“লক্ষ-লক্ষ মানুষ যখন প্রতিবাদ করবে, তখন কয়েকশো মানুষকে তো মূল্য দিতেই হবে” | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

“লক্ষ-লক্ষ মানুষ যখন প্রতিবাদ করবে, তখন কয়েকশো মানুষকে তো মূল্য দিতেই হবে”

আইআইটি-বোম্বে থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক, দিল্লির জওহারলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গবেষক শারজিল ইমাম (৩৩) এখন তিহার জেলে বিনাবিচারে বন্দি আছেন। দিল্লিতে সিএএ বিরোধী শাহিনবাগ বিক্ষোভের মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। জেল থেকেই তিনি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  তারুশি আসওয়ানি। 

*****

আপনি জেলে কতদিন রয়েছেন?

আমি দিল্লি পুলিশের কাছে ২৮ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে আত্মসমর্পণ করি। আমি প্রায় ১৭ মাস হেফাজতে ছিলাম। তারমধ্যে, বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ হেফাজতে প্রায় একমাস, গুয়াহাটি সেন্ট্রাল জেলে প্রায় একমাস ও তিহার সেন্ট্রাল জেলে নয় মাসেরও বেশি।

যখন আপনার বিরুদ্ধে মামলা হয় তখন আপনার প্রাথমিক চিন্তা কি ছিল?

আমার চিন্তায় দুটি ধারণা এসেছিল। প্রথমত, রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য জানুয়ারি ২০২০তে যখন আমাকে গ্রেফতার করা হয়, আমি একই দিনে পাঁচটি রাজ্য থেকে পাঁচটি এফআইআর আশা করিনি। আমি রাজ্যের পক্ষ প্রতিরোধের আশা করেছিলাম, বিশেষ করে শাহিনবাগ থেকে। আমি এটা সম্পর্কে যখন বলেছিলাম ও লিখেছিলাম, আশা ছিল এটা জানুয়ারির শুরুর দিকে হয়ত হবে। আমার গ্রেফতারি ছিল শক্ত হাতে দমনের প্রারম্ভ। দিল্লির নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এটি বিক্ষোভকে প্রতিনিধিত্ব করার এবং সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলার কারন, এটাই আমার মনে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, ছয়মাস পর আগস্ট ২০২০তে যখন আমাকে দিল্লি দাঙ্গার জন্য গ্রেফতার করা হয়, যেটা ঘটেছিল যখন আমি গুয়াহাটি পুলিশ হেফাজতে ছিলাম। যখন দিল্লি দাঙ্গা হয়েছিল, আমার জেলে একমাস কাটানো হয়ে গেছে।

সুতরাং, যখন আমাকে দাঙ্গার জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং ইউএপিএ (সন্ত্রাসীদের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ আইন) এর অধীনে অভিযুক্ত করা হয়, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সরকার আমাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে উদাহরণ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটা হল বিচারপূর্ব আটক, যাতে করে শিক্ষিত যুবকরা ইউএপিএ তে জামিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ঝুঁকি নেওয়ার উদ্যোগ না নেয়। এর অর্থ, বিচার পূর্ব আটক আইপিসি-এর একটি ধারা, যেটা রাষ্ট্রদ্রোহের মতো নয়।

কারাগারে কিভাবে সময় কাটান?

গুয়াহাটি কেন্দ্রীয় কারাগারে কোনও ওয়ার্ড ব্যবস্থা ছিল না। তাই, একজন সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, জেলের চারপাশে ঘুরে বেড়াতেন এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। আমি সেখানে হাজার খানেক বন্দীর সঙ্গে মেলামেশা করেছি। তাছাড়া, লাইব্রেরিতে উত্তর পূর্ব ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত প্রচুর বই ছিল। আমি গুয়াহাটিতে থাকাকালীন কয়েক ডজন বই পড়েছি। আমার বাংলা দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছি। কিছু অসমিয়া শিখেছি। আমি সময়ের সাথে উভয় ভাষায় খবর কাগজ পড়া শুরু করেছি।

