মাদ্রাসা শিক্ষকদের বিক্ষোভ ঠেকাতে স্বৈরতন্ত্রই পথ? | The Background

Saturday, October 24, 2020

Contact Us

Google Play

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বিক্ষোভ ঠেকাতে স্বৈরতন্ত্রই পথ?

নাজিব আনোয়ার

আমরা সংখ্যালঘু দরদী চাইনা আমরা চাই আমাদের সাংবিধানিক  অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়, সাফ জানালেন আব্বাস সিদ্দিকী

রাজ্য সরকার অনুমোদিত ২৩৫টি আন-এডেড মাদ্রাসার ৪০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী দীর্ঘ নয় বছর থেকে মিড-ডে-মিল সহ সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ঐ মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকারাও প্রাপ্য বেতন পাচ্ছেন না। পাচ্ছেন না ন্যূনতম সাম্মানিকও। বিগতদিনে তাঁরা বহু আবেদন-নিবেদন করেছেন সরকারের কাছে। ফলাফল শূন্য। এই পরিস্থিতিতে ওয়েস্ট বেঙ্গল রেকগনাইজ্ড আন এডেড মাদ্রাসা টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন ডাকে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে ৩ দিনের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচি নেয়। সংগঠনের পক্ষে সেনাবাহিনীর অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। পুলিশ, কলকাতা পুর কর্পোরেশনেরও অনুমতিও চাওয়া হয়েছিল। সেনা ‘নো অবজেকশন’ সার্টিফিকেট দিয়েছে, যেহেতু জায়গাটা ওদের। কিন্তু না পুলিশ, না কর্পোরেশন, কেউই সাড়া দেয়নি। উপরন্তু, গতকাল অবস্থান-বিক্ষোভ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ওপর নেমে আসে নির্মম অত্যাচার। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাভেদ মিয়াঁদাদ বললেন, গতকাল সকালেই উত্তরবঙ্গ থেকে ধর্মতলা বাস টারমিনাসে এসে নামেন প্রায় শ’খানেক শিক্ষক-শিক্ষিকা। টারমিনাস থেকে অনতিদূরে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছনোর আগেই কলকাতা প্রেস ক্লাবের সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে আটকে ধরপাকড় শুরু করে। অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে হাজির হন। শুরু হয় লাঠিপেটা। অমানবিকভাবে রাস্তার উপর দিয়ে টেনে হেঁচড়ে জামার কলার ধরে শিক্ষকদেরকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। তাঁরা শারীরিক নিগৃহের শিকার হন। শিক্ষিকাদেরকে পেটে বুকে লাথি মারা হয়। লালবাজারে আটকদের দু’ঘণ্টা রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি প্রশাসন। যখন ছোট্ট একটি ঘরে শতাধিক শিক্ষককে ঢুকিয়ে দিয়ে, তিন ঘন্টা হয়ে ন্যূনতম জল পর্যন্ত দেয়নি পুলিশ, তখন আটক শিক্ষকরা অনশন শুরু করেন। তাদের জামিন নেওয়ার জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। নানা টানাপোড়েনের পরে, শিক্ষকরা অবশেষে জামিন নেন। পুলিশ রাতেই অধিকাংশ শিক্ষককে বাসে তুলে দেয়।

জাভেদ মিয়াঁদাদ জানিয়েছেন, আজ অনেক সকালেও পার্ক স্ট্রিট থানার পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের থানায় ডেকে পাঠায়। কিছু জিজ্ঞাসা না করে কয়েক ঘণ্টা বসিয়ে রেখে ফের তাঁদের ময়দান থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও কোনকিছু প্রশ্ন করা হয়নি। অবশেষে, দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ ছেড়ে দেওয়া হয়। এটা হয়রানি জন্যই করা হয়েছে বলে মিয়াঁদাদের অভিযোগ।

এদিকে, এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। ফুরফুরা শরীফ আহলে সুন্নাতুল জামাত সরকারের এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের কড়া নিন্দা করেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ আব্বাস সিদ্দিকী প্রশ্ন তুলেছেন, মাদ্রাসা ও সংখ্যালঘূ উন্নয়ন মন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং তারপরেও দীর্ঘ নয় বছর ধরে মিড ডে মিলের দাবীতে এবং শিক্ষকদের বেতনের দাবীতে কেন শিক্ষকদের পথে নেমে আন্দোলন করতে হয় তাঁর জবাব মুখ্যমন্ত্রীকে দিতে হবে। আব্বাস সিদ্দিকীর আরও প্রশ্ন, ক্ষমতায় আসার আগে তৃণমূল নেত্রী ১০হাজার মাদ্রাসা অনুমোদন দেব বলে অঙ্গীকার করেছিলেন এবং ক্ষমতায় আসার ৬মাস পর বলেছিলেন, সংখ্যালঘূদের ৯৯শতাংশ কাজ করে দিয়েছেন তাহলে আজ কেন শিক্ষকদের লাঠিচার্জ করতে হল?

মুখ্যমন্ত্রী মুখে সংখ্যালঘূ দরদী বলে চিৎকার করলেও আদৌ তিনি সংখ্যালঘূ দরদী নন। আজকের ঘটনায় তিনি আবারও তাই প্রমাণ করলেন। আমরা সংখ্যালঘু দরদী চাইনা আমরা চাই আমাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়, সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আব্বাস সিদ্দিকী।

মাদ্রাসা শিক্ষকদের ওপর এই নির্মম লাঠিচালনা ও গ্রেপ্তারের সমালোচনা করেছে সিপিআইএম ও সিপিআইএমএল (লিবারেশন)।  সিপিআইএম পলিট ব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম বলেছেন, এই রাজ্যে কী প্রতিবাদ করার অধিকার নেই কারও। লিবারেশনের রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষ এক বিবৃতিতে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ অবস্থানের উপর লাঠি চালিয়ে মা-মাটি-মানুষের স্বরূপ আরও একবার স্পষ্ট হল।

আন-এডেড মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর পুলিশী লাঠিপেটা এই প্রথম নয়। ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের সামনে চলা টানা অনশনে আন-এডেড শিক্ষকদের উপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনশন ভেঙ্গে দেয় পুলিশ। তবে ঐ আন্দোলনের ফলে ২৩৫টি আন-এডেড মাদ্রাসাকে অনুমোদন দিতে বাধ্য হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। সরকার সেই সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ধাপে ধাপে পরিকাঠামো উন্নয়ন হবে মাদ্রাসাগুলির। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন নিয়ে কোন প্রতিশ্রুতি সরকার তখন দেয়নি।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়ে একরকম বাধ্য হয়েই শিক্ষক-শিক্ষিকারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভে শামিল হতে যাচ্ছিলেন। তাকে ঠেকাতে সরকার ছিল মরিয়া। সোমবারও নবান্নে ডেকে ওয়েস্ট বেঙ্গল রেকগনাইজ্ড আন এডেড মাদ্রাসা টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনকে সরকারের এক পদস্থ আধিকারিক এই বিক্ষোভ অবস্থান তুলে নেবার আবেদন জানান। তিনি আশ্বাস দেন দাবীগুলির বিবেচনার জন্য। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশন তাঁদের কর্মসূচিতে অনড় ছিল। ফলে, স্বৈরতান্ত্রিক পথই বেছে নিল রাজ্য সরকার। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে জানানো হয়েছে, আগামীদিনের কর্মসূচি ঠিক করতে তাঁরা দিন কয়েকের মধ্যেই বৈঠক করবেন।

ছবিগুলি ফেসবুকের দেওয়াল থেকে নেওয়া। 

 

Facebook Comments