গুটিবসন্তের শেষ শিকার | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

গুটিবসন্তের শেষ শিকার

নাফিস আনোয়ার

১৯৭৮ সালের শেষ মাসে আমার জন্ম। শুনেছি আমার জন্মের পর আমার চিকিৎসক পিতা নিজের উদ্যোগে প্রায় জেদ করে আমাকে গুটিবসন্তের টীকা দেওয়া করিয়েছিলেন।  জেদ বললাম এ কারণেই যে ভয়ঙ্করতম মারণরোগ গুটিবসন্তের মৃত্যুঘণ্টা ততদিনে বেজে গেছে। গুটিবসন্ত মুক্ত পৃথিবীর ঘোষণা তখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তবু এতটা উতলা হয়েছিলেন কেন আমার পিতা! হয়ত আমার জন্মের ঠিক আগের এক বিশেষ ঘটনা বিচলিত করেছিল তাঁকে। ১৯৭৮-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বরের সেই ঘটনা সেইসময় সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আবার একবার ঘুরিয়ে দিয়েছিল ইংল্যান্ডের দিকে, সেই ইংল্যান্ড যেখান থেকে তারও প্রায় একশ পঁচাত্তর বছর আগে শুরু হয়েছিল গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এক নিরন্তর সংগ্রাম।

স্মলপক্স, গুটিবসন্ত, যার নাম শুনলে একসময় কাঁপত সারা বিশ্ব। যে রোগের মড়ক লেগে উজাড় হয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর। পৃথিবীর ইতিহাসের বহু রাজপাটই বদলে দিয়েছে সে। ইংল্যান্ডের চিকিৎসক স্যার এডোয়ার্ড জেনার ১৭৯৬ সালে আবিষ্কার করলেন এর টীকা, অনেক কম শক্তিশালী কাউপক্সের গুটি থেকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সেটাই প্রথম টীকা আবিষ্কারের ঘটনা। বিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্ত নির্মূলীকরণ কর্মসূচি নেওয়ার পর শুরু হল ব্যাপক টীকাকরণ। ধীরে ধীরে কমতে থাকল এই মারণ রোগের প্রকোপ। সত্তরের দশকের শেষ নাগাদ তাই মোটামুটি ধরে নেওয়া হল পৃথিবী গুটিবসন্ত রোগের থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। শুরু হল ঘোষণার তোড়জোড়। কিন্তু তার আগে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে এই রোগ তার শেষ দাগটি রেখে গেল খোদ ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে। তার সাথে দুঃখজনক পরিসমাপ্তি হল তিনজনের জীবনের; একজন সরাসরি মারা গেলেন এই রোগে আর বাকি দুজনের মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী হয়ে রইল এই ঘটনাটিই।

প্রথমজন মিসেস জ্যানেট পার্কার, বয়স চল্লিশ, পেশায় ফটোগ্রাফার, কাজ করতেন ইউনিভার্সিটি অফ বার্মিংহাম মেডিক্যাল স্কুলের অ্যানাটমি বিভাগে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্মলপক্সে মৃত শেষ ব্যক্তি হিসেবে হয়ত তাঁর নামটিই লেখা থাকবে। ‘হয়ত’ কথাটা এই মুহূর্তে বড়ই প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে যখন সারা পৃথিবী আরেকটি ভাইরাসের দানবিক রূপ প্রত্যক্ষ করছে আমরা যেন ভুলে না যাই স্মলপক্স রোগের ভাইরাস ভ্যারিওলার শেষ কয়েকটি স্ট্রেনকে এখনও রেখে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি পরীক্ষাগারে,  নষ্ট করে দেওয়া হয়নি।

