মহান কবি আল মাহমুদ | The Background

Saturday, February 27, 2021

Contact Us

Google Play

মহান কবি আল মাহমুদ

সাহিদুল ইসলাম

বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে বিষাদ ছড়িয়ে ‘সোনালি কাবিন’-এর কবি আল মাহমুদ ‘কালের কলস’-এ ভেসে ‘লোক লোকান্তর’-এ পাড়ি দিলেন গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯। বাংলা ভাষার এক মহান কবি তিনি, যার ‘সোনালি কাবিন’-এর মতো কাব্য এক হাজার বছরে বোধহয় একবারই লেখা হয়। জন্ম ১৯৩৬ এর ১১ জুলাই। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইল গ্রামের মুল্লাবাড়িতে। রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার। শিক্ষার হাতেখড়ি দাদি বেগম হাসিনা বানু মীরের কাছে। মসজিদের ইমামের কাছে ধর্মীয় শিক্ষা নেন। এরপর ব্রাক্ষণবাড়িয়া এম ই স্কুল, সেখান থেকে ষষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর সপ্তম শ্রেনিতে ভর্তি হন জর্জ হাইস্কুলে। পরবর্তীকালে সীতাকুণ্ড হাইস্কুল ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলে পড়েন। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়(১৯৫২) ভাষা আন্দোলনের পক্ষে কবিতা লেখার অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ব্রাক্ষণবাড়িয়া ভাষা আন্দোলন কমিটির আহ্বানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। অর্থ সংগ্রহের জন্য টিনের কৌটো হাতে বক্তৃতা দেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ মুল্লাবাড়িতে হানা দেয়। তিনি আত্মগোপন করেন। বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তিতাস নদীর তীরে প্রকৃতির কোলে। যৌবনে ১৯৫৪তে ঢাকা শহরে পা রাখেন। চাকরি নেন দৈনিক ‘মিল্লাত’-এ, প্রুফ বিভাগে। পাশাপাশি চলতে থাকে সাহিত্য চর্চা। পরিচয় হয় কবি শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদরির সঙ্গে। ১৯৫৫তে ‘মিল্লাত’ ছেড়ে যোগ দেন ‘কাফেলা’য়। ১৯৬৩তে ‘ইত্তেফাক’-এর প্রুফ রিডার পদে যোগ দেন। সাময়িকভাবে এই পত্রিকা বন্ধ হলে ১৯৬৮তে আল মাহমুদ চট্টগ্রামের ‘বইঘর’ প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন। একবছরের মধ্যে তিনি ইত্তেফাক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগের অফিসার পদে যোগ দেন। ১৯৭২-এ ‘গণকন্ঠ’  পত্রিকায় সম্পাদক। সরকার বিরোধী প্রতিক্রিয়া সম্পদনার অপরাধে ১৯৭৪-এর মার্চে তিনি কারাগারে বন্দী হন। ছাড়া পেলে তৎকালীন রাস্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবর রহমান তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীতে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এখান থেকে ১৯৯৩ সালে তিনি অবসর নেন। অভিযোগ তিনি শেষের দিকে ধর্মভাবে আপ্লুত হয়ে কাব্যের মধ্যে মৌলবাদী ভাবনাকে স্থান দিয়েছেন। তাই মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকের একটা বড় অংশের অবহেলার শিকার হয়েছিলেন। উপেক্ষিত হয়েছিলেন আল মাহমুদ।

আল মাহমুদ ছেলেবেলা থেকেই কবিতা লেখেন। তিনি যখন ক্লাস সিক্সে, তাঁর কবিতা দৈনিক সত্যযুগে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩তে লেখক-সাংবাদিকদের যৌথ প্রকাশনা সংস্থা ‘কপোতাক্ষ’ থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোকলোকান্তর’। কবিকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক প্রকাশিত হয় ‘কালের কলস’ (১৯৬৬), ‘সোনালি কাবিন’ (১৯৭৩), ‘মায়াবি পর্দা দুলে ওঠো’ (১৯৭৬), ‘বকতিয়ারের ঘোড়া’ (১৯৮৫), ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’ (১৯৮৭), ‘গ্রহরান্তের পাশ ফেরা’ (১৯৮৮), ‘একচক্ষু হরিণ’ (১৯৮৯), ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ (১৯৯৩), ‘দোয়েল ও দয়িতা’ (১৯৯৭), ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৯৮), ‘নদীর ভিতরে নদী’ (২০০১), ‘তোমার রক্তে, তোমার গন্ধে’ (২০১০) ইত্যাদি।

