উচ্ছেদঃ আসামে জল-জমি-জঙ্গল লুন্ঠনের নতুন ষড়যন্ত্র | The Background

Monday, August 2, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

উচ্ছেদঃ আসামে জল-জমি-জঙ্গল লুন্ঠনের নতুন ষড়যন্ত্র

তানিয়া লস্কর: শিলচর

‘উচ্ছেদ’ আসামে গরীব মজলুম জনতার জীবনে বন্যার মতো একটি বাৎসরিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সনের মার্চ মাসে এরকমই একটি জোরজবরদস্তি উচ্ছেদের ফলে প্রাণ দিতে হয় কুলসুম আরা বেগমকে যিনি সদ্য মা হয়েছিলেন। তাকে গর্ভাবস্থায় টেনে হেঁচড়ে ঘর থেকে বের করে আনা হয়।  সেবার কুলসু্ম আরার সাথে গৃহহারা হয়েছিলেন প্রায় ৬০০ পরিবার। সে-বছরই ডিসেম্বর মাসে শোণিতপুর জেলায়  উচ্ছেদ করা হয় আরো প্রায় ৫০০ পরিবারকে।  ২০২০ এ কোভিড অতিমারীর মধ্যেই কামরূপ জেলার আমচাং অভয়ারণ্য প্রায় ৩০ টি পরিবারকে উচ্ছেদের নোটিশ ধরিয়ে দেওয়া হয়। ২০২১ এ সরকার পরিবর্তনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে শোণিতপুর, নগাঁও, করিমগঞ্জে আবার শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান। যদিও গৌহাটি উচ্চ ন্যায়ালয় নিজেদের একটি  রায়ে বলেছিলেন যে অতিমারীর সময় কোনধরনের উচ্ছেদ অভিযান না করা হয়। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে আবারো উচ্ছেদ করা হয় প্রায় দু’শ পরিবারকে।

আসামে  উচ্ছেদ এর সাথে আরেকটি বিষয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত সেটি হল তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা আদিবাসীন্দাদের ভূমির অধিকার হরণ’ এর ন্যারাটিভ। আসামে যেকোন বেআইনি অনৈতিক কাজের জন্য জন-সমর্থন আদায়ের অব্যার্থ অস্ত্র হলো এই ন্যারেটিভ। এক্ষেত্রেও এই মোক্ষম অস্ত্রটি প্রতিবার ব্যাবহৃত হয়। কৌম-জাতীয়তাবাদী এবং ডানপন্থীরা হাতে হাত মিলিয়ে এধরনের ভাষ্যকে কাজে লাগিয়ে জনসাধারনের মধ্যে উচ্ছেদের সপক্ষে একটি আপাত সমর্থন আদায় করে নেন। এই ভাষ্যটি যেহেতু গত চার-পাঁচ দশক ধরে খুবই পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ হয়েছে, সেহেতু জনসাধারণের মনে ইতিমধ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের একটি চেহরা তৈরি হয়েই আছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর মতো তারাও কাপড়-চোপড় দেখে তাদের ধর্ম এবং সম্প্রদায় বিচার করে তাদেরকে সেই তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করতে ভুল করেন না। এবারও ঠিক তাই হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা উচ্ছেদের পরের দিনই সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন যে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ে জন্মের হার বেড়ে যাওয়ার জন্যই নাকি আসামে তথাকথিত  অবৈধ দখল বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। তিনি সরাসরি নাম না নিলেও তিনি কাদের কথা বলেছেন সেটা বুঝতে কারোও কোন অসুবিধা হয় না। তাই এধরণের কথাবার্তাগুলোকে ডানপন্থীদের বোকা-বোকা অশ্লীলতা বলে  অগ্রাহ্য করা মোটেই উচিত নয়। বরং এর পিছনে যে নীল-ছক কাজ করছে সেটা বুঝতে হবে। বুঝতে হবে এতে কার রাজনৈতিক ফায়দা হচ্ছে।  এধরনের কাজের ফলে একটি তীরে দুটি বা কয়েকটি পাখি মারার মতো কাজ হয়। একদিকে কৌম-জাতীয়তাবাদীদের হিংসায় হাওয়া দেওয়া হয়। অন্যদিকে নতুন উদারবাদের নৌকার পালে হাওয়া যোগানোও হয়ে যায়। তাছাড়া দিল্লির আঁকাকে নিজের শক্তি প্রদশর্নের জরুরি কাজটাও হয়ে যায়।তবে এতো সবে শুরু।   এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে যে আসাম সরকারের নিজেদের পরিসংখ্যান মতে প্রতিবছর ৮০০০ হেক্টর জমি নদীর বুকে মিলিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত চারহাজার বর্গ মিটার জমি নদীভাঙনের ফলে মিলিয়ে গেছে এবং এতে প্রায় ৭ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অথচ সরকারের আজ পর্যন্ত কোন এ সংক্রান্ত কোন পুনর্বাসন নীতি নেই। এতো লোক যারা বাস্তুচ্যুত হলেন তারা বেমালুম উবে যান নি নিশ্চয়। তারাই এসব খালি জমিগুলোতে বছরের পর বছর বসবাস করে আসছিলেন। তারা সোজা ভাষায় বললে এক দলের সরকারের অকর্মন্যতার ফলে একবার বাস্তুহারা হয়ে এসব জায়গায় এসে বসত করেছিলেন আজ আরেকদলের ঘৃণার রাজনীতির স্বীকার হয়ে চলছেন।

