রাজনীতির বিকল্প, রাজনৈতিক বিকল্প অথবা বিকল্প রাজনীতি | The Background

Saturday, February 27, 2021

Contact Us

Google Play

রাজনীতির বিকল্প, রাজনৈতিক বিকল্প অথবা বিকল্প রাজনীতি

নাজিব আনোয়ার ও আবদুল মতিন

রাজনীতির বিকল্প কি হতে পারে? সত্যি কথা বলতে এর বিকল্প সাধারণ অর্থে কিছু হয়না। যাঁরা রাজনীতির বিকল্পের কথা বলেন, বলেন রাজনীতি খারাপ তাঁরা বোধহয় গণতন্ত্রেরই বিকল্প খোঁজেন, গণতন্ত্রকে নিকেশ করার পথ খোঁজেন। অথবা, রাজনীতিহীন আন্দোলন যা বদ্ধপাঁকে গিয়ে নিমজ্জিত হয়, কোন ‘বুলডোজার’, ‘কমলা’, ‘গোলাপ’ অথবা ‘মোমবাতি’ বিপ্লবে, তাতে মেতে উঠতে চান।

তুখোড় প্রাবন্ধিক, এখন তাঁকে বোধকরি অনেকে ভুলে গেছেন, প্রয়াত দেবু দত্তগুপ্ত তাঁর এক অবিস্মরণীয় লেখায় বিষয়টি এভাবে বলেছিলেন, ‘মাথায় বেতের টুপি আর ব্লিচ করা জিনস পরিহিত চে গুয়েভারা জনা তিনেক মাদার টেরিসা আর নর্মান বেথুনকে সঙ্গে নিয়ে বিসিজি, পোলিও ভ্যাকসিন, গুঁড়ো দুধের মহানুভবতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া মেছুয়া গ্রামগুলিতে’। এঁরাই রাজনীতিকে বিযুক্ত করে ‘সেফটি ভালভ   থিওরি’-র কাজ করেন, রঙিন বিপ্লবের স্বপ্ন দেখান।

আর রাজনৈতিক বিকল্পটা অনেকটা থোড়, বড়ি, খাড়ার মতন অবস্থা। কোন একটি রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন অন্য আরেকটি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। এটা ক্ষমতা হস্তান্তরের নামান্তর মাত্র। বিজেপি’র পরিবর্তে কংগ্রেস বা অন্য কোন দল। রাজনীতির রং এখানে বড়ই ধূসর।

পপুলিস্ট রাজনীতির যুগ

অনেকে বলেন, এটা পপুলিস্ট রাজনীতির যুগ। বামপন্থী- দক্ষিণপন্থী, দু’পন্থাতেই এইধরনের রাজনীতির উত্থান ঘটতে পারে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে, এখানে দক্ষিণপন্থীদেরই রমরমা। লুলা- উগো চাভেজ- এভো মোরালেস- এই ত্রয়ী বামপন্থী পপুলিস্ট রাজনীতিক এখন পিছিয়ে গেছেন। চাভেজের উত্তরসূরি মাদুরো বিপদের ঘেরাটোপে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকান। ২০১৮ সালের অক্টোবর ব্রাজিলে বোলসোনারো প্রেসিডেন্ট হলেন। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা লুলা ডি সিলভাকে ভিত্তিহীন অভিযোগে জেলে পোরা হল। সঙ্কটের মধ্যে ছিল ওয়ার্কার্স পার্টি। সাঁড়াশী সঙ্কট। একদিকে উদারনৈতিক অর্থনীতির চাপ, অন্যদিকে জনসাধারণের সামাজিক সুরক্ষা দিতে নানান প্রকল্পকে বাস্তবায়ন। তাঁকে হারিয়ে ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বোলসোনারো জিতে গেলেন। পরে অবশ্য লুলা জেল মুক্ত হয়েছেন। তাঁর দলের প্রতি সমর্থনও মোটামুটি অটুট। কিন্তু কে এই বোলসোনারো?