কারাগারে একটি মসজিদ ছিল যেখানে আমি প্রায়ই যেতাম ও অন্যান্য বন্দীদের সাথে কথা বলে সময় কাটাতাম। সন্ধ্যায় ওদের সাথে দাবা খেলতাম। তিহার জেল একটি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত ও হিংস্র জেল। এখানে খুব কমই আপনার ওয়ার্ড থেকে বের হতে পারবেন। আমি বেশিরভাগ সময় আমার সেলে কাটাই। আমার কিছু বই আছে। আমি সেলে একা থাকি। সম্প্রতি, আদালতের আদেশে আমাকে লিগ্যাল সেলে, কম্পিউটারে বসে আমার চার্জশিটের সফট কপি পড়তে হয়, যা প্রায় ১৭০০০ পাতা। প্রতিদিন আমাকে খবরকাগজ পড়তে দেওয়া হয়।

তাছাড়া,  তিহার জেল নির্জন জায়গা। তাই আমার নিজের নিরাপত্তার জন্য আমার এখানে ঘোরাঘুরি করা উচিত নয়।

আপনি প্রতিবাদ করলেন কেন?

আমার পাশে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কে প্ররোচিত করেছিল? বর্তমান রাজনীতি ক্রমবর্ধমান মুসলমান বিরোধী হয়ে উঠছে। ক্ষমতা মাত্র কয়েকজনের হাতে একচেটিয়া হয়য়ে গেছে। এর একটা দিক হল মুসলিম বিরোধী স্বভাব। ২০১৯ ছিল একটি জলবদ্ধ মুহূর্ত। ১৯৮৪ সালের পর এই প্রথমবারের মতো একটি দল এইধরণের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে জয়লাভ করে। এরপর বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আঘাত শুরু হল; ৩৭০ ধারা বাতিল, বাবরি মসজিদ রায়, সিএএ পাশ করা ইত্যাদি। এরপরেও মুসলমানরা সহজভাবে কাজ করছে। যাই হোক, আমি কয়েকবছর ধরে এই রাজনীতির ধরণ সম্পর্কে লিখে আসছি।

আমি ২০১৩তে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমার নিয়মিত চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং পার্টটাইম চাকরি নিয়েছিলাম যাতে ইতিহাস, দেশ বিভাজন, বিভাজন পরবর্তী ভারতের কাঠামো, সঙ্গে সংখ্যালঘু অধিকার, সঙ্ঘবাদ, নির্বাচন বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারি। গত দুইবছর আমরা দেখেছি এই শর্তাবলী শুধুমাত্র নামকরণের জন্য এবং যে কোন শক্তিশালী দল, তা বিজেপি বা কংগ্রেস হোক, সেটা অগ্রাহ্য করা যেতে পারে। এমনকি বিচারবিভাগের স্বাধীনতা আপস করা হয়েছে।

সুতরাং, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর অন্তর্হিত ত্রুটি আমাকে প্রতিবাদ করতে প্ররোচিত করেছিল। সিএএ আমাকে লেখালেখি থেকে শুরু করে রাস্তায় কথা বলার পর্যায়ে নামিয়েছিল। এটি আমাকে সিস্টেমের ত্রুটি সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। এই কাজটি কিভাবে কল্পনা করা হয়েছিল? কিভাবে এই আইন পাশ করা হল? কিভাবে একতরফা ৩৭০ ধারা বাতিল হল? কিভাবে কয়েক মাস বা এক বছরের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ হতে পারে? কিছু সেটআপ মৌলিকভাবেই ভুল রয়েছে।

আপনার বিরুদ্ধে যেধরণের মামলা হয়েছে, তাতে আপনি কি বিশ্বাস করেন যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারত একটি ভিন্ন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে?

 মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দুটি দিক আছে- প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক। বিচারবিভাগকে তার ভূমিকা পালন করতে হবে যতদূর সম্ভব প্রতিষ্ঠান দ্বারা বক্তৃতা বন্ধ করা রুখতে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কেন্দ্রে একটি দলের, একটি চক্র বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া ক্ষমতা বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে হবে। যাইহোক, এটি একটি গভীর দুর্বলতার দিকে দিকনির্দেশ করে কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাংস্কৃতিক মানগুলি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলি ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী ক্রমবর্ধমানভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

