মওলানা ভাসানী প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদপত্রগুলির কুৎসা ও আহমদ ছফার তীব্র কটাক্ষ | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

মওলানা ভাসানী প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদপত্রগুলির কুৎসা ও আহমদ ছফার তীব্র কটাক্ষ

দ্য ব্যাকগ্রাউন্ড  

আহমদ ছফা ৫ আগস্ট ১৯৭৩, ঢাকার ‘গণকন্ঠ’ পত্রিকায় ‘মাওলানা ভাসানীর অপমান-গোটা জাতির অপমান’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেই লেখায় তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদপত্রের তুমুল সমালোচনা করেছিলেন। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ভারতের সংবাদপত্র, পত্র-পত্রিকাগুলির ন্যাক্কারজনক ভূমিকা ফুটে উঠেছিল তাঁর ঐ ক্ষুরধার লেখায়। ছফা তাঁর প্রবন্ধের শুরুতেই বলছেন, “১৯৭২ সনের ১৬ই ডিসেম্বরের পর থেকে ভারতের সরকার সমর্থক এবং বৃহৎ ধনীগোষ্ঠী পরিচালিত পত্র-পত্রিকাসমূহের একটি লক্ষণীয় প্রবণতা এ দেশের জনগণ অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করে আসছেন। দৈনিক ‘আনন্দবাজার’, ‘যুগান্তর’, ‘অমৃতবাজার’, ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’ এবং সাপ্তাহিক ‘দেশ’ ইত্যাদি পত্র-পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর অর্ধসত্য, আজগুবি, কাল্পনিক সংবাদ এবং নিবন্ধাদি প্রকাশ করে আসছেন। এসব করতে যেয়ে পত্র-পত্রিকাগুলো অধিকাংশ স্থলে সাংবাদিক সততাকে হত্যা করছেন, বিদ্বেষপ্রসূত মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করছেন, অন্য একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌম সত্তার প্রতি কুন্ঠাহীন অবজ্ঞা প্রকাশ করছেন ও সে দেশের সম্মানিত গণনায়কদের প্রতি শালীনতা এবং সৌজন্যের কোন  রকম ধার না-ধেরে যাচ্ছেতাই লিখে যাচ্ছেন।”

এই প্রসঙ্গে ছফা তাঁর দেশের শাসকদেরও এক হাত নিয়েছেন। তিনি বলছেন, “আমাদের সংবিধানে একটি অপমানজনক ধারা সংযোজিত হয়েছে। সেই ধারাটির মর্মার্থ হল, কোন বন্ধুদেশের প্রতি কোন রকমের সমালোচনা করা চলবে না। তাই আমাদের পত্র-পত্রিকাগুলোতে এ ধরণের মিথ্যা সংবাদ শালীনতাবিরোধী মন্তব্যের জবাব এবং আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি কটাক্ষকর ইঙ্গিতের কড়া উত্তর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

 আহমদ ছফা যাঁর নাম দিয়ে প্রবন্ধের শিরোনাম লিখেছিলেন সেই মওলানা ভাসানী সম্পর্কে ভারতের মিডিয়ার ভূমিকা কি ছিল সেটা চাঁছাছোলা ভাষায় লিখেছিলেন। তিনি বলছেন, “আমরা কি মনে করতে বাধ্য হব ভারতীয় পত্রিকা ‘আনন্দবাজার’, ‘যুগান্তর’, ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’, এবং ‘অমৃতবাজার’, ইত্যাদি পত্রিকার সাংবাদিকেরা রুচি বলতে কোন বস্তুর সঙ্গে সত্যি সত্যি পরিচিত নন? যদি তাঁদের রুচি থাকে তাহলে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ গণনায়ক মওলানা ভাসানীকে নিয়ে যে ধরণের কার্টুন ছাপছেন, সম্পাদকীয় মন্তব্য লিখছেন সেগুলো কি করে সম্ভব?