মানুষের সমস্ত অধিকার হরণ করতে, পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্ত চিন্তা-ভাবনাকে ধামাচাপা দিতে, ঐ দেশের অসংখ্য জনজাতির সর্বনাশ করতে বোলসোনারো কাজ করে চলেছেন। খ্রিস্টান মূল্যবোধের ভিত্তি’কে শক্তপোক্ত করতেও তিনি কাজ করছেন বলে বড়াই করছেন। আর কি আশ্চর্য, এই লাতিন আমেরিকা থেকেই কিন্তু ‘লিবারেশন থিয়োলজি’(মুক্তিকামী ধর্মতত্ত্ব)-র উদ্ভব! এই প্রসঙ্গে আমরা পরে ফিরব।

নিপাট মার্কিনপ্রেমী বোলসোনারোকে বলা হয় লাতিন আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের কাহিনিও একই ধাঁচের। মানুষকে অপার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, মেগালোম্যানিয়ায় ভোগা এক মানুষ। ট্রাম্প বিদায় নিয়েছেন ইতিমধ্যে। কিন্তু মার্কিন সংসদের প্রতি অশ্রদ্ধা, নারীর অধিকার হরণ, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ঘৃণা, শরণার্থীদের সঙ্গে অসহযোগিতা, তাঁদের আশ্রয়হীন করা- প্রথম থেকেই এগুলি ছিল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্যাকরণ। গোটা দেশকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন তিনি। ডেমোক্রাটরা অবশ্য কমকিছু যাননা। এরাও দেদার সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে অন্য দেশের উপর, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি বহাল রেখেছে,  প্যালেস্তাইন প্রশ্নে জায়নবাদীদের পক্ষ নিয়েছে, ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু করেছে। ‘ওবামা সিনড্রোম’ আমাদের খেয়ালে আছে।

আসলে, ডেমোক্রাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্যই। তবে এই বিষয়ে আমরা অন্য পরিসরে আলোচনা করব। আপাতত এই নাতিদীর্ঘ নিবন্ধে আমরা ভারতের ও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের কিছু ট্রেন্ড নিয়ে আলোচনা করব। ওপরের কয়েকটি অনুচ্ছেদ  থেকে এটা বোঝা যায় যে  পপুলিস্ট রাজনীতি মূলত রাজনৈতিক বিকল্পের কথায় বলে, অন্যকিছু নয়।

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের যেটা মনে হচ্ছে সেটাই সংক্ষেপে তুলে ধরব কিছু ধারাবাহিক লেখার মাধ্যমে।

ভারতের আকাশের নীচে মহা বিশৃঙ্খলা

ভারতেও পপুলিস্ট রাজনীতি জাঁকিয়ে বসেছে। ২০১৪ থেকে এক হিন্দুত্ববাদী শক্তি দিল্লির মসনদে জাঁকিয়ে বসেছে। ২০১৯শে দ্বিতীয়বারের জন্য আবারও তারা ফিরে এসেছে।  নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন ঐ ‘পপুলিজম’কে সঙ্গী করেই। হিন্দুত্ব+পপুলিজম= বিষাক্ত ককটেল। এই ককটেলের জেরে ভারতজুড়ে আজ এক মহা বিশৃঙ্খলা। সেটা আরও প্রকট হয়েছে যখন আমরা এই অতিমারী’র সময়টা অতিক্রান্ত করছি। এই অতিক্রান্তিকালীন সময়ে কেন্দ্রের আসীন সরকারের উৎকট নীতি ও আচরণে সংকট গভীর থেকে গভীরতর। গোটা দেশ আজ খাদের কিনারায়। দেশের রাজধানী আজ বলতে গেলে চারিদিক দিয়ে অবরুদ্ধ। লক্ষ লক্ষ কৃষক, আমাদের অন্নদাতা, এখন রাস্তায় দিনরাত বসে আছেন।

বিকল্প রাজনীতির সন্ধানে

ঠিক এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কড়া নাড়ছে। এখনও নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরী আছে। কিন্তু কি হবে ভোটে, তার হিসেব কষাকষিতে ও নির্বাচন পূর্ববর্তী জোট নিয়ে পরিস্থতি সরগরম হয়ে উঠছে।  অনেকেই এই উত্তাপে গা সেঁকছেন। আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব-সহযোগী লেখালেখি, বক্তব্য রাখছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় হরেক মন্তব্য-পালটা  মন্তব্যের ঝড়। সেখান থেকে বাকবিতণ্ডা, ঝগড়া। কিন্তু, মূলত রাজনৈতিক বিকল্প নিয়েই সবাই বলছে।

কিন্তু যেধরণের রাজনীতির উদ্ভাবন করা দরকার সেটার রাজনৈতিক অভিমুখ অন্যরকম হওয়া জরুরি। এর ভিত্তি হওয়া উচিত সাংবিধানিক রাজনীতি (Constitutional Politics), সামাজিক ন্যায় (Social Justice), বন্টন সংক্রান্ত ন্যায় (Distributive Justice), সম-অধিকার (Equal Rights), মর্যাদা (Dignity), ভ্রাতৃত্ব (Fraternity) ইত্যাদি। এগুলি মূলধারার রাজনীতির মধ্যে কখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি কেননা স্বাধীনতা পরবর্তী সাতদশকের রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকায় আসেনি। অথচ, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।

