সিলিকোসিসে অকালে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ; দায় নেবে কে? | The Background

Monday, August 2, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

সিলিকোসিসে অকালে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ; দায় নেবে কে?

জাভেদ ইকবাল

আপ্তারুল মোল্লা কিছুদিন হল মারা গেছেন। অনেকদিন ধরে প্রাণটুকু ধুঁকছিল। বাতাস থেকে নিংড়ে অক্সিজেন টানার ক্ষমতা তার ফুসফুসের প্রায় ছিলনা বললেই চলে। সারাক্ষণ নাকে লাগানো থাকতো অক্সিজেনের নল। না, করোনাতে মারা যায়নি আপ্তারুল। সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়েছিল। পাথর খাদানে কাজ করা শ্রমিকদের পেশাগত এক মৃত্যু রোগ। নাক মুখ দিয়ে পাথরের ধুলো গিয়ে অকেজো করে দেয় যুবক ফুসফুসদের। ৩০ বছরের আপ্তারুলদের শরীরকে অকালে করে দেয় বৃদ্ধ।
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, জ্বর, হাত পা শুকিয়ে যাওয়া, অকালবৃদ্ধ এমনকি শেষের দিকে শরীরকে নীলাভ করে দেয় এই মারণ রোগ সিলিকোসিস। খাদান শ্রমিকদের এক পেশাগত রোগ। খাদান শ্রমিক ছাড়াও, সেরামিক কারখানা, মৃৎশিল্প, নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের মধ্যেও এই রোগ দেখা যায়। মূলত পাথরের ধুলো বা সিলিকা কণার ঘন মেঘ থাকে যাদের কাজের পরিবেশ। কাজ করতে করতে সেই সিলিকা কণা শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে সোজা গিয়ে জমাট বাঁধে ফুসফুসের বায়ুথলি বা অ্যাল্ভিউলিতে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোন রাস্তা নেই। শক্ত হয়ে যায় ফুসফুস। বুক ভরে বাতাস টানার আপ্রান চেষ্টা করেও তারা পারেন না। কাশতে কাশতে রক্ত ওঠে মুখে। কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক কনভেনশনে মধ্যপ্রদেশের আন্দোলন কর্মী অমুল্য নিধি জানান, কীভাবে একজন সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকের মৃতদেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও তার ফুসফুসটি জ্বলেনি। পরে চিরে দেখা যায় সাদা পাউডারের মত পদার্থে ভর্তি।
ফুসফুসে সিলিকা অর্থাৎ সিলিকন ডাই অক্সাইডের কণা জমে হয় সিলিকোসিস। তিনটে লেয়ারের মধ্যে পৃথিবীর সবথেকে উপরিভাগের নাম হল ক্রাস্ট, যার প্রায় ৯৫ শতাংশ জুড়ে আছে এই সিলিকা। শিলা, বালি এবং বিভিন্ন মিনারেলের মধ্যে থাকে সিলিকা। একটা ছোট্ট উদাহরণ এখানে দিলে ব্যাপারটা আরও একটু পরিস্কার হবে। সেরামিক টাইল, মৃৎশিল্প এবং রিফ্রাক্টারি ইন্ডাস্ট্রিতে পাইরোফিলাইট