।   We drink the wine of martyrdom, swaying in ecstasy;

this living is not living, we live by getting our heads cut

off.

We love to receive the gifts of our religion;

When we bequeth gifts, it is of our lives.

We became homeless for your religion—

Oh, Allah, accept our sacrifices. (qtd. in Jalal, 302)

ইসলামের জিহাদের দুটি ধরনের (একটি আধ্যাত্মিক, একটি মিলিটারি/আর্মড স্ট্রাগল)পথ কত আলাদা তা আমরা উপরের  কবিতাদুটি থেকে খুব সহজেই বুঝতে পারি।প্রথম কবিতাটি পার্সিয়ান কবি জালালুদ্দিন রুমির (১২০৭-১২৭৩)।দ্বিতীয়টি হল লস্কর-ই-তৈবার নেতা আবদুল্লা শাবান আলির। প্রথমটিতে,  জিহাদকে মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে গেলে যে নৈতিক লড়াই দিনে রাতে  করতে হয় নিজেকে নিজের সঙ্গে, তার কথা বলা হয়েছে। দুটি পা আর দুটি হাত থাকলেই যে সে মানুষ নয়, মানুষ হতে গেলে তাকে সবার আগে নিজেকে জয় করতে হবে—এই মহান চিন্তাধারা যার উৎপত্তি ও ইতিহাস ইসলামিক সুফিবাদের সঙ্গে পুরনো কাল থেকে যুক্ত, তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। মির্জা গালিবও একই কথা বলেছেন তার কবিতায়।তাঁর ‘খুদা’ কবিতাটি ‘Na thha kuchh to khuda thha kuchh na hota to khuda hota/ Duboya mujh ko honey na hota main to kya hota’ অথবা, ‘বুলালো মুঝে’ কবিতাটি—‘Mehrbaan hokey bulaalo mujhey chaaho jis vaqt/ Main gayaa vaqt naheen hoon ki phir aa bhee na sakoon’ (Khushwant Singh, 44, 40)[9] আল্লার প্রতি গভীর প্রেমের করুণ আরাধনা ও নিজের বিরুদ্ধে নিজের জিহাদের কথার প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কি হতে পারে। ইসলামের এই আধ্যাত্মিক জিহাদ বিশ্বের সব সভ্যতার প্রেরণা হতে পারে। এবং আমি বিশ্বাস করি সব সভ্যতার ইতিহাসে এই জিহাদের কথা উল্লেখ আছে এবং সেগুলি মান্য করে বলে সভ্যতাগুলি তাদের নিজস্বতা ধরে রেখে আজও টিকে আছে। আর শাবান আলির জিহাদ যেটি বিশ্ববাসীর নিকট ত্রাসের সঞ্চার করে, সেটির অনুমতি সাধারন ক্ষেত্রে কুরানে দেওয়া নেই, আছে একমাত্র আত্মরক্ষার তাগিদে। এই সহজ কথাটি আজকের দিনে আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে। না হলে কুরানকে হাতিয়ার করে কিছু ধর্মের ব্যাবসায়ি তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দিন দিন বাড়াবে, আর ইসলামকে কলঙ্কিত করবে। কথায় কথায় যদি ধর্মযুদ্ধের বা বিধর্মীর মাথা কাটার হাতছানি থাকে, তাহলে সেটির প্রশয় কোন ধর্মই দিতে পারে না, কারন এই অনুমতি মানবতার বিপক্ষে।

