সন্তানকে দোষ না দিয়ে সমস্যার মূলে যেতে হবে : সুমনা বাগচী | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

সন্তানকে দোষ না দিয়ে সমস্যার মূলে যেতে হবে : সুমনা বাগচী

কিছু দিন ধরে অর্ঘ্য খুব আনমনা থাকে, কলেজে যেতে চায় না। সারাক্ষণ বাড়িতে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে।

এমিলি ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। আজকাল খুব বাবা মায়ের মুখে মুখে কথা বলে।  সবসময় খুব রাগ আর বিরক্তি তার মধ্যে।

প্রজ্ঞানা ক্লাস সেভেন-এ পড়ে। বাড়িতে বাবা মায়ের রোজ ঝগড়া। সারাক্ষণ কাজের মাসীর কাছে থাকে সে। কারণ বাবা মা দুজনেই কর্মরত। অফিসের পর বাড়ি এসে তাদের মধ্যে নিত্য অশান্তি, মারপিট। তাই সে তার নতুন মোবাইল এ সারাক্ষণ গেম খেলে ভুলে থাকতে চায়।

এই ঘটনাগুলি কোনোটাই সাজানো কিংবা শুধু মাত্র চরিত্র উপস্থাপন করে গল্প লেখা নয়। এগুলি আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির সমস্যা। আমরা যদি একটু ভেবে দেখি তাহলে বুঝতে পারবো আমাদের ছোটোবেলাগুলো কোথাও হারিয়ে গেছে। হাতড়ে শুধু স্মৃতি ছাড়া কিছুই পাইনা। আজকাল বাচ্চাদের জগৎ অনেক বেশি কমার্শিয়াল। মা- বাবা কে কাছে না পেলে মোবাইল, গেম, ইন্টারনেট তাদের একমাত্র সঙ্গী। নিউক্লিয়ার পরিবারে বাবা, মা, সন্তান ও কাজের লোক। কোথাও মনের আদান প্রদান সীমিত। ছেলেবেলাগুলো তাদের কাছে সম্পূর্ণ মেটেরিয়ালিস্টিক। বাবা মায়ের কাছে একদিন এরাই প্রবলেম চাইল্ড। তাই এদের কাউন্সেলিং করতে নিয়ে আসে আমাদের কাছে। কিন্তু তাঁরা ভুলে যান কাউন্সেলিংটা কাদের সব থেকে বেশি দরকার। মা বাবাদের কমপ্লেইন , ছেলে মেয়েরা কথা শোনেনা, খুব ভায়োলেন্ট ভাবে রিএক্ট করে, সারাক্ষণ মোবাইল ও কম্পিউটারে সময় কাটায় নয় তো বন্ধুদের সাথে লেট নাইট পার্টি আর আকন্ঠ মদ্য পান। অনেক সময় বাবা মা হাতেনাতে তাদের ধরে ফেলেন পর্ণ ভিডিও দেখার সময়। সিগারেট,গাঁজা নানা রকম মাদক সেবনে তারা উশৃঙ্খল জীবন কাটায়। এই সব কিছুই তাদের কাছে সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার তাই কাউন্সেলিং একমাত্র উপায়।

সমস্যাগুলি কোনোটাই অগ্রাহ্য করার বিষয় না সত্যি বাবা মা হিসাবে আমাদের সন্তানদের জন্য সময় খুব কম। তাই তাদেরকে শাসন করাই একমাত্র উপায় আমাদের কাছে। কখনো কখনো গায়ে হাত তুলে নিজের রাগ প্রকাশ আবার দরজা বন্ধ করে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু তাদের মনের কাছে পৌঁছাবার কোনো চেষ্ঠাই আমরা করিনা। কোনো দিন তাদের পাশে শুয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করি,আমাদের সন্তানেরা  কেমন আছে?কোথাও জানতে চাই তাদের কোনো সমস্যা আছে কিনা? নাকি শুধু ছেলে ভোলানোর মতো দামী উপহার তাদের জন্য একমাত্র ভালোবাসা?

উত্তর গুলো আমরা নিজেরাই জানিনা। আমাদের প্রত্যেকের জানা উচিৎ প্রত্যেকটি বাচ্চা স্বতন্ত্র। তাদের ভাবনা, বেড়ে ওঠা, সৃজনশীলতা সব কিছুই তাদের মতো। সেখানে অন্য কারুর সাথে তুলনা করা ঠিক না। সমস্যা সেখানেই হয় যখন একটা বাচ্চার সাথে অন্য একটি বাচ্চারা মধ্যে গুণগত মান নিয়ে তুলনা করা হয়। কোথাও সেই বাচ্চার মধ্যে লজ্জা, কষ্ট আমাদের চোখের আড়াল হয়।

