একটি হত্যা, কিছু প্রশ্ন | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

একটি হত্যা, কিছু প্রশ্ন

অশোকতরু চক্রবর্তী

দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় আইনের বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে উত্তর প্রদেশেও। তার জেরে ঐ রাজ্যে চলছে আতঙ্কের রাজত্ব। কাশ্মীর যেমন অবরুদ্ধ, তেমনই অবরুদ্ধ উত্তর প্রদেশেও। এখনও পর্যন্ত ১ লক্ষেরও বেশি এফআইআর হয়েছে অনামী ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে। এরমধ্যে কানপুরে ২২ হাজার ৫০০। মুজফফরনগরে ৫ হাজার ৫০০। মীরাটে ৫ হাজার। বাহরাইচে ২ হাজার ২০০। সংবাদসংস্থা পিটিআই আজ জানিয়েছে, লখনউ-এর এক সেশন আদালত সমাজ কর্মী ও অভিনেত্রী সাদাফ জাফর ও প্রাক্তন আইপিএস অফিসার এসআর দারাপুরী সহ ১৩ জন কে জামিনে রেহাই দিয়েছে।

উত্তরপ্রদেশ জুড়ে এখন আতঙ্ক। সেটা এতটাই যে বহু মানুষ বাড়িছাড়া, এলাকা ছাড়া। আতঙ্কের শিকার মূলত মুসলমান সমাজ।

গণ আন্দোলনের নেত্রী কবিতা কৃষ্ণান একটি প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন, মীরাট এবং মুজফফর নগরে সমস্ত প্রাইভেট হাসপাতালকে পুলিশ নির্দেশ দিয়েছে যাতে গুলিবিদ্ধ আহত কাউকে ভর্তি করা যাবেনা। কেবলমাত্র সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেখানে আহত ব্যক্তিকে তার পরিবারের কারুর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হবেনা। সেই ব্যক্তি যদি মারা যান, সেই মৃতদেহ পরিবারের কাউকে না জানিয়ে সরাসরি মর্গে চালান করে দেওয়া হবে। তিনি হয়ে যাবেন অশনাক্ত এক ব্যক্তি।

এমনই এক অশনাক্ত লাশকে ঘিরে এই প্রতিবেদন। শেখ সিরাজুল আলির কাহিনি। এই প্রতিবেদক সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছিল সিরাজুলের পরিবারের সঙ্গে। তাঁরা শুনিয়েছেন এক মর্মন্তুদ হত্যার কাহিনি। সিরাজুলের কাকা শেখ বসির আলি জানালেন, “একদিন রাতে সিরাজুলের ফোন এলো তার কাছে। ভীত কণ্ঠস্বর। মাত্র কয়েক মিনিটের কথা। সিরাজুল বলল, গোটা মীরাট জুড়ে আতঙ্কের পরিবেশ। চলছে কারফিউ। ১৪৪ ধারা। সে গৃহবন্দী। ৬দিন পেটে দানাপানি তেমন পড়েনি। বাড়িতে রয়েছে। সে । দেশের বাড়ি ফিরতে চায়। এই ফোনটা এসেছিল প্রাইভেট বুথ থেকে। মোবাইল বন্ধ করে রাখা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। সেটা ছিল ১৯ ডিসেম্বর।”

২৪ ডিসেম্বর বজবজের বাড়িতে খবর আসে সিরাজুলের মৃত্যুর খবর। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ভাই শেখ জুলফিকার আলি। কাকার চোখেও জল।

বসির জানালেন, আধার কার্ডে শেখ সিরাজুলের ছবি দেখে লিসার গেট থানার (যেখানে থাকতেন) পুলিশ আধিকারিক দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এক পুলিশ কর্তাকে ফোন করেন। তারপর সেই ছবি শনাক্তকরণের জন্য বসির আলিকে হোয়াটসআপ করা হয়। পরে বসির লিসার গেট থানার ওসি’কে ফোন করেন পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে। ওসি ফোনেই বলেন, হয় লাশ নিয়ে যাও। নাহলে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হবে বা জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।

বসির জানালেন, ইসলামধর্মী একজন মানুষকে কবর দেওয়ার বদলে জ্বালিয়ে দেওয়া হলে তা হবে অ-ইসলামিক কাজ। তাই তড়িঘড়ি তারা রাজ্য প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। সরকারী ব্যবস্থাপনায় শেখ সিরাজুল আলির পরিবারের লোকজন মীরাটে যায়। তারা মৃতদেহ ফিরিয়ে আনে পশ্চিমবঙ্গে। কান্নাভেজা কণ্ঠে বসির বলে চলেন, এ লাশ দেখা যায়না। তরতাজা এক জোয়ানের গলা বিদ্ধ বেয়নেটের আঘাতে। শরীরে গুলির আঘাতও ছিল।

গত ৩১ ডিসেম্বর সিরাজুলের শেষকৃত্য হয়। জানাজায় প্রচুর মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। সিরাজুলের ৪ ভাই ৩ বোনের সংসার। মীরাটে ছিলেন ১৫ বছর। সেখানেই এক বেসরকারী স্কুলে চাকরি করতেন। কাকা বসির আলি বললেন, ওর আয়েই সংসারটা চলত।

উত্তর প্রদেশ ঘুরে আসা একটি তথ্য অনুসন্ধানী দলের রিপোর্ট বলছে, মীরাটে সবথেকে খারাপ যে ব্যাপারটা হয়েছে তা হল গরীব ও চিরবঞ্চিত মানুষগুলিকেই সেখানে হত্যা করা হয়েছে। সর্বোপরি মামলা করা হয়েছে সেইসব নিহত মানুষগুলির বিরুদ্ধেই। এই মানুষগুলি ছিলেন তাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। এইসব বিপন্ন পরিবারগুলির কোনওরকম অভিযোগও জমা নিচ্ছেনা পুলিশ।

Additional Reporting- নাজিব আনোয়ার

 

Facebook Comments