এই ধরণের জাতীয়তাবাদ বা উগ্র-জাতীয়তাবাদকে যারা উদারপন্থী, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল রাজনীতির ছায়ায় আছেন বলে ভাবেন তাদের জোরালভাবে ঝাড়াইবাছাই করতে হবে। এইজন্য আমি জাতীয়তাবাদকে আদর্শ হিসেবে সমালোচনা করি। এটি চিন্তাভাবনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে। যখন স্কটল্যান্ড বা আয়ারল্যান্ড গণতান্ত্রিকভাবে যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হয়ে যাবার কথা বলতে পারে; আমরা ভারতীয়রা কেন বিশ্বাসঘাতক কথাটি উহ্য রেখে এইধরনের আলোচনা সহ্য করতে পারি না? ১৯৫০-৬০ এর দশকে একটা সময় ছিল যখন রামমনোহর লোহিয়ার মতো সমাজবাদীরা কাশ্মীরিদের স্বশাসনকে সমর্থন করে মূলধারার সংবাদপত্রে লিখতে পারতেন; তিনি লিখতেন এবং উত্তর ভারতে একজন জননেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জ্যোতি বসু (পশ্চিমবাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী) ১৯৬২ সালে চীন-ভারত দ্বন্দ্বের বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলতে পারতেন আমি হিমালয়ের ওধারে কি হচ্ছে জানি না। এখন এগুলি অসম্ভব মনে হয়।

সরকার বিরোধী কন্ঠের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-এর নির্বিচার ব্যবহার, মতবিরোধকে চেপে ধরা এবং তার পরিনতি সম্পর্কে আপনার মতামত কি? আপনার নিজের বিরুদ্ধেও কি ঐ একই অভিযোগ?

 ইউএপিএ পাশ হয়েছিল ১৯৬৮তে। বিচ্ছিন্নতাবাদ বা উগ্রপন্থাকে মোকাবিলা করতে। যাইহোক, ২০০৮-এ মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর মনমোহন সিং-এর সময়ে আসল বিষদাঁত সংযোগ করা হয়েছিল, যখন পোটা (সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইন)- এর অন্ধকার অধ্যায় ৪, ৫, ৬ গুলি, যেগুলি ২০০৪-এ বাতিল করা হয়েছিল, সেই অধ্যায়গুলি পুনরায় ইউএপিএতে সংযোজিত হয়। এখন বেআইনি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে বিবৃতির জন্য তিন নম্বর অধ্যায় ব্যবহৃত হয়েছে। যেখানে কোন জামিন নেই, এর অর্থ কমপক্ষে ছয় মাসের কারাবাস, কিন্তু তারপরেও কোন জামিন নেই।  কিন্তু দিল্লি দাঙ্গার মতো পরিস্থিতিতে, যেখানে মৃত্যু এবং সহিংসতা রয়েছে, তখন অন্য তিনটি অধ্যায়কে ব্যবহার করা যেতে পারে।

আগে, সংগঠনগুলিকে সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করা হত। কিন্তু ২০১৯এ বিজেপি’র আনা সংশোধনের পর, ব্যক্তিবিশেষকেও সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। এই সংশোধন ইউএপিএ-এর পরিধিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিচ্ছিন্নবাদী সংগঠন থেকে এটি বিচ্ছিন্নতাবাদী/সন্ত্রাসী ব্যক্তি হয়ে উঠেছে, এবং আদালত এখনও আমাদের জানায়নি যে তারা এটাকে সাংবিধানিক মনে করে কি না।

বেআইনি কার্যকলাপ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সংজ্ঞাগুলি খুবই অস্পষ্ট এবং তাই এখন ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রেও নির্বিচারে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এখানে ২০০১ একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। ৯/১১ হামলার পর, “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বিশ্বজুড়ে সরকারগুলিকে ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমানদের অপরাধী করার লাইসেন্স দিয়েছে, আমাকে একজন সন্ত্রাসী বলা খুব সহজ যদি আমি বলি আমি একজন মুসলমান ও আমি পদ্ধতিগত পরিবর্তন চাই।

ভারত সরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে মুসলমানদের বৈষম্য ও বৈধ আকাঙ্ক্ষা   রোধ করতেও ব্যবহার করেছে; যেমন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ২০০১-এ জনপ্রিয় ভাষায় সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে। যাইহোক, ইউএপিএ কৃসকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়না কারণ মুসলমানদের সন্ত্রাসী ও দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ, কৃষকরা সরকারবিরোধী হলেও তাদের দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। আমার ক্ষেত্রে মহাসড়ক ও রাস্তাগুলি শান্তিপূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করাকে প্রসিকিউশন সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করে। আমার কোন বক্তৃতা বা বিবৃতি সহিংসতাকে উৎসাহিত করে না, তবুও একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে এবং এটি দেখায় যে এই আইনের বিধানগুলি কতটা অস্পষ্ট।

আপনি বর্তমানে কি পড়ছেন?

