পেনিসিলিন আবিষ্কারের কাহিনী | The Background

Wednesday, September 23, 2020

Contact Us

Google Play

পেনিসিলিন আবিষ্কারের কাহিনী

নাফিস আনোয়ার

[আজ স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের জন্মদিন (১৮৮১-১৯৫৫)। কিন্তু এই কাহিনীর নায়ক তিনি নন্, এই কাহিনীর একমাত্র নায়ক শুধু ও শুধুমাত্র পেনিসিলিন নামের সেই অ্যান্টিবায়োটিকটি]

স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং একবার নয় দু’দুবার ‘দুর্ঘটনা’ ঘটিয়েছিলেন। প্রথমবারের দুর্ঘটনায় আবিষ্কৃত হল লাইসোজাইম আর দ্বিতীয়বার একেবারে সেই ‘মির‍্যাকেল ড্রাগ’ পেনিসিলিন, যার হাত ধরে বদলে গেল বিশ শতকের চিকিৎসা বিজ্ঞান, অ্যান্টিবায়োটিকের যুগ এল ধরাধামে। কিন্তু এটুকু বলে থেমে গেলে পেনিসিলিন আবিষ্কারের গল্পটা যে শুরুই হয় না। সেই সঙ্গে বাদ পড়ে যায় কোটি কোটি মানুষকে জীবনদানকারী এই আবিষ্কারের পিছনের মানুষগুলির পরিশ্রম, অধ্যাবসায় এবং একাগ্রতার কাহিনীও।

বিজ্ঞানের গবেষণার ধাপ থাকে অনেকগুলি। আকস্মিক কোনো ঘটনা সে গবেষণার কাজ এগিয়ে দিতে পারে ঠিকই কিন্তু তা বলে আকস্মিকতাই চালকের আসনে বসে যেতে পারে কি! আর পারে না বলেই স্কটিশ বংশোদ্ভূত স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের সাথে অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী ব্যারন হাওয়ার্ড ফ্লোরে আর জার্মান বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী আর্নেস্ট চেন আর দুই ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর নর্মান হেটলি আর এডোয়ার্ড আব্রাহামের নাম পরপর উচ্চারিত হয় পেনিসিলিন আবিষ্কারের কাহিনীতে। এঁদের মধ্যে প্রথম তিনজন ১৯৪৫-এ নোবেল পেয়েছিলেন এই মহতী আবিষ্কারের জন্য। কিন্তু পরের দুজন স্বীকৃতি পাননি সেভাবে। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন আরেকজন। ডরোথি হজকিনস্। এক্স রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে পেনিসিলিন, ভিটামিন বি১২-র মত গুরুত্বপূর্ণ কিছু জৈব রাসায়নিকের আনবিক গঠন আবিষ্কার করে তিনি রসায়নে নোবেল পান ১৯৮৬৪তে। বিজ্ঞানের যে কোনো শাখায় সেটাই একমাত্র ব্রিটিশ মহিলা বিজ্ঞানীর নোবেল জয়।

 আরনেস্ট চেন

পেনিসিলিন আবিষ্কার বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। আমেরিকা, ইংল্যান্ড অথবা অস্ট্রেলিয়ান জার্নাল কিংবা বইগুলিতে দেখা যাবে যে এই আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব নিয়ে আজও চাপা টানাপোড়েন অব্যাহত। টানাপোড়েন আছে ফ্লেমিংয়ের সেন্ট মেরি’জ আর ফ্লোরের অক্সফোর্ডের স্যার উইলিয়াম ডান স্কুল অফ প্যাথোলজির মধ্যেও। ভাবছেন, আমেরিকার নাম কোথা থেকে এল! পেনিসিলিনকে মানব শরীরের উপযোগী এক ওষুধে পরিণত করে বানিজ্যিক উৎপাদনের বিপুল কাজটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইংল্যান্ড থেকে সে সময় সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল এই আমেরিকাতেই আর সেই সুযোগে পেনিসিলিনের বানিজ্যিক সাফল্যের লাভের গুড়টাও খেয়েছে এই আমেরিকাই। যা হোক এসব বিতর্ক ভুলে পেনিসিলিন আবিষ্কারের গল্পটাই শুরু করা যাক। ১৯২৮-এর সেপ্টেম্বর, শরৎকাল, সপরিবারে বেশ কিছুদিন ছুটি কাটিয়ে লন্ডনের সেন্ট মেরি’জ হাসপাতালে গবেষণার কাজে ফিরলেন বিজ্ঞানী ফ্লেমিং।