জ্যোতির্ময় দত্ত বলেছেন, ‘যে সকল দুঃসাহসী কবি বাঙালিত্বের শরীর ও আত্মাকে রূপ দিয়েছিলেন, আল মাহমুদ তাঁদেরই একজন’। তাঁর কবিতা ইন্দ্রিয়ময়, পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত হয়। তিনি একদিকে রোমান্টিক, প্রেমিক কবি যেমন, তেমনই আবার গ্রাম-বাংলার পরিচিত জগৎ তাঁর কবিতায় বাসা বাঁধে। যৌনতাকে কিভাবে নান্দনিক রূপ দিতে হয় তা তিনি আমাদের দেখিয়েছেন। আল মাহমুদের মতে, ‘কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান/ আমার মায়ের মুখ;’। প্রকৃতির উপকরণ তাঁর কবিতার প্রাণ। চেনা ছন্দে মিশে আছে দেশীয় প্রাকৃতিক রং-‘আম্মা বলেন, পড়বে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসে না/ কাঁঠাল-চাঁপার গন্ধে।’

প্রেম ও রমণী শরীরের প্রতি আল মাহমুদের কাব্যময় অভিনিবেশ লক্ষ করা যায়। কর্ষণের মাটি ও কর্ষণের নারী তাঁর কাছে এক হয়ে গেছে। কাঙ্ক্ষিত রমণী আহত হয়েছে হৃদয়ে, শরীরে, ভূমিতে। এক হয়ে গেছে হৃদয়, শরীর ও বাংলাদেশ। ‘সোনালি কাবিন’-এ যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁর কবিকৃতি সম্পর্কে শিবনারায়ণ রায় বলেন, “Al Mahmud has an extraordinary gift for telescoping discrete levels of experience; in his poems I find a marvellous fusion of passion and wit which reminds me occasionally of Bishnu Dey.” কাব্যজীবনের শেষের দিকে তাঁর কবিতায় ইসলাম ধর্ম প্রসঙ্গের অবতারনার ফলে অনেকে তাঁকে মৌলবাদী আখ্যা দিয়েছেন। আমাদের মনে হয় এই অভিধা তাঁর পক্ষে বেমানান। ইসলামী অনুষঙ্গে আল মাহমুদের কবিতা আরও বেশি ব্যাঞ্জনাবহ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের তথা বাংলা সাহিত্যের এই মহান কবি চিরকাল পাঠকের মুগ্ধতায় বেঁচে থাকবেন। ‘তিনি প্রচলিত শব্দের একঘেয়েমি ভাঙ্গার জন্য কথ্য ও গ্রাম্য শব্দ করেছেন স্বাধীনভাবে। … রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতায় এটাই হতে পারে স্বাস্থ্যকর প্রয়াস।’ কবিকৃতির সাফল্য তাঁকে এনে দিয়েছে ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৬৮), কাফেলা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪)ইত্যাদি। আল মাহমুদ একজন বলিষ্ঠ ঔপন্যাসিক ও ছোট গল্পকারও বটে। এইদিকটি নিয়ে আমরা পরে আলোচনায় যাব।

সহায়ক গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকাঃ

আল মাহমুদের কবিতা, হরফ প্রকাশনী, ১৩৯১

‘উপমা’ প্রত্রিকা আল মাহমুদ সংখ্যা, ১৯৯৪

‘কবিতীর্থ’ আল মাহমুদ সংখ্যা, ২০১৫

মাসিক ‘কৃত্তিবাস’ কবি আল মাহমুদ বিশেষ সংখ্যা, মার্চ ২০১৯

Facebook Comments