এস ওয়াজেদ আলী লিখছেন যে ‘জেহাদ’ বা ধর্মযুদ্ধ নিয়ে খ্রিষ্টান লেখকরা ইসলামের নিন্দা করেছেন।স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। শত্রু এক গালে চড় মারলে অন্য গালটি তার দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে ইসলাম একথা বলেনি ঠিকই। আত্মরক্ষার জন্য অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার অনুমতি এবং অধিকার ইসলাম মানুষকে প্রদান করেছে; কিন্তু কেবলমাত্র আত্মরক্ষার জন্য, ধর্ম রক্ষার জন্য, দেশ জয়ের জন্য বা ক্ষমতা বিস্তারের জন্য নয়। শত্রু থেমে গেলে মুসলমানকেও থামতে হবে। যারা ন্যায়ের পথ অতিক্রম করে, অনাবশ্যক  বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ্‌ তাদের ভালবাসেন না। ধর্মের ব্যাপারে বলপ্রয়োগের কোন স্থান কুরানে নেই—লা ইকরাহা ফিদ্দীন কাদ তাবাইয়ানা আর রুশদো মিনাল গাইয়ে—ফামান ইয়াকফোরো বেতাগুতে ওয়া ইউমেনো বিল্লাহে ফাকাদ ইসতামসাকা বিল উরওয়াতিল উসকা লাইনফেসামা লাহা ওয়াল্লাহো সমিউন আলীম (সুরা আলবাকর)—ধর্মের ব্যাপারে জোর জবরদস্তি নাই। নিশ্চয় জেনো, সত্যপথ সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে অন্ধকার থেকে। সুতরাং যে কেউ অপদেবতাকে ছেড়ে আল্লায় বিশ্বাস করবে, সে দৃঢ়রজ্জু ধারণ করবে, যে রজ্জু কখনও ছিঁড়বে না, খোদা তোমাদের সব প্রার্থনাই শুনেন, আর তিনি সবই জানেন। ভিন্ন ধর্মের মানুষদের সঙ্গে ধর্মের বিষয়ে আলোচনার সময় তাদের দেবদেবীদের সম্পর্কে নিম্ন মানের মন্তব্য প্রকাশ করা কুরানে নিষেধ। কেননা তাহলে তারাও আল্লা ও রসুলের বিষয় অপ্রিয় মন্তব্য করতে পারে। সত্যের আলোচনা তাহলে দ্বন্দ্ব ও কলহে পরিণত হবে, আর তা থেকে ভাল কিছু পাওয়া যাবে না। কুরানের ভাষায়—লাতা সুব্বুলাজীনা ইদয়ুনা মিন দুনিল্লাহে ফাইয়া সুব্বুল্লাহা আজওয়ান বেগায়রে ইলমঃ ফাজালেকা জাইয়েন না লে কুল্লে উন্মাতীন আমলাহুম; সুম্মাইলা রাব্বেহীম মারজেয়োহুম; ফাইউনারের উহুম বেমা কানু ইয়া মালুন (সুরা আল আনাম)—তারা আল্লা ছাড়া যাদের পূজা করে, তাদের নিন্দাবাদ করোনা, কেননা তাহলে বিদ্বেষ পরবশ হয়ে না জেনে শুনেই তারাও আল্লার নিন্দাবাদ করবে। প্রকৃতপক্ষে, আমি প্রতেক জাতির নিকট তাদের ক্রিয়া কর্মাদিকে সুন্দররুপে প্রতিভাত করেছি! তারপর, পালকের কাছেই তাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে; আর তখন তাদের কর্মের স্বরূপ তাদের দেখিয়ে দেবেন।[10]

কিন্তু আজকের দিনে ধর্মের নামে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মীয় সংগঠন ও  রাজনৈতিক দলগুলি নিজের নিজের আখের জোগাড় এবং ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে অসম্ভব ব্যাস্ত। সন্ত্রাসের সাথে ধর্মের যোগ প্রবল আকার ধারণ করেছে, যেখানে এই যোগ থাকার কোন কথাই নেই। আর বকধার্মিকদের তাণ্ডব হানহানিতে ও উদ্দাম নৃত্যে চারিদিকে এখন ঘোর অন্ধকার। আলো কোথাও নেই!ধর্ম এখন সন্ত্রাসীদের হাতে বন্ধক হয়ে গেছে।  এবং ভারতের মাটিতে সন্ত্রাসের বিষ ছড়ানোর জন্য মূলত কে বা কারা দায়ি, সে কথা EPW-এর  মাননীয় সম্পাদকের কলামে উঠে এসেছে এভাবে,

If terror derived from religious fundamentalism has one headquarter in India, it is the   RSS. Their younger siblings, the Islamic, Sikh or Christian fundamentalists, though  dangerous in their own ways, cannot match the organisational network, financial muscle or political legitimacy that the RSS – its affiliates and personnel – possess. …the rise of  Islamic fundamentalism among Muslim communities is a serious issue. It has dangerous  consequences, not just for its regressive social and political effects on the Muslims  themselves, and needs to be fought with vigour. Islamic fundamentalism has also incubated and nurtured terrorist organisations and initiated violent acts, not just in India but also all over the world. [11]