‘That’s How You Discovered Lysozyme’:

সেপ্টেম্বর ২৮, ১৯২৮, সকালবেলা। লন্ডনের সেন্ট মেরি’জ হাসপাতালের ল্যাবে ডঃ ফ্লেমিং হঠাৎই আবিষ্কার করলেন একটি পেট্রিডিশে কালচার করা স্ট্যাফাইলোকক্কাস ব্যাক্টেরিয়ার উপর ছাতা পড়ে গেছে আর ছাতা পড়া অংশের ব্যাক্টেরিয়াদের মৃত্যু ঘটেছে। তার সহযোগী মার্লিন প্রাইসের  কাছে  নিয়ে গেলেন সেই ডিশ। তখন এই প্রাইসই মন্তব্য করেন- এভাবেই তো আপনি লাইসোজাইমও আবিষ্কার করেছিলেন। হয়েছিল কী এরও বছর পাঁচেক আগেও এভাবে ব্যাক্টেরিয়া কালচারে ব্যস্ত ছিলেন ফ্লেমিং। সেদিন সর্দি হয়েছিল তাঁর। কাজের ফাঁকে সর্দির একফোঁটা গিয়ে পড়েছিল ডিশে। আর একইভাবে দেখা গিয়েছিল জীবানুর বংশবৃদ্ধি স্তব্ধ করে দিয়েছে সেই সর্দির ফোঁটা। আর সেই ফোঁটা থেকে আবিষ্কার হয়েছিল লাইসোজাইম সম্পূর্ণ আকস্মিক ভাবেই। কিন্তু এবার! এবার কে স্তব্ধ করল জীবানুদের বংশবৃদ্ধি, কে মেরে ফেলল  তাদের!

১৯২৯-এর ব্রিটিশ জার্নাল অফ এক্সপেরিমেন্টাল প্যাথোলজিতে ফ্লেমিং প্রকাশ করলেন তাঁর গবেষণা কথা। Penicillium notetum নামক ছত্রাক থেকে প্রাপ্ত সেই রাসায়নিকের ফ্লেমিং নামকরণ করলেন পেনিসিলিন। কিন্তু সেই পেনিসিলিন কি মানব শরীরে ব্যবহার করার মত পরিমাণে উৎপাদন করা যাবে! মানব শরীরের সংক্রমণে পেনিসিলিনের উপযোগিতাই বা কতটুকু! এসব জানার জন্য দরকার পেনিসিলিয়াম ছত্রাকের চাষ করে তার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিয়মিত পেনিসিলিন নিষ্কাশন পদ্ধতি, সেই পেনিসিলিনের পরিশুদ্ধি ও ঘনকরণের মাধ্যমে ওষুধে পরিবর্তন, তার মানব শরীরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জটিল কার্যক্রম, দরকার এই অজানা পদার্থের সঠিক রাসায়নিক গঠনের প্রতি আলোকপাত। গবেষণালব্ধ সমস্ত কিছু প্রমাণসহ প্রকাশ করতে হয় বৈজ্ঞানিক জার্নালে। তারপর আসে পেটেন্টের মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি আর সবশেষে বাণিজ্যিক উৎপাদন। সে হবে এক বিরাট কর্মকাণ্ড। শুধু এই জীবানু সংক্রমণের ফলে মারা যায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ। তাদের সকলকে বাঁচাতে কী বিপুল পরিমাণই না পেনিসিলিন লাগবে!