নামক এক ধরনের মিনারেলের ব্যাবহার হয়, যেটা ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ সিলিকা দিয়ে তৈরি। এইরকম অগুন্তি মিনারেল আছে যেগুলোর মূল উপাদান সিলিকা। শিলা গঠিত হয় বিভিন্ন মিনারেলের সঙ্গবদ্ধ মিশ্রনের ফলে। এই শিলা বা পাথরের চাঁই থেকে নির্দিষ্ট মিনারেল বের করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। পাথরের চাঁই গুড়ো করে পাউডার বানাতে হয়। সেখান থেকে পাইরোফিলাইট বের করতে হলে পাউডারের গুড়োকে অনায়াসেই ২০০ মেশ বা ৭৪ মাইক্রন চালনি অর্থাৎ মানুষের চুলের থেকেও পাতলা চালনির মধ্যে দিয়ে বের হতে হবে। এত সুক্ষ পাথরের ধুলো ভেসে বেড়ায় পাথর শিল্পের বাতাসে।পাথর খাদানের বাতাসের অবস্থাও একই। ধুলোময়। যেখান থেকে ১০ মাইক্রনের থেকেও সুক্ষ সিলিকা কণা ফুসফুসে জমে গিয়ে নিয়ে আসে সিলিকোসিস। যে রোগ ঠিক হবার নয়। মৃত্যু অবধারিত। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী সিলিকোসিসে আক্রান্ত শ্রমিকরা গড়ে তেত্রিশ বছরের বেশি বাঁচেন না। রোগ প্রতিরোধই একমাত্র বাঁচার উপায়।
ঝাড়গ্রাম, বীরভূমের সঙ্গে খাদান কিংবা পাথর ভাঙ্গা ক্রাশারের যোগ থাকলেও চব্বিশ পরগনার সঙ্গে তো দূর দুরান্তে কোন সম্পর্ক নেই। তবুও আপ্তারুলদের কেন মরতে হল? মিনাখাঁ, সন্দেশখালির গ্রামের পর গ্রাম অসংখ্য যুবকদের এখনমৃত্যুর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ২০০৯ সালের আইলা। বিধ্বস্ত করে দেয় সুন্দরবন এলাকা। সমুদ্রের লবণজল ধুকে যায় চাষের জমিতে, মিষ্টি জলের পুকুরে। এলাকার জমি আর পুকুরগুলো আর চাষের উপযুক্ত থাকে না। পেটের টানে এলাকার যুবকদের যেতে হয় কুলটি, রানিগঞ্জ, আসানসোল, জামুরিয়া আর ঝাড়খণ্ডে পাথর ভাঙতে। কয়েক বছর কাজ করেই অল্প বয়সে বৃদ্ধের চেহারা নিয়ে তারা ফিরে আসে। বিছানা ছেড়ে ওঠার আর ক্ষমতা থাকে না। চব্বিশ ঘণ্টা চলে নাকে অক্সিজেন। কিন্তু এত অক্সিজেন জোগাবে তারা কীভাবে? মিনাখাঁ ব্লকে সিলিকোসিস আক্রান্তদের জন্য তৈরি অস্থায়ী এক হাসপাতালের দুটি কন্সেন্ট্রেটর থেকে রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। ছোট সিলিন্ডার প্রতি অক্সিজেনের সরকারী মুল্য ২০০ টাকা হলেও বাজার মুল্য ৪০০ টাকা। করোনা মহামারীতে এখন সেটারই দাম দের হাজার। সঙ্গে আছে নানান রকম ওষুধপত্র। কে দেবে? কেন্দ্র সরকার বাজেটের মাত্র দুই শতাংশ রেখেছে স্বাস্থ ব্যাবস্থায় অন্য দিকে প্রতিরক্ষার জন্য এক লাফে দশ শতাংশ (২০২০ সালের কেন্দ্র বাজেট)। কীভাবে সম্ভব তাদের বাঁচার?

