‘তাই বসে বসে করি লিস্টি’ | The Background

Friday, October 23, 2020

Contact Us

Google Play

‘তাই বসে বসে করি লিস্টি’

নাজিব আনোয়ার

কিছুদিন আগেও মোগলসরাই নাম দেখলেই ট্রেনযাত্রীরা বুঝে যেতেন উত্তরপ্রদেশে প্রবেশ করেছেন তাঁরা। এখন তাঁরা দেখবেন নাম পালটে হয়ে গেছে পন্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় জংশন। গোটা উত্তরপ্রদেশ জুড়েই এইরকম নাম পাল্টানোর হিড়িক। আস্ত এক শহরের নামই পালটে গেছে। এলাহাবাদ এখন প্রয়াগরাজ। আগ্রা বিমানবন্দর আবার দীন দয়াল উপাধ্যায়ের নামে। ফইজাবাদের নাম বদলে গেছে অযোধ্যা’র নামে।

ঐ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নতুন ‘টার্গেট’ খুঁজে পেয়েছেন। মুসলমান নামগন্ধ কিছু থাকলেই তিনি পালটে দিতে বদ্ধপরিকর। তিনি হিন্দু নাম খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

এই মুহূর্তে তাঁর টার্গেট আগ্রায় নির্মীয়মাণ মোঘল জাদুঘর। এই জাদুঘর তৈরি করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন আদিত্যনাথের পূর্বসূরি অখিলেশ যাদব। ২০১৬য় তিনি ছয় একর জমির উপর এই জাদুঘর নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।

মোঘল যুগ মানেই নাকি মুসলমান যুগ। ইতিহাসকে বিকৃত করে দেখার ফল। আদিত্যনাথ এই বিকৃত ইতিহাসকে সঙ্গী করে এগোচ্ছেন।

মনে পড়ে তাঁর বাবর কি আউলাদ মন্তব্য। গতবছর সমাজবাদী পার্টির সফিকুর রহমান বারক’কে এই বলে তিনি সম্বোধন করেছিলেন। উত্তর প্রদেশের নির্বাচন আসতে এখনও বছর দুয়েক দেরী আছে, কিন্তু এখন থেকেই তো টেম্পো তুলতে হবে।

আগ্রার এই জাদুঘরের নাম ঠিক হচ্ছে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের নামে। আদিত্যনাথ আসলে ভুলিয়ে দিতে চাইছেন মোঘল যুগের ইতিহাস। ভুলিয়ে দিতে চাইছেন মোঘলদের সঙ্গে বর্তমান উত্তর প্রদেশের নানান অঞ্চলের নিবিড় ইতিহাস। ঐ সময়ের ইতিহাস নিয়ে সামান্য যারা চর্চা করেন তাঁরা জানেন, আগ্রা প্রায় একশো বছরের কাছাকাছি মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল- ১৫৬০ থেকে ১৬৫০।

কিন্তু আদিত্যনাথের ভাবখানা এমন যেন মোঘল আমলের ইতিহাস ভারতের ইতিহাসের অঙ্গ নয়। অযোধ্যায় গুঁড়িয়ে দেওয়া বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি হচ্ছে তাঁরই শাসনকালে। তাই সেই জয়ের নেশায় যা কিছু মোঘল আমলের, সেগুলিকে পালটে দিতে তিনি বদ্ধপরিকর। এটা নাকি ‘দাস মনোবৃত্তি’ থেকে নিস্তার পাবার উপায়।

 ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা অব্যাহত/ শাটারস্টক

মোঘল আমলের জিজিয়া কর নিয়ে নানান মতামত আছে। হিন্দুদের জমি রক্ষা করার বিনিময়ে তাদের ওপর কর ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু এটা বলা হয়না ঐ আমলে কোন কোন বাদশা এটা প্রয়োগ করেছিলেন, আবার কেউ রদ করেছিলেন। জিজিয়া কর আকবর তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু আওরঙ্গজেব লাগু করেছিলেন, আবার পরে জাহানদার শাহ্‌ রদও করেছিলেন। এটা তৎকালীন সময়ের রাজনীতির প্রশ্ন।‘Power politics’কে বাদ দিয়ে তো শাসন চলেনা। বর্তমানে চলেনা, তখনও চলতো না। কর লাগু হতো সাধারণ মানুষের উপর, এমনভাবে যেন তারা নেই রাজ্যের বাসিন্দা। এখন যেমন সিএএ-এনআরসি লাগু হচ্ছে। একই মুদ্রার এ পিঠ-ও পিঠ।