 হাওয়ার্ড ফ্লোরে

না ফ্লেমিং এর একটিও করেননি। চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পেনিসিলিন  নামক বস্তুটিকে পেনিসিলিয়াম ছত্রাক থেকে নিষ্কাষনের পর স্থিতিশীল অবস্থায় বেশিক্ষণ ধরে রাখার সঠিক পদ্ধতি পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে পেনিসিলিন  আবিষ্কারের ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যেতে থাকল তিরিশের দশকের ডামাডোলে। তিরিশের দশক, হিটলারের  দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সূচনার তিরিশের দশক। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ মরেছিল সেই যুদ্ধে। যত না সরাসরি মারা গিয়েছিল তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল হাসপাতালে আহত অবস্থায় ভর্তি হয়ে ক্ষতস্থানে সংক্রমণের ফলে। সংক্রমণের ফলে গলা ব্যথা, সর্দি জ্বর, কাঁটা ফোটার মত সামান্য সমস্যাও প্রাণঘাতী হয়ে উঠত সে যুগে। পেনিসিলিন বদলে দিল সব। ১৯৩৯ সাল নাগাদ ফের পেনিসিলিন নিয়ে আগ্রহী হলেন কিছু গবেষক। প্রায় অন্ধকার থেকে তাঁর খুঁজে আনলেন ফ্লেমিংয়ের আর্টিকলটিও।

‘Developing penicillin was a team effort, as these things tend to be’:

একথাটি হাওয়ার্ড ফ্লোরের। লন্ডনের সেন্ট মেরি’জ থেকে এবার আমাদের চলে যেতে হবে অক্সফোর্ডে। সাল ১৯৩৯-৪১। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে পৃথিবী জুড়ে। প্রতিনিয়ত জীবনের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে মানুষ। আর তার মাঝে নিরলস গবেষণায় মগ্ন কিছু মানুষ। তাদের অতীত, কর্মপদ্ধতি, চরিত্র সবকিছু আলাদা। কিন্তু লক্ষ্য সবারই এক। পেনিসিলিনকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী এক ‘জাদু ওষুধে’ পরিণত করা।

প্রথমেই লর্ড হাওয়ার্ড ওয়াল্টার ফ্লোরে। এই সুদর্শন মানুষটিকে অস্ট্রেলিয়া প্রায় জাতীয় নায়কের মর্যাদা দেয় স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যানের মতো। ব্রিলিয়ান্ট তার অ্যাকাডেমিক রেকর্ড। অসাধারণ তাঁর কেরিয়ার। পেনিসিলিন নিয়ে গবেষণায় যখন হাত দিলেন ততদিনে বৈজ্ঞানিক মহলে তিনি যথেষ্ট পরিচিত নাম, অক্সফোর্ডের স্যার উইলিয়াম ডান স্কুল অফ প্যাথোলজির ডিরেক্টরও তিনিই। তাঁর নেতৃত্বই তৈরি হল পেনিসিলিন টিম। মিত্রশক্তিকে তাঁরা শেষমেশ বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে পরমাণু গবেষণার মত পেনিসিলিনও এক অস্ত্র, মানুষ মারার অস্ত্র নয়, মৃতপ্রায় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার অস্ত্র। অক্ষশক্তিও চেষ্টা করেছিল। জার্মানির ল্যাবে পেনিসিলিয়ামের মোল্ড নিয়ে গিয়ে পেনিসিলিন নিষ্কাশন করতে। কিন্তু ততদিনে হিটলারের উন্মত্ত ইহুদি ক্রোধ সে দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পুরো সিস্টেমটাকে নষ্ট করেছে। বহু ইহুদি বিজ্ঞানী দেশ ছেড়েছেন ভয়ে। দেশ ছেড়েছেন আর্নেস্ট চেনও।