দ্বিতীয়জন প্রফেসর হেনরি বেডসন, বয়স ঊনপঞ্চাশ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং সেসময় স্মলপক্স রোগের ক্ষেত্রে একজন অথরিটি। স্মলপক্স নির্মূলীকরণের কাজে নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি সুদূর পাকিস্তান থেকে ইথিয়োপিয়া ছুটে বেড়াতেও পিছপা হননি। স্মলপক্স তো নির্মূল হয়ে যাবে। কিন্তু তারপর! অন্য কোনোরূপে সে ফিরে আসবে না তো! এই নিয়েই বার্মিংহাম মেডিক্যাল স্কুলের মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টের অন্দরে বিশেষ এক স্মলপক্স ল্যাবে প্রফেসর বেডসনের নেতৃত্বে গবেষণা চলছে তখন। স্মলপক্স ভাইরাস এবং তারই এক পরিবর্তিত রূপ হোয়াইটপক্স ভাইরাসের তুল্যমূল্য বিচার চলছে সেখানে। সময় ফুরিয়ে আসছে। বছর শেষেই বন্ধ করতে হবে এই ল্যাব। WHO-র কড়া গাইডলাইন। তাই প্রফেসর বেডসনের সেই মুহূর্তে ভীষণ তাড়া। তাঁর পরীক্ষাগারটির অবস্থানটি জেনে রাখা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি ছিল জ্যানেট পার্কারের কর্মস্থল অ্যানাটমি বিভাগের নিচের তলায়। আর অ্যানাটমি বিভাগের ‘টেলিফোন রুম’ যেটি জ্যানেট প্রায়ই ব্যবহার করতেন সেটির ঠিক নিচেই ছিল ‘স্মলপক্স রুমটি’!

১১আগস্ট ১৯৭৮, মাথা ও সারা শরীরে ব্যাথা অনুভব করলেন জ্যানেট। মাইগ্রেন মনে করে জলদি বাড়িও ফিরে এলেন। অসুস্থতা বাড়তে থাকল এরপর, ধীরে ধীরে শরীরে ছড়িয়ে পড়ল ভয়ঙ্কর র‍্যাশ। প্রাথমিকভাবে পারিবারিক ডাক্তার সন্দেহ করলেন চিকেন পক্স। আর সেটাই স্বাভাবিক কারণ মিসেস পার্কারের গুটিবসন্তের টীকাটি নেওয়া ছিল বারো বছর আগেই। কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর ক্রমাগত শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকল। ২৪ আগস্ট বিকেলে অবশেষে ইস্ট বার্মিংহাম হাসপাতালে ভর্তি করা হল তাঁকে।

গুটিবসন্তের বিশেষজ্ঞ হিসাবে হাসপাতালে ডাকা হল ডঃ গেডেসকে। দ্রুততার সঙ্গে রোগির শরীরের নমুনা পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হল সেখানেই যেখান থেকে জ্যানেটের সংক্রমণটি ঘটার সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ সেই প্রফেসর বেডসনের স্মলপক্স ল্যাবে কারণ বার্মিংহাম শহরে স্মলপক্স ডিটেকশনের আধুনিকতম ব্যবস্থাটিও ছিল সেখানেই। প্রফেসর বেডসন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের তলায় সেই নমুনা পরীক্ষা করে একবারে নীরব নিশ্চল হয়ে গেলেন। নিজের ভবিষ্যতটাও চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল হয়ত। হ্যাঁ এই কাহিনির সবচেয়ে ট্র্যাজিক চরিত্র বোধহয় জ্যানেট পার্কার নন্, প্রফেসর হেনরি বেডসন-ই। মাইক্রোস্কোপে চোখ রাখলেন ডঃ গেডেসও। আর চোখ রেখেই বুঝে গেলেন– ভ্যারিওলা ইজ ব্যাক…