আমি সবেমাত্র এলিফ শাফাকের ‘Forty Rules of Love’ শেষ করেছি, যেটা রুমি ও শামস তাবরেজের সাক্ষাৎ থেকে অনুপ্রাণিত একটি উপন্যাস। আমি এখানে আধডজন প্রেমচাঁদ উপন্যাস পড়েছি। এই মুহূর্তে আমি সি এ বেইলী’র তথ্য ও সাম্রাজ্য এবং উর্দুতে আকবর নাজিবাবাদীর ইসলামের ইতিহাস পড়ছি। আমি এখানে থাকাকালীন আমার থিসিসের জন্যেও পড়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। এম ফিল ও পিএইচডি উভয়ক্ষেত্রেই আমার বিষয় হল পার্টিশনের সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আবর্তন। আমি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার (দিল্লি দাঙ্গা) মাস্টারমাইন্ড-এর অভিযোগে হেফাজতে আছি। আমার চার্জশিটও একই কারণে আমার গবেষণা সামগ্রীর প্রাথমিক উৎস হিসেবে কাজ করছে। আমি আর একটি বই পড়ছি- Delhi Prison Rules।

আপনি কি মনে করেন যে আপনার গ্রেফতারের উদ্দেশ্য হল সিএএ বিক্ষোভকে অবৈধ ঘোষণা করা?  

 হ্যাঁ আমি আগেই বলেছি আমার গ্রেফতার ছিল clampdown-এর শুরু। তারা দেখাতে চায় যে, এই বিক্ষোভকারীরা বিশ্বাসঘাতক। তারা দেশবিরোধী। সরকারবিরোধী। দিল্লি নির্বাচনের সময়, উদ্দেশ্য ছিল দিল্লিকে সাম্প্রদায়িক করে তোলা। সেই সাথে ১৫ ডিসেম্বর থেকে, শাহিনবাগের বিক্ষোভ শুরুর দিন থেকেই আমি যুক্ত ছিলাম। সরে আসার আগে পর্যন্ত আমি এর মুখ হয়ে উঠি। আমাকে টার্গেট করা শাহিনবাগকে টার্গেট করার সমতুল্য।

আমি ২০২০-র জানুয়ারীতে এটি অনুমান করেছিলাম। যখন আমি লোকেদের এই রাস্তা অবরোধ দিল্লি নির্বাচন পর্যন্ত স্থগিত করতে বলি, তখন অনেকে আমায় বিশ্বাসঘাতক বলেছিল। যাই হোক, আমি বিহারে স্থানান্তরিত হলাম। উত্তর প্রদেশ ও বাংলায় কথা বললাম। মজার বিষয় হল আমাকে উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে একটি ভাষণের জন্য বুক করা হল। দিল্লিতে একটি বিরোধের জন্য বিহার থেকে গ্রেফতার করা হল। অবশেষে আমার গ্রেফতারের একমাস পর দিল্লি দাঙ্গায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হল।

আমার ক্ষেত্রে, বিশেষভাবে প্রগতিশীল অমুসলমানদের সমর্থন বন্ধ করার জন্য আমাকে ধর্মান্ধ মুসলমান, মৌলবাদী বা হিন্দু বিদ্বেষী হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটাও বোঝানোর চেষ্টা করা হয় একজন বিশ্বাসী মুসলমান একই সাথে গণতান্ত্রিক হতে পারে না। যখন আমি ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে পদ্ধতিগত বিষয়গুলিতে কংগ্রেসের সন্দেহজনক ভূমিকার কথা বলি, তখন কিছু মুসলমান মনে করেছিলেন যে আমি প্রাথমিকভাবে বিজেপিকে সাহায্য করছি।

আমাকে একজন ধর্মান্ধ মুসলমান হিসেবে দেখানো হয়, যে নিরক্ষর জনতাকে নেতৃত্ব দেয়। যদি কেউ আমার ভাষণ শোনেন, তাঁরা বুঝবেন আমি অহিংস বিক্ষোভ, সংখ্যালঘুদের অধিকার, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন প্রভৃতি বিষয়েই কথা বলেছি।

জেল আপনাকে কি শিখিয়েছে?