এই বিষয়গুলিকে সামনে রেখে প্রচলিত মূলধারার রাজনীতি- বামপন্থী অথবা দক্ষিণপন্থী-র ঘেরাটোপের বাইরে থেকে বিকল্প রাজনীতির সন্ধান যারা করবেন, সেটা জনহিতকর হবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু সমস্যা হল যারাই এই বিকল্প রাজনীতির কথা বলবেন তাদের নৈতিক সঙ্কটে (moral crisis) ফেলে দিয়ে কলঙ্কে দেগে দেওয়া হবে। এটাকে বলা হয়  ব্রাহ্মণ্যবাদী কৌশল (Brahmanical tactics)। বাবাসাহেব আম্বেদকর বলেছিলেন, ‘…By Brahmanism I mean the negation of the spirit of Liberty, Equality and Fraternity. In that sense it is rampant in all classes and is not confined to the Brahmins alone though they have been originators of it…”

অধ্যাপক গোপাল গুরু সঠিকভাবেই বলেছেন, “…theoretical Brahmins and empirical shudras.” মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলিও এই ফাঁদে পড়ে গেছে।

এই পোর্টালে গতবছর আগস্ট মাসে প্রান্তিকে থাকা মুসলমান-দলিত-আদিবাসী সমাজের কথা অর্থাৎ নিম্নবর্গীয় সমাজের মনের কথা একটু চাঁছাছোলাভাবে যিনি বলছিলেন, সেই আব্বাস সিদ্দিকীকে নিয়ে আমরা প্রতিবেদন করেছিলাম। স্বাগত জানিয়েছিলাম মূলধারার বিপরীতে থাকা এই বিকল্প ধারার উত্থানকে। সেই বিকল্প ধারার প্রবাহ গত কয়েকমাসে আরও গতি পেয়েছে। সেই ধারা এখন একটি রাজনৈতিক শক্তিতে সংহত।

লাতিন আমেরিকায় গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে খ্রিস্টধর্মের একটি তত্ত্ব  উঠে আসে- Liberation Theology। বলা হয়, ধর্মীয় আদর্শে নিষ্ঠাবান থেকেও সমাজের অন্যায় অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে মার্কসবাদী ও অন্যান্য বিপ্লবী শক্তিগুলির সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। নিকারাগুয়া, কিউবা, বলিভিয়া প্রভৃতি দেশে আমরা এই সম্পর্ক গড়ে তোলার উদাহরণ দেখেছি। পরিবেশ-পরিস্থিতি এখানে ভিন্ন হলেও একটা তুলনা আমরা টানতেই পারি।

আব্বাস সিদ্দিকী ফুরফুরা শরীফের পীর আবু বক্কর সিদ্দিকী’র বংশধর। আবু বক্কর (১৮৪৬-১৯৩৯) তাঁর সময়কালে মুসলমান সমাজে তিনি ধর্মীয় সমাজসংস্কারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে বলা হত ‘মুজাদ্দিদ-ই-জামান’ দাদা হুজুর পীর কেবলা। শিক্ষা-সমাজ-ধর্ম সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর বহুমুখী কাজকর্ম মানুষ আজও স্মরণ করে। সেই ফুরফুরা শরীফ থেকেই আব্বাস সিদ্দিকীর উত্থান। তিনি ধর্মীয় আদর্শে নিষ্ঠাবান থেকেই সামাজিক ন্যায় ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে মুসলিম-আদিবাসী-দলিত সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন। শুধু রুটি-রুজির প্রশ্ন নয়, হ্যাঁ আত্মমর্যাদার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে এই প্রান্তিক সমাজের মানুষগুলির বাঁচার তাগিদে। সেই তাগিদকে জোরাল করতেই রাজনৈতিক ময়দানে অবতীর্ণ তিনি। বহু মুসলিম-আদিবাসী-দলিত নেতা গত কয়েক দশকে রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের বেশিরভাগই সওদার রাজনীতি করেছেন। তাঁরা  ধোঁকা দিয়েছেন নিজের কওমকে। গোটা সমাজকে। তাঁরা বিশ্বাসঘাতক।

আমরা নজর রাখব এই বিকল্প উত্থানের দিকে। শুধু রাজনৈতিক বিকল্প নয়, বিকল্প রাজনীতির পথ শুরু হোক এখান থেকেই।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে তার জন্য।

 

 

Facebook Comments