সঙ্গে সঙ্গে মিসেস পার্কারকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সলিহালের ক্যাথরিন-দি-বার্নস আইসোলেশন হাসপাতালে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হল তাঁর সাথে কনট্যাক্টে আসা প্রায় প্রত্যেককে ভ্যাকসিন দিয়ে আইসোলেট করার কাজ। এদের মধ্যে ছিলেন জ্যানেটের স্বামী জোসেফ, মা হিলডা ও পিতা ফ্রেডরিক। এই ফ্রেডরিক হুইটকোম্ব এই ঘটনার আরেক ভিক্টিম হবেন আরো দু’সপ্তাহ পরে‌ ৫ সেপ্টেম্বর, যখন মেয়েকে ওই অবস্থায় দেখার শোক সামলাতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যাবেন ক্যাথরিন-দি-বার্নস হাসপাতালেই।

 জ্যানেট পার্কার 

মুহূর্তে ত্রাসের সৃষ্টি হল এলাকা জুড়ে। আজকের এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে যখন সারা পৃথিবীর কাছে লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন প্রভৃতি শব্দগুলি অতি পরিচিত তখন সহজেই অনুমেয় একটি রোগ যা মুছে গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে তার প্রত্যাবর্তনের ফলে কিরকম আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল সারা বিশ্বজুড়ে বিশেষত সে রোগটির নাম যখন স্মলপক্স! সারা পৃথিবীর মিডিয়াও ঝাঁপিয়ে পড়ল বার্মিংহামে। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাতে (WHO) তৎপরতাও তখন চরমে। এতদিনের প্রচেষ্টায় সাফল্য যখন হাতের মুঠোয় এসে গেছে তখন শেষ মুহূর্তের এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাটির দ্বারা সবকিছু নষ্ট হয়ে যেতে দেবেন না তাঁরা।

মিসেস পার্কারের ভ্যারিওলা ডিটেকশনের কয়েকঘন্টার মধ্যেই তাঁর সংস্পর্শে বিগত কয়েক সপ্তাহে আসা ৩০০-র বেশি মানুষকে চিহ্নিত করে ভ্যাকসিন দিয়ে কোয়ারেন্টাইন করা হল। কয়েকদিনের মধ্যে টীকা দেওয়া হল হাজারের বেশি জনকে। খুঁজে খুঁজে বার করে কোয়ারেন্টাইন করা হল তাঁদেরকেও যাঁরা ইতিমধ্যে এলাকার বাইরে চলে গেলেও কিছুদিন আগে জ্যানেটের কাছাকাছি এসেছিলেন বা আসার সম্ভাবনা ছিল। পুরো বার্মিংহাম শহরে নেমে এলো একপ্রকার লকডাউন।

মিসেস জ্যানেট পার্কার যখন সেই ভয়ঙ্করতম রোগের সঙ্গে যুঝছেন; দেশের ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া তখন হামলে পড়ল এই সংক্রমণের সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বার করতে। স্বাভাবিক কারণেই উঠে এল একটিই নাম– প্রফেসর হেনরি বেডসন। তিনি নিজেও বোধহয় জানতেন সে কথা। পৃথিবীব্যাপী স্মলপক্সের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একজন নায়ক এক লহমায় সবার কাছে খলনায়ক হয়ে গেলেন। স্মলপক্স ল্যাবের অসাবধানতায় সার্ভিস ডাক্টের মাধ্যমে হয়ত একতলার ল্যাব থেকে দুতলার টেলিফোন রুমে পৌঁছে গিয়েছিল ভাইরাস– এটাই ছিল সবথেকে জোরালো সম্ভাবনা। বছরখানেক পরে অবশ্য কোর্টের ট্রায়ালের সময় বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ সেই তত্ত্ব নাকচ করে দিয়েছিলেন ফলে বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটিও এই ঘটনার দায় থেকে অব্যাহতি পেয়ে গিয়েছিল। অবশ্য প্রফেসর বেডসন ততদিনে এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। মিডিয়া, প্রশাসন এবং জনমতের প্রচণ্ড চাপ সইতে না পেরে ১৯৭৮ এর ৬ সেপ্টেম্বর নিজের হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করেন তিনি। তার আগে ভুগেছিলেন তীব্র অপরাধবোধেও। সুইসাইড নোটে লিখে গিয়েছিলেন–I am sorry to have misplaced the trust which so many of my friends and colleagues have placed in me and my work.