 জেল আমাদের ধৈর্য ধরতে শেখায়। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়। নিজ অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ‘না’ বলতে শেখায়। যেমন, আমরা কোভিড পরীক্ষার দাবিতে গুয়াহাটি জেলে অনশন করেছিলাম। পরবর্তীতে অর্ধেকের কোভিড পজিটিভ পাওয়া যায়। এছাড়া, জেল আপনাকে পুলিশ, আইনজীবী, বিচারবিভাগ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার চিত্র দেয়। অনেকেই কারাগার সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। আমরা শিখি কিভাবে নিরীহ মানুষকে ছোট ছোট অপরাধের জন্য দোষ স্বীকার করতে হয় কারন তাদের বাইরে কোন জামিনদার নেই। আপনি পাঁচ মিনিটের মূল্য তখনই বুঝতে পারবেন যখন জেল কর্তৃপক্ষ আপনাকে আপনার পরিবারের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি ঐটুকু সময়ই দেয়। জেল আপনাকে জেলকে ভয় করা বন্ধ করতে শেখায়।

এটা কি আপনাকে কষ্ট দেয় যে জামিনে আপনার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে?

 হ্যাঁ, প্রথমে এটি রাষ্ট্রদ্রোহ ছিল, কিন্তু পাঁচটি রাজ্যে। তাই আমি ভেবেছিলাম হয়তো ছয়মাস বা এক বছর। তারপর এটি ছিল ইউএপিএ ধারা ১৬, ১৭ এবং ১৮ যার অর্থ সাধারণত পাঁচ-সাত বছরের বিচার পূর্ব আটক। সবকিছু এখন আদালতের উপর নির্ভর করছে। অনুমান করে কিছু বলা যাবে না।

আপনি কি আপশোস করেন আপনার সক্রিয় ভূমিকার জন্য?

না, আমার কোন আপশোস নেই। হতে পারে কোন নির্দিষ্ট পদক্ষেপ আমি এড়িয়ে যেতে পারতাম। অন্য আরও বিকল্প ভালো কাজ করতে পারতাম। কিন্তু যতদূর পর্যন্ত আমার জীবনের সামগ্রিক গতিপথ সম্পর্কিত, আমি একদমই আফশোস করি না। আইআইটি বোম্বে থেকে স্নাতক হই। ইতিহাসবিদ হবো বলে জেএনইউতে যোগদান করি। ২০১৩তে ঘুটি চেলে দেওয়া হয়েছে। গতিপথ তৈরি হয়েছে। এত বছর ধরে মানুষ আমার সিদ্ধান্তকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ভালো চাকরি ছেড়ে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য।

একজনকে এমন কাজ নেওয়া উচিত যা তার ভাষাগত ও বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করে। যা তাকে মানবজাতির অগ্রগতির পথে চালিত করে। ভারতে মুসলমানদের প্রশ্ন, দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। গুয়াহাটি কারাগারে একজন অফিসার একবার আমাকে বলেছিলেন, “এই মুহূর্তে কারাগারে আপনিই বোধহয় একমাত্র আইআইটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক।” আমি উত্তরে বলেছিলাম, “আমি ভাগ্যবান।” তিনি প্রথমে আমার উত্তর বোধহয় বুঝতে পারেননি। পরে বুঝেছিলেন। কারাগারে বন্দি অবস্থায় থেকেও যদি আমার কথাগুলি অনেক শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়, যদি আমার এইবছরগুলির চিন্তা-ভাবনা, পড়াশোনা, লেখালেখি লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তবে এতে আফশোসের কি আছে? এছাড়া, লক্ষ-লক্ষ মানুষ যখন প্রতিবাদ করবে, তখন কয়েকশো মানুষকে তো মূল্য দিতেই হবে।

একটি নির্দিষ্ট আখ্যানের বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণ করাকে আজকের ভারতে দেশবিরোধী বলে মনে করা হয়। এটি কি সেই ভারত যেখানে আপনি বড় হয়েছেন?

