কেন এখনও সুখ থেকে স্মৃতিতে, রবীন্দ্রনাথ? | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

কেন এখনও সুখ থেকে স্মৃতিতে, রবীন্দ্রনাথ?

মিরাজুল হক

মনের বিকাশ ও গঠন, বছর চব্বিশ-পঁচিশ বয়সের মধ্যে সঠিক ইনপুট না আপলোড করলে, বিকৃত ভুল অন্যায় বিপর্যস্ত আউটপুটের বিশিষ্ট একধরনের প্রাণীতে পরিনত হয়ে উঠবে। ঠিক মানুষ হবে না।

মানবজীবন একটি সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক সত্তা। তাই, হৃদয়-  মনের অনুভূতির ভাষাগত রুপান্তরের জন্য, আদর্শহীন চরিত্রহীন একটি অমানবিক প্রাণী থেকে মানবিক গুণের উন্নত আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য, জীবন বিকাশের জন্য সাহিত্যের এই ধারায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অকল্পনীয়; ওজন করে মেপে বলা সম্ভব নয়। কবি বিষ্ণু দে’র করুণ আকুতি,

“আমাদের ক্ষীয়মাণ মানসে ছড়াও, সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আশি বছরের আলো”।

মাথা উঁচু করে খুব গর্ব করে বলি, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমাদের জন্ম। তাঁর কাছে আমাদের ঋণের বোঝা, অন্য মনিষীদের থেকে অনেক বেশী। ‘স্বপ্নভাবনাআশাআকাঙ্খাবেদনাবিহ্বলতা’য় ভরা আমাদের এই জীবনযাপনের প্রেক্ষাপটে, অনেকেই স্বীকার না-করলেও, সজ্ঞানে অজ্ঞানে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব আছে। ইদানীং পাড়ায়-পাড়ায়, ক্লাবে-স্কুল-কলেজে, রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা উদযাপন করার পরম্পরাগত প্রথা একদমই কমে গেছে; সকাল সন্ধ্যায় এপার বাংলার মধ্যবিত্ত বাড়ীতে গানের রেওয়াজও কমেছে। তবুও এপার-ওপার বাংলা ছাড়িয়ে, দেশের সীমানা অতিক্রম করে, সারা বিশ্বজুড়ে, এই ভাষায় যারা কথা বলে থাকি, তারা সবাই কোন না কোন সময়ে ভাবুক হয়ে পড়ি; কেউ কেউ নয়, আমাদের সকলেরই কবিসুলভ মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এটার মূল কারণ রবীন্দ্রনাথ। সর্ব ভূমিতে তাঁর বিচরণ, সর্ব মানবীয় ক্ষেত্রে প্রাপ্তি ও আকুলতায় তাঁর শিল্পীসত্তার পুষ্টি। সর্বজনের অন্তরের গভীরে তাঁর জায়গা।

মনের বিকাশে রবীন্দ্র–উপকরনের বিশাল ভাণ্ডারের কোন কোন দিকগুলো বেশী অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, তা বেছে নেওয়া শুধু দূরহ কঠিন নয়, খুবই শ্রমসাধ্য। তাঁর সত্তরতম জন্ম-জয়ন্তী উৎসবে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে মানপত্র দিতে গিয়ে “সার্বভৌম কবি” বলে সম্বোধন করেছিলেন। কবিতার সর্ব বিষয়ে তাঁর অবাধ সাবলীল বিচরণ, জীবনযাপনের নানান বাঁকে বাঁকে, তাঁর কবিতার প্রভাব ও বিন্যাস। এই জন্য আমরা মুগ্ধ। বিস্ময় বিহ্বলে চমৎকৃত। এই বিশ্বজুড়ে ‘সভ্যের বর্বর লোভ’ বা ‘নির্লজ্জ অমানুষতা’র বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, তাঁর কবিতা আমাদের মনোবল বাড়িয়ে দেয়। আধপেটা খেয়ে, একবেলা না খেয়ে যারা ‘মাঠে মাঠে বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে, কাজ করে নগরে প্রান্তরে’, তাদের কথা ধ্বনিত হয় তাঁর কবিতায়। মনের বিকাশে এটা বড় উপাদান।

অন্যদিকে, সেই শিশু বয়সে স্কুলে প্রার্থনার লাইনে দাঁড়িয়ে“ সারা জীবন দিল আলো, সূর্য গ্রহ চাঁদ” থেকে শুরু করে কৈশোরের “ একটুকু ছোঁয়া লাগে” থেকে পরিনত বয়সে, “জগত জুড়ে উদার সুরে” আনন্দের গান গেয়ে কোন ফাঁকে যে পরম করুণাময়ীর চরণে মাথা ঠেকিয়ে দিয়েছি– তা বেশ অনুভব করতে পারি। তাঁর গানে সবই আছে। সতেন্দ্রনাথ দত্তের কথায়, “যেভাবেই ওঠে প্রাণের মাঝে, তোমার গানে সকলই আছে”। আমাদের এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য,  ‘গীতবিতান’ ছুঁয়ে কথা বলতে ইচ্ছা হয়, শপথ নিতে ইচ্ছা করে।