  মধ্যপ্রদেশের একটি খনি। স্টক ফটো
পশ্চিম মেদিনীপুরের পঁচিশ বছরের ছেলে তাপস দন্ডপাট জামসেদপুরে এক পাথর ভাঙ্গা কারখানায় কাজ করে সিলিকোসিস আক্রান্ত হয়ে মারা যান। দিনমজুর বাবা তিন বছরে তিন লাখ টাকা খরচ করেও বাঁচাতে পারেন নি একমাত্র সন্তানকে। কোম্পানি বিন্দুমাত্র সাহায্য করেনি। বরং কাতারে কাতারে যখন আক্রান্তের পরিবার কোম্পানির দরজায় আসতে লাগলো, তাপসের বাবার কথায় কোম্পানি তখন নিজের নাম পরিবর্তন করে নতুন রূপে পাথর ভাঙতে লাগলো নতুন শ্রমিক দিয়ে।কোম্পানির মালিক স্থানীয় দালাল মারফত শ্রমিকদের বিভিন্ন রাজ্য থেকে নিয়ে আসে। তাই ইএসআই (এমপ্লয়ীস স্টেট ইন্সিউরেন্স অ্যাক্ট ১৯৪৮) এ তাদের নথিভুক্ত করানো হয় না। নুন্যতম মজুরি, পিএফ থেকে তারা বঞ্চিত। পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রশাসনিক স্তরে নাম না থাকায় ‘ইন্টার-স্টেট মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কমেন অ্যাক্ট-১৯৭৯’ তাদের লাগু হয় না। তাই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও শ্রম আইন থেকে তারা বঞ্চিত। সঙ্গে আছে চিকিৎসকদের অজ্ঞতা আর সরকারি চাপ। এদিকে উচ্চ আদালতের রায়, সিলিকোসিস আক্রান্ত রোগীর দ্বায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। ফলে সিলিকোসিসের চিকিৎসা না হয়ে হয় যক্ষ্মার চিকিৎসা।
দেশের অন্য প্রান্তের অবস্থা আরও ভয়ানক। রাজস্থান হল আমাদের দেশের পাথরের সবথেকে বড় খনি। বিভিন্ন রকমের স্যান্ডস্টোন, লাইমস্টোন, শেল, মার্বেল, গ্রানাইট, ব্যাসাল্ট থেকে শুরু করে তামা, দস্তার আকরিক, কী নেই আরাবল্লীর গভীরে! তাজমহল, লালকেল্লার দেওয়ালগুলো রাজস্থানের পাথরের। ভারতের বেশিরভাগ বিখ্যাত মন্দিরের কাজ চলে রাজস্থানের পিন্ডওয়াড়াতে। যেখানে প্রায় ২৩০ টি ফ্যাক্টারির পনেরো হাজার শ্রমিক সিলিকোসেসে আক্রান্ত। রানিধারা, বাগধারি, কুন্দল, ধোপাভাস গ্রামগুলো ‘বিধবা গ্রাম’ নামে পরিচিত। পাথর খোদায়ে ড্রিলিং এর ভিজে পদ্ধতি বা জল পদ্ধতি ব্যাবহার করলে পাথরের ধুলো নিয়ন্ত্রনে আনা যায়। কিন্তু সামান্য খরচ বাঁচাতে মালিকপক্ষ জলের বদলে শুকনো ড্রিলিং পদ্ধতি ব্যাবহার করেন আর শ্রমিকদের বলা হয় “ভাগওয়ান (ভগবান) কা কাম হ্যায়”। অথচ পাথরের মন্দিরে বা মসজিদে যাওয়ার সময় আমরা মনে রাখি না যে কত অগনিত শ্রমিকের শোষিত রক্তের বিনিময়ে এই ‘পবিত্র’ স্থানটি তৈরি। গবেষণার কাজে গিয়ে দেখেছি রাজস্থানে বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকদের দুরাবস্থা। উপযুক্ত প্রোটেকশন এমনকি মাস্ক পর্যন্ত সরবরাহ করা হয় না মালিকপক্ষ থেকে। অথচ শুধুমাত্র যোধপুর জেলাতেই কমবেশি প্রায় ৭০০০ পাথরের খাদান। আছে অসংখ্য বেআইনিও। যেখান থেকে প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার পাথর তোলা হয়। সমগ্র রাজস্থান রাজ্যকে ধরলে খাদানের সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার, যেখানে প্রায় ষোল লাখ পরিবার অল্প টাকার বিনিময়ে পাথর কেটে যাচ্ছেন।সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকের সঠিক সংখ্যা এখনও অজানা। বছর তিনেক আগে CAG একটি রিপোর্ট রাজস্থানের বিধানসভায় পেশ করে যেখানে বলা হয় মাত্র দুই বছরে (২০১৫-২০১৭) রাজ্যে ৭৯৫৯ জন সিলিকোসিস আক্রান্ত হন এবং কেবলমাত্র পাঁচটা জেলা থেকেই ৪৪৯ জন মারা যান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই মুহূর্তে রাজস্থানেই শুধু সতের হাজার জনের থেকেও বেশি মানুষ আক্রান্ত। অবশ্য সংখ্যাটা তাদের যারা নিজেদের সার্টিফিকেট সরকারি পোর্টালে যুক্ত করেছেন। অনলাইন মাধ্যমে নিজের নাম নিথিভুক্ত করেননি এমন সংখ্যাও প্রায় দশ হাজারের বেশি।