“বিগত কয়েকদিন আগে ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডে’ মওলানা ভাসানীর ওপর একদিন কার্টুন ছাপা হয়েছে, তাতে মওলানার শরীর থেকে লুঙ্গি খুলে যাচ্ছে দেখানো হয়েছে। তার কিছুদিন পরে ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় মন্তব্যে মওলানাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করে মাননীয় সাংবাদিক তাঁর ইতর রুচির চরিতার্থতা সাধন করেছেন। এই ২/৩ দিন আগে দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকা সম্পাদকীয় কলামে মওলানাকে ‘বেঈমান’ ঘোষণা করেছেন। তাঁর টুপি, দাড়ি ইত্যাদির ওপর কটাক্ষ করেছেন এবং বলেছেন, এই বাংলাদেশে মওলানা ভাসানীই সাম্প্রদায়িকতার আমদানি করছেন। হাসব কি কাঁদব বুঝতে পারছিনে, ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকা অসাম্প্রদায়িকতার সাফাই গাইছেন- যেন ভূতের মুখে রামনাম। আমাদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, ভারতে যখন জনসংঘ, হিন্দুমহাসভা, আনন্দমার্গ এবং কংগ্রেস ইত্যাদি দল মিলে সাম্প্রদায়িকতার জয়ধ্বনি দেয় তখন আপনারা কোন ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালের রায়েটের সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে চালান দেয়া ইলিশের ঝুড়িতে মানুষের মাথা পাওয়া গেছে এবং উদ্ভট সংবাদ প্রকাশ করে পশ্চিম-বঙ্গে আপনারা কি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাননি? এখন কোন মুখে আপনারা অসাম্প্রদায়িকতার ভেক ধরে মাওলানা ভাসানীর নিন্দে করছেন? কয়লা ধুলে ময়লা যায় না – কথাটি আপনাদের বেলাতেই অত্যধিক সত্য। আপনাদের পত্রিকার রবিবাসরীর সংখ্যায় ‘পাত্র চাই, পাত্রী চাই’ পৃষ্ঠাটির দিকে কখনো দৃষ্টি দিয়েছেন? হিন্দুদের মধ্যে শতসহস্র গোত্রের ভেদরেখাগুলো অর্থ-উপার্জনের জন্য আপনারাই কি টিকিয়ে রাখছেন না? জাতিভেদের মাহাত্ম্য কীর্তন করে অর্থ উপার্জন কি আপনারা নিজেরাই করছেন না?

“মওলানা ভাসানীকে সাম্প্রদায়িক বলা আপনাদের ধৃষ্টতা। তাঁর অনেক কথা-বার্তার মাঝে আমরা একমত না-হতে পারি, কিন্তু আমরা সকলে একবাক্যে স্বীকার করি যে, বাংলাদেশে মওলানা ভাসানী সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতির জনক। তিনি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে পিতামহ ভীষ্মের ভূমিকা পালন করেছেন। আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, আপনারা যে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিকে পুজো করেন, তিনিও এক বয়সে, এক সময়ে মাওলানার ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মুজাফফর আহমদও একসময় ইউরোপে মাওলানা সাহেবের স্যুটকেস বহন করে রাজনীতির আসরে এসেছিলেন। কমরেড মণি সিংদের এক সময়ে মওলানা সাহেবেই রাজনৈতিকভাবে লালন-পালন করেছিলেন। আপনারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস জানেন না, তাই যখন-তখন যা ইচ্ছা তাই বলে ফেলেন। আমাদের বিশ্বাস, জানলে এমন বলতে সাহস করতেন না।

“ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দিয়েছে –একথা  বলে আপনারা কি বাংলাদেশের জনগণকে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চান না যে, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের অধীনতা মেনে চলুক। ভারতের অধীন করে রাখার জন্য আপনারা স্বাধীন করে দিয়েছেন? মাওলানা ভাসানী তার বিরোধিতা করেছেন, সুতরাং বেঈমান মাওলানা ভাসানী। ভারতের পুঁজিপতিদের আরো যাঁরা বিরোধিতা করবেন, আপনারা সকলকেই বেঈমান ডাকবেন। যত ইচ্ছা ডাকতে পারেন। ভারতের আগ্রাসী নীতির যারা বিরোধিতা করে, যারা ভারতের মুনাফা শিকারী পুঁজিপতি গোষ্ঠী বাংলাদেশ শোষণের বিরোধিতা করে, তারা বাংলাদেশের জনগণের অত্যন্ত গর্বের এবং সম্মানের পাত্র। জনগণ তাঁদের অপমান কোনদিন বরদাশত করবেন না।”

পরিশেষে আহমদ ছফা তাঁর প্রবন্ধের শেষ লাইনে বলেছেন, “শুনেছি ভারত সভ্যদেশ, সুতরাং বাংলাদেশের জনগণও ভারতীয় সাংবাদিকবৃন্দের কাছ থেকে সভ্য মানুষসুলভ ব্যবহার প্রত্যাশা করে।”

আজ মওলানা ভাসানীর প্রয়াণ দিবস। এই উপমহাদেশের এক অনন্যসাধারণ নেতা, যিনি আমৃত্যু মজলুম জনতার পক্ষে গর্জে উঠেছেন, তাঁর সম্পর্কে তৎকালীন ভারতীয় সংবাদপত্র  ও পত্রিকাগুলির কদর্য মানসিকতা আবার মনে করা জরুরি। তাই মাঝেমধ্যে ইতিহাস খনন করা প্রয়োজন। সেই ইতিহাস খনন করে একালের ‘বিবেক’ আহমদ ছফার প্রবন্ধটির কিছু অংশ তুলে ধরা হল। ‘ইতিহাস ক্ষমাহীন’।

Facebook Comments