যাইহোক, বাংলার মুসলমানরা সন্ত্রাসী নয় একথা আমি জোর দিয়ে বার বার বলতে পারি। এই দোষ বাংলার মুসলমানদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার একটি অশুভ চেষ্টা জোর কদমে চলছে। এরা সহজ অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত। এবং এদের জীবনে আউল-বাউল-ফকির-দরবেশদের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। ফারসী শব্দ ‘দরবেশ’ আর আরবী শব্দ ‘ফকির’ সমার্থক। ধর্মীয় জীবন যাপনের জন্য যে ব্যক্তি দোরে দোরে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকেন, তিনিই দরবেশ। ফকির। কোরাণ মতে, আল্লাহ যেহুতু দ্বীন দুনিয়ার একমাত্র মালিক ও হেফাজতকারী, তাই তাঁর কাছে দুনিয়ার সকল মানুষই অভাবী, ভিখারী, ফকির। ‘দারিদ্যই আমার গৌরব’—ঘোষণা করেছিলেন শেষ নবী মুহম্মদ। আর শেষ নবীকেই সুফিসাধকরা সর্বপ্রথম সুফি বলে মনে করেছেন।[12] ইসলামিক ইতিহাসে এই মরমি ধ্যান ধারণা সেই প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে।  ভারতের কবির, নানক, দাদুর কথা কে না জানে। আর বাংলার ‘মনের মানুষ’ খ্যাত লালন  ফকি্রের গান তো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে পীর পুজা, উরুশ উৎসব এখনও বিদ্যমান। তাই বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামির বন্ধন অনেকটাই আলগা। এদের জীবন যাপন সহজিয়া মতের সাথেই মানানসই। উত্তর ভারতের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বাঈঁজী বাড়ির মহফেল আর ওস্তাদজীর হাত ঘুরে উঁচুজাতের হিন্দুদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে। বাঙালি নিধুবাবু সেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বাংলা রুপ দিলেন, নাম হল নিধুবাবুর টপ্পা। অবাঙালি মুসলমানরাও সেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উর্দু রুপান্তর করে গাইছে। কাওয়ালি, গজল, নাজ, হামদ্। বাঙালি  মুসলমানদের কাছে জাত হিন্দুদের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত রইল অধরা। আবার বাঙালি বলে অবাঙালি মুসলমানদের কাওয়ালি, গজলও রপ্ত করতে পারল না।গ্রামের নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের সাথে বাঙালি মুসলমানের অবাধ মেলামেশা। তাই লালন ফকিরের বাউল, ফকিরি গান এদের কাছে আপন হয়ে উঠলো। নিচুজাতের ভোলাময়রা, বসন্ত চাঁই আর দেবেন ডোমদের হাত ধরে উঠে আসেন কবিয়াল শেখ গুমানী দেওয়ান। লেটো গানের আসর থেকে জন্ম হয় দুখু মিঞার অরফে কাজী নজরুল ইসলামের। ব্রাত্যদের গানের আসর আলকাফ থেকে জন্ম দেয় সৈয়দ মোস্তাফা সিরাজকে। মাঝি মাল্লাদের ভাটির টানে নৌকা বাইতে যে ভাটিয়ালি গান গায়, সেখান থেকে সৃষ্টি মহান আব্বাসউদ্দিনের। এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতও বাঙালি মুসলমানদের মনে সে ভাবে সাড়া জাগাতে পারে নি। রাঢ় বাংলার মুসলমান চাষি হিন্দুদের মতো নতুন ফসল ওঠার সময় ‘লবান’ বা নবান্ন উৎসব পালন করে। এরা নামাজ পড়ে এবং পীরের দরগায় মাটির ঘোড়াও চড়ায়।[13] এই বাংলার মুসলমানরা কখনও সন্ত্রসী হতে পারে না, এটি আমার দৃঢ় বিশ্বাস। চালচুলোহীন বাঙালি মুসলমানরা আল্লাকে ও রসুলকে মানলেও এদের মধ্যে বাঙালি জাতির অনেক শাশ্বত গুন রয়ে গেছে। হিন্দু বাঙালিরা এটি স্বীকার করুক বা না করুক, বাঙালি মুসলমানের এগুলি নিজস্ব সম্পদ। আর মৌলবি মৌলানারা যতই তাদেরকে ইসলামের পথে নিয়ে এসে আসল মুসলমানে পরিণত করার চেষ্টা করুক না কেন, তাদের মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামির জায়গা তৈরি হবে না। কারন একটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি কেবলমাত্র ধর্মের উপর নির্ভর করে না; করে সেই এলাকার আবহাওয়া, ভাষা, খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক, গান বাজনা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ভাবের লেনদেনের উপরেও। তাই বাংলার মাটি বিভিন্ন দিক থেকে নরম হলেও, সন্ত্রাসের বীজ বপন ও তার পরিচর্যার অনুকূল আবহাওয়া এখানে অনুপস্থিত। তাই শুধু ইসলামিক সন্ত্রাস নয়, হিন্দু সন্ত্রাসও এখানে কতটা সুবিধা করতে পারবে সে ব্যপারে আমার সন্দেহ আছে। হাজার বছরের  সুখে দুঃখের  বাঙালি সংস্কৃতি কি এখন শুধু বর্বর ধর্মের ব্যবসায়ীদের পাতা ফাঁদে পা দেবে, না সে সযত্নে অতি সন্তর্পণে ধর্মের ব্যবসায়ীদেরকে এড়িয়ে নতুন করে আবার বাঙালিদের বাঙালি হিসাবেই বাঁচতে শিখাবে—সেটিই এখন দেখার।