কিছু গবেষণা ও কেস স্টাডিতে দেখা গেছে,অনেক অভিভাবক ও স্কুলের শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন বাচ্চার মধ্যে সেক্সুয়াল অ্যাকটিভিটি নিয়ে।তাদের বক্তব্য অনুযায়ী টিনএজ বাচ্চাটির ব্যবহারিক পরিবর্তন। অন্য সহপাঠীকে জড়িয়ে ধরা,চুমু খাওয়া কিংবা নিজেদের গোপনাঙ্গে হাত দিয়ে থাকা।এসবই তাদের কাছে সমস্যার সিম্পটম। বাবা মায়ের কাছে অত্যন্ত লজ্জার বিষয়,অল্প বয়সে পেকে যাওয়া ইত্যাদি। বাচ্চাটির সাথে কথা বলার পর জানা গেলো, সে মাঝে মাঝে রাতেই তার বাবা মাকে সঙ্গমে লিপ্ত হতে দেখে। কোথাও তার মধ্যেও সেই ইচ্ছার বহির্প্রকাশ ঘটে। তাই সে তার ওই ধরনের আচার ব্যবহারে নিজেকে তৃপ্ত করতে পারে। মাঝে মাঝে মোবাইল পর্ণ সাইট দেখে নিজের অভিলাষা পূর্ণ করার জন্য। এক্ষেত্রে আমরা যদি একটু ভেবে দেখার চেষ্ঠা করি তাহলে বুঝতে পারবো, এখানে কার ব্যবহারিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। শারীরিক চাহিদা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু একটা টিনএজ বাচ্চা যখন বড়ো হয় তখন কিছু বিষয় আমাদের সজাগ থাকা প্রয়োজন। মনে রাখা উচিৎ বাচ্চাটির শারীরিক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো যৌন চেতনা ও অনুভূতির প্রকাশ। তাই সচেতনতা বাবা মাকে অবলম্বন করা উচিৎ। আমরা কোথাও বাবা মা থেকে বন্ধু হতে পারিনা।খোলা মেলা আলোচনা, শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা,গুড টাচ, ব্যাড টাচ বিষয়টি গুছিয়ে বলা, Peer pressure নিয়ে কথা বলা সব কিছুই কিন্তু সমস্যার সমাধান করে দেয়। এক্ষেত্রে কোনো কাউন্সেলর এর দরকারও হয় না।

স্কুলে শিক্ষকদের মধ্যেও বিশেষ কিছু গুণ থাকে যা বাচ্চাদের মধ্যে হীনমন্য মনোভাবকে বাড়িয়ে দেয়। অযথা বিষয়টি সরল ভাবে না দেখে তাকে নিয়ে ঠাট্টা, ইয়ার্কি কিংবা সবার সামনে অপমান করা বাচ্চাদের মধ্যে প্রতিশোধ ইচ্ছা বাড়ায়।

শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম এর ক্ষেত্রে মন ও মনন নিয়ে আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেক্ষেত্রে আমাদের মধ্যেও কোথাও ঘাটতি আছে। আরেকটি কেস যা বর্তমানে সমস্ত বাবা মায়ের কাছে মূল সমস্যার বিষয় তা হলো বাচ্চাদের মিথ্যা কথা বলা। আমাদের প্রত্যেকের জানা উচিৎ আমরা মিথ্যা কেন বলি? এক: আমরা নিজেদের কে আরো বেশি সুন্দর ভাবে সকলের সামনে উপস্থাপিত করার জন্য মিথ্যা বলি।যা শুধু বাচ্চারা না বড় রাও করে। দুই: অন্যায় থেকে বাঁচতে মিথ্যা বলি অর্থাৎ কোনো ভুল করে থাকলে সেটার জন্য মিথ্যা বলি যা ডিফেন্স মেকানিজম বলা যায়। তিন: স্কুলে টিচারদের কাছে ভালো থাকার জন্য মিথ্যা বলি। চার: আমরা কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হতে না চাইলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে বলা বাহুল্য আমাদের বুঝতে হবে আমাদের বাচ্চা কেন মিথ্যা বলছে? সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাবা মা কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে একটি শিশু প্রথম কথা বলতে ও ভাব প্রকাশ করতে শেখে। সেক্ষেত্রে পরিবারের কোন সদস্য যদি মিথ্যা বলে, শিশুর মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়। তাই একটি বাচ্চাকে দোষ না দিয়ে সমস্যার মূলে গিয়ে জানা উচিত। তার মধ্যে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ও সেল্ফ মোটিভেশন বাড়ালে খুব সহজেই এই সমস্যার মুক্তি পাওয়া যায়।….

সুমনা বাগচী সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলর। যুক্ত আছেন ওয়েস্ট বেঙ্গল লিগ্যাল এইড সার্ভিসের সঙ্গে।

 

Facebook Comments