 আমি ১৯৮৮ সালে জন্মেছি মণ্ডল যুগের বিহারে, তুলনামূলকভাবে এমন ভারতে যেখানে কেন্দ্র ছিল দুর্বল। বিহারে মুসলমানদের উপর সর্বশেষ গণহত্যা হয়েছিল ১৯৮৯তে। সর্বভারতীয় দলগুলির ক্ষমতা বিহারে খর্ব হয় ১৯৯০ সালে। পিছিয়ে পড়া জাতি ও পাসমন্দার (ফার্সিতে ‘যারা পিছিয়ে পড়েছিল’, মুসলমানদের মধ্যে সুযোগসুবিধা বঞ্চিতদের রেফার করা হয়) দিকে আলোচনা সরে গিয়েছিল। আঞ্চলিক দলগুলি ক্ষমতায় এসেছিল। আমার বাবা আকবর ইমাম মারা গেছেন ২০১৪তে। উনি রাজনীতিবিদ ও সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়নের পক্ষে সওয়াল করতেন, তিনিও ওই পরিবর্তনের অংশ ছিলেন। যে বিহারে আমি বড় হয়েছি, সেখানে একটি দুর্বল কেন্দ্র ছিল। রাজনীতিতে আঞ্চলিক ঝোঁক ছিল। জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ ক্যাচওয়ার্ড ছিল। ঐ প্রেক্ষাপটে ভিন্নমতের ঘরটি এখনকার মতন সঙ্কুচিত হয়ে যায়নি। কিন্তু ঐসময়ই দেখা গেছে আরএসএস জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমশ নিজেকে বিস্তার করেছে। গুজরাটে মজবুত হয়েছে। বাবরি ধ্বংসের আন্দোলন হয়েছে। প্রচুর রক্তপাত, কাশ্মীরে সেনাশাসন লাগু হয়েছে।

তবে, আমি আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছি, গুনগত পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করতে হবে। ইন্টারনেট আমাদের বলার ও শোনার স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই এমন নয় যে ভিন্নমতকে সহজে আটকানো যাবে। হ্যাঁ, রাষ্ট্র আরও জোরদারভাবে আমাদের কথা ঝাড়াইবাছাই করবে এবং দেশদ্রোহী তকমা দেবার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমাদের কথাগুলি আরও জোরালো রাষ্ট্রের সেন্সরশিপ থেকে বাঁচার জন্য। ইন্টারনেটের যুগে ভিন্নমত দমন যায় না। দেশবিরোধী বলা যায়, কিন্তু দমন করা সহজ না। শুধুমাত্র ইন্টারনেট বন্ধ করেই একমাত্র ভিন্নমত দমন করা যায়।

আপনার বিরুদ্ধে এমন একটি অভিযোগ আনা হয়েছে যা আপনার দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আপনি কি মনে করেন দেশপ্রেম পরিমাপযোগ্য? আপনার দেশভক্তি কিভাবে প্রমাণ করবেন?  

দেশপ্রেম একটি অস্পষ্ট শব্দ। যেহেতু এটি একটি অস্পষ্ট শব্দ,সেহেতু আমার মধ্যে এটি আছে কি নেই সেটা প্রমাণ করার কোন মানে নেই। আমি বরং প্রমাণ করতে চাই, আমি সৎ ও এমন একটি আলাপে অবদান রাখছি যেখানে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও মজবুত, ন্যায়সংগত, প্রতিনিধিত্বমূলক করা যাবে। অস্পষ্ট হওয়ার পরিবর্তে দেশপ্রেম কথা বলবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু যেমন খ্রিস্টান, শিখ, মুসলমানদের অধিকার নিয়ে। কথা বলবে কেন্দ্রের সাথে আঞ্চলিক অধিকার নিয়ে। আমি চাইনা কেউ আমাকে দেশপ্রেমিক বলুক। বরং আমাকে গণতন্ত্রী বলা হোক, যে দক্ষিণ এশিয়ার নানান জটিলতার মধ্যে নিজের পদ্ধতিতে কাজ করার চেষ্টা করছে। একই সাথে, আমি একজন মুসলমান যে ইসলামের ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা করছে।

(তারুশি আসওয়ানি একজন সাংবাদিক। নতুন দিল্লি)

 সৌজন্য- Article 14

Facebook Comments