মুনাফা যখন মালিকপক্ষের প্রধান উদ্দেশ্য, তখন শ্রমিকের কথা ভাবে কে? কেনই বা তারা পয়সা খরচ করে শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত পোশাকের ব্যাবস্থা করবে? কেনই বা তারা একটু বেশি ব্যয় করে ধুলো কম করতে উন্নত ভেজা ড্রিলিং পদ্ধতি ব্যাবহার করবে? কেনই বা তারা শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ পরিক্ষা আর এক্স-রে করতে যাবে? ‘হক’স নেস্ট’ প্রজেক্ট শুরু হয় ১৯২৭ সালে। আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ায়। আড়াই মাইল লম্বা সুড়ঙ্গ পথ। কাটতে গিয়ে দেখা যায় পাথরে সিলিকার পরিমান প্রচণ্ড বেশি। যা স্টিল তৈরির ফ্যাক্টরিতে ভীষণ কাজের। লোভ সামলাতে পারেনি ‘রেনেহার্ট ও ডেনিস’ নামের আমেরিকার এক ঠিকাদার সংস্থা। ব্যাস, প্রস্তাবিত প্ল্যানের থেকে চওড়া হতে লাগলো সুড়ঙ্গ। উৎপন্ন হল আরও বেশি সিলিকার ধুলো। ধুলো নিয়ন্ত্রনে জল ব্যাবহার তখনই শুধু হত যখন আধিকারক পরিদর্শনে আসতেন। কারণ ভেজা ড্রিলিং পদ্ধতি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য কিছুটা সুরক্ষিত করলেও কাজের গতিকে শ্লথ করে দেয়। পরিনতি, যে আড়াই হাজার শ্রমিক সুরঙ্গের ভিতরে কাজ করছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় দের হাজার সিলিকোসিসে আক্রান্ত এবং ৭৮৪ জন মারা যান। এরও ষাঠ বছর আগে এই পশ্চিম ভার্জিনিয়াতে সুড়ঙ্গ করতে পাথর ভাঙতে ভাঙতে মারা যান জন হেনরি। শ্রমিক শ্রেনির এক নাম। বিভিন্ন গবেশনায় জানা যায়, হেনরিও মারা যান ঐ সিলিকোসিসে। তবে ১৯৩৮ এর আমেরিকা লড়াই করেছিল সিলিকোসিসের বিরুদ্ধে। ফল স্বরূপ গবেষণায় পাওয়া তথ্য ১৯৬৮-২০০২ পর্যন্ত আমেরিকায় সিলিকোসিসে মৃত্যুর হার কমেছে ৯৩ শতাংশ। আশা জাগে।
এই শতাব্দির শুরুতে গুজরাটের এক কোয়ার্জ ফ্যাক্টারিতে কাজ করতে যান মধ্যপ্রদেশের কিছু আদিবাসী। কয়েক বছরের মধ্যে সিলিকোসিস আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২৩৮ জন। ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্ট পরিবার পিছু তিন লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়ার রায় দেয় সরকারকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তবে লাগাতার আন্দোলনের ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দশ বছর পর কার্যকর করে গুজরাট সরকার। এই রায় কে সামনে রেখে রাজস্থান সরকারও নতুন নীতি ঘোষণা করে, যেখানে আক্রান্ত রোগীদের তিন লাখ অনুদান, মাসিক দের হাজার টাকা পেনশন এবং মৃত্যু হলে পরিবার প্রতি দুই লক্ষ টাকা এবং সৎকারের দ্বায়িত্ব সরকারের। ক্রমাগত আন্দোলনের ফলে আক্রান্ত শ্রমিকের পরিবারে ২০০ দিনের কাজের ব্যাবস্থা এবং মধ্যপ্রদেশ-গুজরাট সীমান্তে পঁয়ত্রিশটি বেআইনি খাদান বন্ধ হয়েছে। আশা জাগে। কেন্দ্র সরকারের অধিনস্থ নিরি (NEERI- National Environmental Engineering Research Institution) বার বার বাঁচানো সত্তেও ২৩ বছরের ধারাবাহিক প্রতিবাদ আন্দোলনের