 এডোয়ার্ড আব্রাহাম

স্যার আর্নেস্ট বরিস চেন। জার্মান জৈব রসায়নবিদ, জাতে ইহুদি। নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের পরই পালিয়ে এলেন ইংল্যান্ডে। পকেটে মাত্র ১০ পাউন্ড‌। ইংল্যান্ডে থিতু হতে সেই সময় তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেন জে.বি.এস হলডেন ও স্যার ফ্রেডরিক গোল্যান্ড হপকিন্স। এই হপকিন্সের সুপারিশেই চেন যোগ দিলেন অক্সফোর্ডে ফ্লোরের গবেষণাগারে। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের জন্য সবথেকে বেশি দাম চোকাতে হয়েছিল তাঁকেই। বিশ্বযুদ্ধ শেষে পেনিসিলিন আবিষ্কারের বিরাট  সাফল্যের মধ্যে তিনি খবর পেয়েছিলেন জার্মানিতে হলোকাস্টের সময় নাৎসিরা হত্যা করেছে তাঁর মা বোনকে। চেন ও রসায়নবিদ এডোয়ার্ড আব্রাহামের প্রথম কাজ ছিল পেনিসিলিনের বিশুদ্ধকরণ ও ঘণীকরণের সঠিক পদ্ধতিটি আবিষ্কারের। তাঁদের পদ্ধতিটির থেকে অনেক বেশি কার্যকর পদ্ধতির প্রয়োগ করে এরপর পাদপ্রদীপে আসেন নর্মান হিটলি।

নর্মান হিটলি। জৈব রসায়বিদ, এই আবিষ্কারের unsung হিরো, পুরো পেনিসিলিন টিমের মধ্যে প্রধান সংযোগকারী। তাঁর অদ্ভুত দক্ষতা ছিল যে কোনো সমস্যার সমাধানে যথাযত উপায় বাতলে দেওয়ার ক্ষেত্রে। উৎপাদিত পেনিসিলিনকে ফের জলে রেখে তার অম্লতা পরিবর্তন করে পেনিসিলিন উৎপাদনের হার বাড়িয়ে দিলেন তিনিই। আবার পেনিসিলিন উৎপাদনের পাত্রের পরিকল্পনাও তাঁরই। আর পদে পদে জার্মান আক্রমণের ভয়ের মধ্যে গবেষণা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার সমাধানে তিনি উপায় বার করলেন- টিমের প্রত্যেকে যেন তাঁদের কাপড়ে কিছুটা পেনিসিলিয়াম রেণু ঘষে নেয়। ধরা পড়লে যে যেখানে যাক সেখানেই যেন ফের শুরু করতে পারে গবেষণার কাজ।

  গত শতকের চল্লিশের দশকে পেনিসিলিনের বিজ্ঞাপন

যা হোক সে দুর্দিন আর আসেনি। ১৯৪০-এ মে মাসে প্রথমবার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ইঁদুরের উপর সফল প্রয়োগ হল পেনিসিলিনের। সেই তথ্য ফ্লোরে ও চেন প্রকাশ করলেন ল্যান্সেট পত্রিকায়। পুরো ১৯৪০ সাল জুড়ে চলল আরো ইঁদুরের উপর ট্রায়াল আর মানুষের শরীরে প্রয়োগের মত পর্যাপ্ত পরিমাণে পেনিসিলিন উৎপাদনের কাজ। সে কাজ করে গেলেন হিটলি আর আব্রাহাম তখন নিয়োজিত পেনিসিলিন থেকে অপদ্রব্য বাদ দেওয়ার কাজে।

এক পুলিশকর্মী, অ্যালবার্ট আলেকজান্ডার মুখে গোলাপের কাঁটায় ছড়ে গিয়ে সেপ্টিসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মরণাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন। ১৯৪১-এর ১২ ফেব্রুয়ারি তাঁর উপর প্রযুক্ত হল পেনিসিলিন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন তিনি। কিন্তু মানবদেহে পেনিসিলিনের ডোজ, তার প্রয়োগকাল কিছুরই ধারণা নেই তখন। পর্যাপ্ত পেনিসিলিনের অপ্রতুলতায় শেষে মার্চ মাসে মারা গেলেন পুলিশকর্মীটি। এরপরই বিপুল পরিমাণে পেনিসিলিন উৎপাদনের জন্য ব্রিটিশ সরকার বা  ফার্মা জায়েন্ট গ্ল্যাক্সোর কাছে সাড়া না পেয়ে ফ্লোরে চললেন আমেরিকা, সঙ্গে হিটলি।