 প্রফেসর হেনরি বেডসন

১১ সেপ্টেম্বর মারা গেলেন জ্যানেট পার্কারও। অত্যন্ত সন্তর্পনে সলিহালের রবিন হুড কবরস্থানে তাঁর দেহটি কবর না দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হল সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায়। জ্যানেটের মা হিল্ডা হুইটকোম্বের দেহে স্মলপক্স সংক্রমণ ধরা পড়লেও সঠিক সময়ে টীকা দেওয়ার ফলে বেঁচে যান তিনি।

রেজিনাল্ড আর্থার শুটারের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশনের ২৩৬ পাতার রিপোর্টে নিঃসংশয় ভাবে চিহ্নিত করা হল– সংক্রামক ভ্যারিওলা ভাইরাসের স্ট্রেনটি প্রফেসর বেডসনের ল্যাবেরই। ভাইরাসটির পোশাকি নাম ছিল পাকিস্তানের এক আক্রান্তের নামে– আবিদ। স্মলপক্স ল্যাবের আরো কিছু গাফিলতিও চিহ্নিত হল এই রিপোর্টে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি ছিল অন্য– মিসেস জ্যানেট পার্কারের দেহে ভ্যারিওলা সংক্রমণ পৌঁছালো কেমন করে! প্রফেসর বেডসন নিজে ও প্রতিটি স্টাফকে নিয়মিত স্মলপক্সের টীকা দিতেন কিন্তু জ্যানেট তো তাঁর ল্যাবের কর্মী ছিলেন না। ফলে এমনও হতে পারে তাঁর কোনো কর্মীর সরাসরি সম্পর্কে এসে সংক্রামিত হন জ্যানেট অথবা তিনি নিজেই হয়ত গিয়েছিলেন স্মলপক্স ল্যাবের আশেপাশে, সংক্রামিত হয়েছেন ল্যাবের কোন যন্ত্রাংশ থেকে! যে কারণেই হোক আজ এই বিয়াল্লিশ বছর পরেও ব্যাপারটি রহস্যই থেকে গেছে। কারণ যাই হোক শেষমেশ এমন এক দুঃখজনক ঘটনার মাধ্যমে অবশেষে বিদায় নিল পৃথিবীর সবথেকে বিভীষিকাময় রোগটি।

৩৩ তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে ৮মে ১৯৮০ ঘোষণা করা হল পৃথিবী থেকে গুটিবসন্ত রোগটি বরাবরের জন্য মুছে গেছে একেবারে। তারিখটিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ২৬.১০.১৯৭৯ হিসাবে।

WHO-র জেনেভার সদর দপ্তরের সামনে ব্রোঞ্জের একটি মূর্তি আছে মানবজাতির গুটিবসন্ত নামক মারণ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভূতপূর্ব জয়ের স্মারক হিসাবে। মূর্তিটিতে দেখা যায় একটি বালিকাকে গুটিবসন্তের টীকা দিচ্ছেন এক চিকিৎসক, পিছনে দাঁড়িয়ে বালিকাটির পিতা মাতা। যে অগণিত চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রচেষ্টায় এই বিপুলায়তন কর্মকাণ্ড সফল হয়েছিল তাঁদের প্রত্যেককে স্মরণ করে এই মূর্তি। নিশ্চয় তাদের মধ্যে একজন প্রফেসর হেনরি বেডসনও যাঁকে পৃথিবী মনে রাখবে একজন ট্র্যাজিক নায়ক হিসাবে।

কভার ফটো- হু’র জেনেভার সদর দপ্তরের সামনে ব্রোঞ্জের সেই মূর্তি

Facebook Comments