যে বিষয় নিয়ে এখনও প্রশ্ন উঠে আসে সেই সুখ হতে স্মৃতিতে, বাসনা হতে শান্তিতে, ব্যথা হতে গীতিতে রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হই, বারবার অনেকবার নিজের অজান্তেই। কিন্তু কেন? আসলে, জীবনযাপনের নানান পর্যায়ে মানবহৃদয়ের বিভিন্ন প্রকারের অনুভুতি সহানুভূতিগুলি নিয়ে অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তিনি। কবি সুকান্ত বলেছেন, “এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে, তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে”।

কবিতা ও গানের অভাবনীয় গুরুত্বের দিকটা সরিয়ে রেখে, মানবমনের বিকাশে রবীন্দ্র-উপকরনের বিশাল ভাণ্ডারের দুটি উপাদান বা বিষয় সচেতন ভাবে অনুশীলন করা দরকার। প্রথমটি হল রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প আর দ্বিতীয়টি তাঁর চিঠিপত্রের ডালি, বিশেষত ছিন্নপত্রাবলি’র কথা এখানে উল্লেখ করতেই হবে।

বাংলার ছোটগল্পের সূত্রপাত তাঁর হাতে। এখানে, তাঁর সংগে তুলনীয় মনের দক্ষতার পরিচয় তাঁর আগে ও পরে বাংলা সাহিত্যে কেউ বোধহয় দিতে পারেননি। জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে তিনি বাংলার বিস্তীর্ণ পল্লী-প্রকৃতি, জনজীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তারই প্রকাশ পোস্টমাস্টার , ছুটি , অতিথি , সমাপ্তি প্রভৃতি গল্পে। আবার দেনাপাওনা, গিন্নি, রাম কানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, মনিহার, নষ্টনীড়, দেবী, ভিখারিনী,  ইত্যাদি ছোট গল্পগুলো যে ‘high class literature’, তা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। অনেক গল্পের কাহিনী তাঁর আপন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচনা করেছেন যেমন, তেমনি কল্পনার ভিত্তিতে লেখা, বাংলা সাহিত্যের এই শাখাটিকে পরিপূর্ণ রূপে নির্মাণ করেছেন।  শব্দ ভাষায় গল্পের কাহিনীর পাশাপাশি পল্লীগ্রামের যে চালচিত্র, মধ্যবিত্ত সংসারের অনটন, গরীবের বেদনা, দৈনন্দিন সুখ দুঃখের ওঠানামার যে অসাধারণ বিবরণ আছে, তা মানবমনের বিকাশে বড় ইনপুট বা উপকরণ।

তাঁর আর একটি অভাবনীয় সৃষ্টি হল ছিন্নপত্রাবলী; যেখানে বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়া যায় এবং প্রকৃতি ও নিসর্গ অনাবিল সৌন্দর্যের পাশাপাশি, শিলাইদহ– পতিসর, শাহজাদপুরের দুঃস্থ মানুষের জীবনগাথাও সমানভাবে উজ্জ্বল। এতে রবীন্দ্র চেতনায় দার্শনিক দিকের পরিচয় মেলে। তাঁর শিল্পসাহিত্যে বাংলার নদী ও মানুষের দ্বারা কতটা অনুপ্রানিত হয়েছিলেন তা তাঁর কবিতায়, গানে নাটকে উপন্যাসে প্রবন্ধে বোঝা যায়। দারিদ্র ঘেরা মানুষের কর্ম ও জীবনস্রোত তাঁর দর্শন কে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, তা অসম্ভব বাস্তব তায় বর্ণনা করেছেন ছিন্নপত্রে। ছিন্নপত্র কতগুলো চিঠিপত্র নয়, একটি মহা ইঙ্গিত, ধ্যানী ঋষিমনের বাসনা; যার মাধ্যমে অন্য একজন মানুষকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথ যেন মাটি ও মানুষের রবীন্দ্রনাথ, আমাদের রবীন্দ্রনাথ।

এখানেই একজন জীবন নির্মাতার সাহিত্য সাধনার ব্যাপ্তি।

তাই, জীবনকে সুস্থভাবে গড়ে তোলার নিরিখে এখনও রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য। এখনও চাতক পাখির মতো আকুতি ভরে তাঁকেই যেন ডাকি,

“তোমার আকাশ দাও, কবি দাও, দীর্ঘ আশি বছরের…” (বিষ্ণুদে)।

কভার ফটো- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাল ১৯২৫। উইকিমিডিয়া কমন্স 

Facebook Comments