ফল- ২০১৮ সালের ২৮ শে মে তামিলনাড়ু সরকার ভয়ঙ্কর দূষণ সৃষ্টিকারী বেদান্তের স্টারলাইট প্ল্যান্ট পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করে। আশা জাগে। সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রামী শ্রমিক কমিটি এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ সর্বদা পশ্চিমবঙ্গের সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের পাশে আছে। আন্দোলন করছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দাবিতে। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সংগঠক সৌরভ চক্রবর্তী জানালেন “আমরা মূলত দুটো জেলা, উত্তর এবং দক্ষিন চব্বিশ পরগণাতে সিলিকোসিস নিয়ে কাজ করে চলেছি বিগত কয়েক বছর ধরে। মিনাখাঁ ব্লকের অবস্থা ভীষণ করুণ। এখন পর্যন্ত প্রায় পঁচিশজন মারা গেছেন। আক্রান্তদের পরিবারকে রেশনের ব্যাবস্থা, ওষুধপত্র, অক্সিজেন এবং গ্রামে কিছু হেলথ ক্যাম্প ছাড়াও ইলামবাজারে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনদের নিয়ে একটা কর্মশালা আমরা ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের’ পক্ষ থেকে করছি।“ সিলিকোসিস বিষয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ’র আগামী পরিকল্পনা নিয়ে তিনি জানালেন “মুশকিল হল কোন খাদান মালিকই শ্রমিকদের দুই তিন বছরের বেশি কাজে রাখে না, কারণ খাদান মালিকরা জানেন শ্রমিকদের সিলিকোসিস আক্রান্ত অবধারিত। ফলে শ্রমিকদের সংগঠিত করা কঠিন হয়ে পরে। তবে এই মহামারীর পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই রাজ্যের বিভিন্ন খাদান গুলোতে গিয়ে শ্রমিকদের জন্য কাজ করা এবং সমস্থ আক্রান্ত রোগীদের খুঁজে বের করা তাঁদের পরিবারকে সরকারি প্রাপ্য তুলে দেওয়া আমাদের আগামী লক্ষ্য।“সৌরভ চক্রবর্তীদের রাস্তার লড়াইয়ের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে থেকেছেন আইনজ্ঞ বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য এবং শামিম আহমেদ। যাদের দায়ের করা মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের রায়- সিলিকোসিস আক্রান্ত গ্রামে প্রতি মাসে মেডিক্যাল ক্যাম্প করতে হবে। প্রত্যেক রোগীকে বিনামুল্যে ওষুধ সরবরাহ করতে হবে এবং বিনামুল্যে এক্স-রে করাতে হবে।
“বুকটা ভরে নিশ্বাস নিতে চাই”- এই পৃথিবীতে শুধু এইটুকুই চাওয়া উত্তর চব্বিশ পরগনার সিলিকোসিস আক্রান্ত নাসির মোল্লার। ফুসফুস ভর্তি তার পারহরের সিলিকা কণা। তাঁরই গ্রামের ২৪ জন যুবক এই রোগে মারা গেছেন। হারিয়েছেন তিনি মেজভাই কেও। হয়তো নাসিরের ফুসফুসও কয়েকদিনে কাজ করা বন্ধ করে দেবে। তবুও নাসির লড়াই করছেন খাদান শ্রমিকদের অধিকারের দাবিতে। সে লড়াই তাঁদের জারি থাকবে। সেই লড়াই-এর কিছু প্রকাশ নাসিরের কবিতায়…
“পাথর ভাঙ্গার সেই
কেছ কেছ শব্দটা
আজও ভেসে আসে কানে
ওপার হতে,
মাটিতে মিশে যায়
শ্রমিকের দেহ
সবার অগোচরে।
শ্রমিকের রক্ত শুষে খায়
আজও হায়নার দল,
সস্তা শ্রমের লোভে
মালিকেরা চালে কূটকৌশল।

শিরোনাম ছবি- আপ্তারুল মোল্লা। উত্তর ২৪ পরগণার মিনাখাঁর বাসিন্দা। সিলিকোসিস আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি মারা গেলেন। লেখক কর্তৃক সংগৃহিত। 

লেখক ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক

Facebook Comments