আবার ফিরে আসি ভূমি নীতি নিয়ে রাজনীতির প্রশ্নে।  ২০১৮ সনে যখন এনারসির খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয় তার সাথে সাথে আরেকটি নথি চর্চায় আসে।

 ব্রহ্ম কমিটি রিপোর্ট

অবসরপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার হরিশংকর ব্রহ্মর নেতৃত্বে আদিবাসিন্দাদের অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে পরামর্শ দেওয়ার জন্য এই কমিটি গঠন করা হইয়েছিল। এই কমিটি তাদের রিপোর্টে বলেন যে যেহেতু অসমের বেশিরভাগ জমি নন-আদিবাসিন্দা এবং অবৈধ অণুপ্রবেশকারিদের হাতে চলে গেছে তাই সেগুলো উদ্ধার করে আদিবাসিন্দাদের হাতে পৌছে দিতে হবে। এবং এজন্য জমি  হস্তান্তরের নিয়মগুলো কড়াকড়ি করতে হবে। দখলকৃত জমিগুলো উদ্ধার করতে হবে।

এছাড়াও এই কমিটি ‘আদীবাসিন্দা’র সংজ্ঞা নির্ধারণ করার চেষ্টা করে। সেটা করতে গিয়ে তারা বলেন যে আদিবাসিন্দা হতে হলে প্রথমতঃ তাদেরকে অসমের কোন জাতিসত্তার হতে হবে। আর তাকে আসামে উৎপন্ন যেকোন ভাষায় কথা বলতে হবে। তাছাড়া যে ব্যাক্তি ভারতের অন্য কোন রাজ্যে আদিবাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃত তিনি অসমে আদিবাসিন্দা হতে পারবেন না। তারা এপর্যন্ত বলেন যে আদিবাসিন্দা তিনিই যিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস করেন যে তার পূর্বপুরুষরা আসামে বহিরাগতদের আগমন এবং অতিক্রমনের ফলে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন।

 আসাম ভূমি নীতি 

ব্রহ্ম কমিটির পরামর্শ মেনে ২০১৯ সনে আসাম ভূমি নীতি তৈরি করা হয়। সেখানে ব্রহ্ম কমিটির প্রায় সব পরামর্শ সংযুক্ত করা হয়। যদিও এই নীতির ভাষা অনেকটা যাকে বলে সরকারি ভাষা। এখানে আদিবাসিন্দাদের সুজাসুজি আদিবাসিন্দাদের জমি বন্টন করার কথা বলে।  যদিও ‘আদিবাসিন্দা’ শব্দ বন্ধটিকে কোথাও সংজ্ঞায়িত করা হয় নি কিন্তু  শব্দটি পুরো নথিতে  ৪০ বার ব্যবহার করা হয়েছে। নীতিটিতে আরোও বলা হয় যে চর-অঞ্চলের জমি সমূহের উপযুক্ত জরিপ এবং বন্টনের ব্যাবস্থা করা হবে। অতএব দুয়ে দুয়ে চার করলে সহজেই বোঝা যায় এই জমিসমূহ কাদেরকে বন্টন করা হবে এবং কাদের উচ্ছেদ করা হবে।

শর্মা কমিটি 

২০১৯ সনে যখন সারা দেশে সিএএ নিয়ে প্রতিবাদ তুঙ্গে তখন ভারত সরকারের গৃহ বিভাগ গৌহাটি হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বি কে শর্মার নেতৃত্বে একটি উচ্চস্থরীয় কমিটি গঠন করেন। উদ্দেশ্য  ছিল আসাম চুক্তির ৬ দফার বাস্তবায়নের জন্য জনগণ তথা বিজ্ঞ মহলের মতামত গ্রহন করে পরামর্শ দেওয়া।  সেই কমিটিও ২০১২ সনের আগস্ট মাসে নিজেদের প্রতিবেদন দাখিল করেন। তাদের পরামর্শগুলো আরোও এক কাঠি বেড়ে ছিল। তাদের মতেঃ-

১। ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ সংসদীয় আসন অসমিয়াদের জন্য সংরক্ষিত করে রাখতে হবে।

২। ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ  গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি পোস্ট অসমিয়াদের জন্য সংরক্ষিত করে রাখতে হবে।

৩। ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ বেসরকারি চাকুরি অসমিয়াদের জন্য সংরক্ষিত করতে হবে।

৪। জমি কেনার অধিকার শুধু অসমিয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে হবে।

এছাড়াও সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ভাষিক অধিকার নিয়ে নানারকম উগ্র-জাতীয়তাবাদী পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে অসমিয়া পরিচয়কে আবার নতুনকরে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে। শর্মা আইনের লোক। তিনি অসমিয়া সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন যে ১৯৫১ সন পর্যন্ত যারা বা যাদের পূর্ব-পুরুষরা আসামে ছিলেন তাদেরকেই শুধু অসমিয়া বলে ধারণা নেওয়া হবে। তারমানে ১৯৭১ সন পর্যন্ত যারা মুক্তিযুদ্ধের ফলে ভারতে এসেছিলেন তাদেরকে এনারসিতে যুক্ত করা হলেও কিংবা নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া হলেও জমির অধিকার থেকে সোজাসুজিভাবে বাদ দিয়ে দেওয়া হল।  সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে শেষের সে দিনটি বোধহয় আরও অনেক ভয়ঙ্কর হতে চলছে। আসামে নাগরিকদের সোজাসুজি দুটি শ্রেণিতে ভাগ করার চেষ্টা চলছে। সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিকভাবে। এর ফলাফল অনেক সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

 

 

 

Facebook Comments