সূত্র-

  1. Irfan Engineer, “Politics of Muslim Vote Bank.” EPW, Vol. 30, No. 4 ( January 28, 1995). pp.197-200. Print.
  2. Ali Khan, A Theory of International Terrorism: Understanding Islamic Militancy, Leiden/ Boston: Martinus Nijhoff Publishers,  BRILL, 2006. ProQuest Ebook Central, https://ebookcentral.proquest.com/lib/inflibnet-ebooks/detail.action?docID=468184
  3. ক্ষিতিমোহন সেন, হিন্দুধর্ম, প্রস্তাবনা, অমর্ত্য সেন, অনুবাদ, সোমেন্দ্রনাথ বন্ধোপাধ্যায়, কলকাতাঃ আনন্দ, ২০০৮, পৃ. ৯।
  4. উদ্ধৃত,এস ওয়াজেদ আলী, “মুসলিম সংস্কৃতির আদর্শ” মুসলিম সমাজ এবং এই সময়(দ্বিতীয় খন্ড), সম্পাদক, মইনুল হাসান, কলকাতাঃ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ২০০২, পৃ. ১০৫-১১৮।
  5. জিয়াউদ্দীন সরদার, “ইসলাম ও নতুন ভাবনা”, মুসলিম সমাজ এবং এই সময়(প্রথম খণ্ড), সম্পদনা, মইনুল হাসান, কলকাতাঃ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ২০০২, পৃ.১০৮।
  6. The Qur’an, trans. M A S Abdel Haleem, Oxford: Oxford University Press, 2010, pp. 21-22. Print.
  7. M A S Abdel Haleem, “Introduction”. The Qur’an, trans. M A S Abdel Haleem, Oxford: Oxford University Press, 2010, pp. xxii-xxiii. Print.
  8. Ayesha Jalal, Partisans of Allah: Jihad in South Asia, Cambridge: Harvard University Press, 2008. ProQuest Ebook Central, https://ebookcentral.proquest.com/lib/inflibnet-ebooks/detail.action?docID=3300159
  9. Celebrating the Best of Urdu Poetry, trans. & intro by Khushwant Singh, New Delhi: Penguin Books, 2011.
  10. এস ওয়াজেদ আলী, “মুসলিম সংস্কৃতির আদর্শ” মুসলিম সমাজ এবং এই সময় (দ্বিতীয় খন্ড), সম্পাদক, মইনুল হাসান, কলকাতাঃ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ২০০২, পৃ. ১০৫-১১৮।
  11. “Unravelling Hindutva Terrorism”, Editorials. EPW. ( 45, Issue No. 21, 22 May, 2010).  <http://www.epw.in.iproxy.inflibnet.ac.in:2048/journal/2010/21/editorials/unravelling-hindutva-terrorism.html >, Accessed on July 14, 2017. Web.
  12. আলাউদ্দিন মণ্ডল, উপন্যাসে অন্য স্বরঃ মানিক বন্ধোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং…, কলকাতাঃ নয়া উদ্যোগ, ২০১২, পৃ. ৬৩।
  13. সৈয়দ মাসুদাল হোসেন, “বাঙালী মুসলিমের ঠিকানার সন্ধান”, মুসলিম সমাজ এবং এই সময় (প্রথম খন্ড), সম্পাদক, মইনুল হাসান, কলকাতাঃ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ২০০২, পৃঃ১৩৮-১৪৩

আবু সিদ্দিক ২০১৮ সালে ‘বাংলার মুসলমান’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। বইটির একটি অধ্যায় ‘বাংলার মুসলমান ও সন্ত্রাসবাদ’ নামে। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সেটি হুবহু আকারে ফের প্রকাশ করা হল।

 

 

 

 

 

 

 

 

Facebook Comments