জিজিয়া কর প্রসঙ্গে আওরঙ্গজেব তুমুলভাবে সমালোচিত। কিন্তু ঐ বিষয়ে ওয়াকিবহাল মাত্রই জানেন এতে নানান প্রকার ছাড় ছিল। ছাড় ছিল বেকার, বয়স্ক ও অসুস্থদের ক্ষেত্রে। মহিলা ও কমবয়সীরা যারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিত তাদের ক্ষেত্রেও ছাড় ছিল। সবাইকে একরকম কর প্রদান করতে হতো না। একটা মোটের ওপর স্তরভেদ রাখা থাকত। ধরা যাক, এক ধনী ব্যক্তি-দশ হাজার দিরহাম যার আছে- তাকে বাৎসরিক ৪৮ দিরহাম কর দিতে হত। এটাই সব থেকে বেশী কর। একজন গরীব মানুষ, যার বছর শেষে ২০০ দিরহামেরও কম অর্থ আছে, তাকে মাসিক ১ দিরহাম করে দিতে হত। মোঘল যুগে শুধুই কি হিন্দুদের ক্ষেত্রে কর প্রযোজ্য ছিল? মুসলমানদেরকেও কর দিতে হত, জাকাতের মাধ্যমে।

তবে এখন এই বিজেপি’র শাসনে যুক্তির ঠাঁই নেই। বারবার বলা হবে চারশো বছর ধরে হিন্দুরা আক্রান্ত। তারা অন্যায়ের শিকার। এখন সময় এসেছে হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার। সময় এসেছে হিন্দু’র শাসন চালু করার। গেরুয়া রঙে চুবিয়ে ভারতের ইতিহাসকে বিকৃত করার মাধ্যমেই সেটা সম্ভব। আসলে এটা হিন্দুর শাসন নয়, এটা প্রকৃতপক্ষে ‘হিন্দুত্বের’ শাসন, আরএসএস-এর প্রেসকৃপশন অনুসারে।

সালতামামি অনুযায়ী মোঘল শাসনকাল ছিল ৩৩১ বছর। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই আওরঙ্গজেব হিন্দু-বিরোধী ছিলেন, সেই শাসনকালে এমন অনেক বাদশাহ ছিলেন যাদের হিন্দুদের নিয়ে সমস্যা ছিল না। আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান- এরা হিন্দুদের বিরাগভাজন ছিলেন না। তাজ মহল,  ফতেপুর সিক্রি, লাল কেল্লা এবং আরও অসংখ্য স্থাপত্যকলার নিদর্শন যা ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, সেগুলি তৈরি হয়েছিল ঐ আমলেই। এগুলি এখন দেশ-বিদেশের আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। বিজেপি শাসনাধীন রাজ্যগুলির আয়ের উৎস।

বেকার সমস্যা ও ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তর প্রদেশকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অবশ্য এগুলি সারা দেশের সমস্যা। আদিত্যনাথের মন এইসব সমস্যা সমাধানে নেই। না থাকারই কথা। দিল্লির তখতে বসে থাকা তাঁর সহযোগীরা দেশটাকে তো বেচেই দিল আদানি-আম্বানীকে। আর তিনি ব্যস্ত লিস্ট বানাতে। মুসলমান ঘেঁষা নাম দেখলেই তিনি মুছে দিচ্ছেন লিস্ট থেকে।

ছত্রপতি শিবাজী আগ্রায় এসেছিলেন একবারই। তাও বন্দী অবস্থায়। সুতরাং জাদুঘরের নাম শিবাজীর নামে করে দেওয়াটা অর্থহীন।

ইতিহাস নিয়ে খেলা করা আরএসএস-এর স্বভাবজাত। কিন্তু ইতিহাস ঘুরে ঘুরে ফিরে এসে কামড় দেয়। এখন ঐ রাজ্যের জাঠ সম্প্রদায়ের গোঁসা হয়েছে এই নামকরণ হেতু। তাদের দাবী, ঐ সম্প্রদায়ের রাজা সুরজমল একসময় মোঘলদের পরাজিত করেছিলেন। জাদুঘর তাঁর নামেই হওয়া উচিত।

বোঝো ঠ্যালা!

 

Facebook Comments