বিহার নির্বাচনঃ বিশ্লেষণের আলোয় | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

বিহার নির্বাচনঃ বিশ্লেষণের আলোয়

আবু সঈদ আহমেদ  

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। এই নির্বাচন  বহুদিক দিয়েই তাৎপর্য্যবাহী। ফলাফলও হয়েছে সেইরকম আকর্ষণীয়।

প্রথমেই আসা যাক এই নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল রাষ্ট্রীয় জনতাদলের কথায়। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা লালুপ্রসাদ যাদব ভারতের রাজনীতির এক বর্ণময় চরিত্র। তাঁর পুত্র তেজস্বী যাদব এই নির্বাচনে প্রচারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন। ফলাফল যাই হোক না কেন, ৭৫টি আসন এককভাবে পেয়ে নিজেকে যুবনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সফল তিনি। গত লোকসভা নির্বাচনে বেগুসরাইয়ে হার থেকে শিক্ষা নিয়ে বামেদের সাথে জোটে আগ্রহী ছিলেন তেজস্বী। আরটিআই করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে ‘আরবান নকশাল’দের সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়না বটে, তবে আগের নির্বাচনে ৩টি আসন থেকে এবার ১২টি আসনে উঠে এসেছে সিপিআই (এমএল-লিবারেশন)। দলিত ভোট পেতেও আরজেডি’কে ব্যাপক সাহায্য করেছে বামেদের সাথে আরজেডি-র জোট, যাকে মহাগোঠবন্ধন বলা হচ্ছে। সিপিআই ও সিপিআই(এম) দুটি আসনে খাতা খুলেছে।  বেশ কিছু আসনে স্বল্প ব্যবধানে পরাজয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দীর্ঘদিন পর ভারতে কোন নির্বাচনে বামদলগুলির এই সাফল্য বিশেষ নজর কেড়েছে।

একেবারেই দরিদ্র বাড়িতে থেকে কাটিহার জেলার বলরামপুরে ব্যাপক ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন লিবারেশনের মেহবুব আলম। ভোট ভাগাভাগীর আশঙ্কায় তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্বীকার করেছিলেন অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন( মিম)-এর তরুণ আইনজীবি আদিল হাসান। এই দল মধ্যবঙ্গ লাগোয়া সীমাঞ্চল অর্থাৎ আরারিয়া-পূর্ণিয়া-কাটিহার-কিষাণগঞ্জ জেলাগুলি থেকে পাঁচটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। যার মধ্যে কংগ্রেস ও আরজেডি-র দুটি করে আর সংযুক্ত জনতা দলের একটি আসন ছিল। এই দলগুলির তরফ থেকে ভোট কেটে বিজেপিকে জেতানোর অভিযোগ প্রাপ্ত তথ্যের বিচারে নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে।

মিমের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যতগুলি আসনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জিতেছে তার মধ্যে কেবলমাত্র তফশীলি জাতি সংরক্ষিত রাণীগঞ্জ আসনেই মিম ও মহাজোটের মিলিত ভোট এনডিএর সামান্য বেশী হয়েছে। যদিও সেই আসনে নোটায় মিমের দ্বিগুণ ভোট পড়েছে। মিমের সাথে জোট করে একটি আসনে জয়ী হয়েছে বহুজন সমাজ পার্টি। সীমাঞ্চল লাগোয়া সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মধ্যবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর-মালদা-মুর্শিদাবাদ জেলাগুলোতে মিমের এই সাফল্যের কি প্রভাব পড়বে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তা নিয়ে চিন্তায় পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি। অধীর চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে যার ছাপ ধরা পড়েছে। ৭০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ১৯টিতে জেতার পর তাঁর বামফ্রন্টের সাথে জোট করে ১৫০টি আসনে জেতার স্বপ্ন অচিরে চৌচির হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল।

প্রাক্তন বিদ্রোহী মুখ্যমন্ত্রী জিতনরাম মাঞ্ঝির হিন্দুস্তান আওয়াম মোর্চা আর সাহনীর বিকাশশীল ইনসান পার্টি পেয়েছে চারটি করে আসন। আসন সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় এনডিএতে যোগ দেওয়ার আগে অবধি এই দুটি দল মহাজোটেরই অংশ ছিল। বহুজন সমাজ পার্টির সাথে জোট না হওয়ার খেসারত মহাজোটকে দিতে হয়েছে বাছওয়ারা, টিকারি, বারাছাত্তি, সাক্রা, বেলহার, হিলসা, ঝাঝা, ভোরের মত আসনে।

দফাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর আসনপ্রাপ্তি বিচার করলে দেখা যাচ্ছে, এনডিএ প্রথম দফায় ৭১টি আসনের মধ্যে ২২, দ্বিতীয় দফায় ৯৪টি আসনের মধ্যে ৫১, তৃতীয় দফায় ৭৮টি আসনের মধ্যে ৫২টি আসনে জয়ী হয়েছে। যোগি আদিত্যনাথের মত নেতাদের এনে উগ্রপ্রচার, ঘরে ঘরে কান ভাঙানো এবং সর্বোপরি মুঙ্গেরে বিসর্জনের মিছিলে পুলিশের লাঠিচালনাকে কেন্দ্র করে অশান্তির ভরপুর ফায়দা নিয়েছে বিজেপি চম্পারণ, মধুবনী, দ্বারভাঙায়। সম্প্রদায়গত ভোট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, কেওটি, গৌড় বাউরাম, জলাএ, বিসফি, আউরাই, ঢাকা, সুপাউল, সুরসান্দ, ফোর্বসগঞ্জ, প্রাণপুর, জামুই প্রভৃতি কেন্দ্রগুলিতে মহাজোট মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরে প্রায় ভোটই পায়নি।

বহুমাত্রিক এই নির্বাচন ভারতের রাজনীতিকে কোন দিকে মোড় নেবে তা ভবিষ্যতই বলবে। আগামীবছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কিরকম রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে বিহারের এই ফলাফল, সেটাও বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার বিষয়।

 

Facebook Comments