আমেরিকার ইলিনই প্রদেশের পিওরিয়াতে ইউ এস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচারের নর্থ রিজিওন রিসার্চ ল্যাবোরেটরিতে হিটলি পেনিসিলিনের উৎপাদনের পদ্ধতির আরো উন্নতিসাধনে লেগে পড়লেন। সাথী হলেন অ্যান্ড্রু জ্যাকসন মেয়ার। এই মেয়ারই পরবর্তীতে হিটলিকে এড়িয়ে পেনিসিলিনের পেটেন্ট নেবেন ওষুধ কোম্পানি মার্কের সাথে। এদিকে লার্জ স্কেল বাণিজ্যিক উৎপাদনে দরকার ওষুধের কোম্পানিগুলির সহায়তা। তাদের সাহায্যের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ব্যর্থতার পর ফ্লোরের পুরোনো যোগাযোগ কাজে লেগে গেল এবার। পুরোনো বন্ধু আলফ্রেড নিউটন রিচার্ডস তখন সেখানকার কমিটি অফ মেডিক্যাল রিসার্চের প্রধান। তাঁর উদ্যোগে মার্ক, ফাইজার, লিলি, লিডারলে প্রভৃতি কোম্পানিগুলি এগিয়ে এল সাহায্যে। মাত্র দুবছরের মধ্যে মিত্রশক্তির চাহিদা মেটানোর মত বিপুল পরিমাণে শুরু হল পেনিসিলিনের উৎপাদন। খবর কাগজ, ম্যাগাজিন ‘মির‍্যাকেল ড্রাগ’ পেনিসিলিনের বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেল। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল পৃথিবীর প্রথম কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক।

 নর্মান হিটলি

এর মাঝে আবার আলোয় ফিরলেন স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। ১৯৪২-এর গ্রীষ্মকালে দ্য টাইম পত্রিকা প্রথমবার পেনিসিলিনের সাফল্য সাধারণের গোচরে আনল। আর তা নিয়ে সেন্ট মেরি’জ হসপিটালের অধিকর্তা স্যার আমরথ্ রাইট ও অক্সফোর্ডের রবার্ট রবিনসন যথাক্রমে ফ্লেমিং ও ফ্লোরের পক্ষ নিয়ে নেমে পড়লেন পেনিসিলিন আবিষ্কারের কৃতিত্বের দ্বৈরথে। স্যার রাইটের সহায়তায় মিডিয়ার মূল আগ্রহ দেখা গেল ফ্লেমিংকে নিয়েই। ফুটেজ খাওয়ার ব্যাপারটি যে সে যুগেও প্রচলিত সেটা এখান থেকেই স্পষ্ট। তবে ১৯৪৫-এর শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল অবশ্য পেলেন ফ্লেমিং, ফ্লোরে ও চেন তিনজনেই, পেলেন না হিটলি চারজনকে একসাথে নোবেল না দেওয়ার অদ্ভুত নিয়মে।

হাওয়ার্ড ফ্লোরে ও বাকিদের আর্নেস্ট চেনের আপত্তি সত্ত্বেও অক্সফোর্ড টিম পেনিসিলিনের পেটেন্ট দাবী করেনি। যুক্তি ছিল মানবকল্যানের এই আবিষ্কার নিয়ে তাঁর ব্যবসা করবেন কেন! তার ফলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইংল্যান্ডকে খেসারত দিতে হয় অনেক। শেষে পেটেন্ট নীতিই পাল্টাতে বাধ্য হয় তারা। সবশেষে বলা ভালো পেনিসিলিন আবিষ্কারের কৃতিত্ব কারো একার নয়। স্যার হেনরি হ্যারিস যথার্থই বলেছেন- Without Fleming, no Chain or Florey; without Florey, no Heatley; without Heatley, no Penicillin.

কভার ফটো- স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং লন্ডনের সেন্ট মেরি’জ হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে। ১৯৪৩ সাল।

ঋণস্বীকার:

1.Alexander Flaming, The Man and The Myth- Gwyn MacFarlane

2.The Mold in Dr. Florey’s Coat: The Story of Penicillin Miracle- Eric Lax

3.Wikipedia

 

Facebook Comments