মোদী-শাহ-র বাপের জমিদারি তে আপনাকে স্বাগত | The Background

Sunday, September 19, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

মোদী-শাহ-র বাপের জমিদারি তে আপনাকে স্বাগত

সুশোভন পাত্র
ওনারা রাখলে রাখবেন, মারলে মরবেন। ওনারা চাইল কাগজ দেখাবেন, নইলে ডিটেনশেন ক্যাম্পে যাবেন। ওনাদের পক্ষে কথা বললে বলবেন, না হলে মুখ কুলুপ এঁটে বসে থাকবেন। ওনাদের ইচ্ছে হলে পিছনে সিবিআই লাগিয়ে দেবেন, পুলিশ লেলিয়ে দেবেন, এমনকি তাপস পাল স্টাইলে ক্যাম্পাসে লেঠেল ঢুকিয়ে দেবেন। আপনি তখন স্পিকটি নট! আপনি তখন হেইল ফুয়েরার!
অবশ্য এই জমিদারির আগে এখানে একটা দেশ ছিল। যে দেশ মানে সংবিধান, কিম্বা রক্তে লেখা বলিদান। যে দেশ মানে, সিয়াচেনের সৈনিক, তামিলনাড়ুর জেলে, বর্ধমানের কৃষক, ঝরিয়ার কয়লা শ্রমিক, মিজোরামের কুকি, অরুণাচলের নিডো তানিয়া। যে দেশ মানে রোহিত ভামুলা, কালবুর্গি-দাভেলকার-পানসারে-আখলাখ। যে দেশ মানে উত্তরের সরসো দা শাগ, দাল মাখনির সাথে দক্ষিণের ইডলি ধোসার সহাবস্থান। যে দেশ মানে বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র, ভিন্ন মতের সহিষ্ণুতা। যে দেশ মানে দুর্বার ছাত্র আন্দোলনের অসম্ভব স্পর্ধা।
ছিল এমন একটা দেশ ১৯৭৭-এ। রক্তস্নাত জরুরী অবস্থার স্মৃতি তখন টাটকা। JNU-র ছাত্র আন্দোলনে জেরে পদত্যাগ করলেন VC ডঃ নাগচৌধুরী। তবুও শক্তি বাড়িয়ে চ্যান্সেলর ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগ চেয়ে উত্তাল JNU। সেপ্টেম্বরের এক বিকেলে শ্লোগানে মুখরিত ছাত্র মিছিল পৌঁছে গেল ইন্দিরার বাসভবনে। নেতৃত্বে অন্ধপ্রদেশের আনকোরা এক যুবক – লোকে ডাকে সীতারাম ইয়েচুরি। সেদিন ‘এমারজেন্সির ক্রিমিনাল ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগ চাই’ –শ্লোগানের মাঝেই বাসভবন থেকে বেরিয়ে সটান ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন ইন্দিরা। ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্ট সীতারাম ইয়েচুরি দাবি সনদ পড়তে শুরু করতেই মুখের স্মিত হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল ইন্দিরার। দৃশ্যত বিরক্ত হয়েই দ্রুত ফেরত গিয়েছিলেন বাসভবনে।
না, ছাত্রছাত্রীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি, মুখে রুমাল বেঁধে ইন্দিরার অনুগামী ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে ঢুকে রাতের অন্ধকারে ভাঙচুরও করেনি। বরং পরের দিন JNU-র চ্যান্সেলরের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন ইন্দিরাই। আসলে আগে এখানেই আমাদের সবার একটা দেশ ছিল। সে দেশে কারও বাপের জমিদারি নয়, গণতন্ত্র ছিল।
ছিল এমন একটা দেশ ১৯৮৯-এ। গাজিয়াবাদ পৌরসভা নির্বাচন। সাহিবাবাদে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সফদার হাসমির নেতৃত্বে ‘জনম’ দলের, ‘হাল্লা বোল’ পথ নাটিকা অভিনীত হচ্ছে। মাঝ পথে, কংগ্রেসের মদতপুষ্ট একদল দুষ্কৃতির আক্রমণে গুরুতর আহত হয়ে পরের দিন মৃত্যু হয়, সফদারের। তার কিছুদিন পরেই প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এলেন বিশ্বভারতীতে। সঙ্গে সোনিয়া-রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। নির্দিষ্ট কর্মসূচির পর আম্রকুঞ্জে তিনি বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের সাথে মিলিত হলেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে এক ছাত্র রাজীব গান্ধী কে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল “আপনার দলের লোকেরা সফদার হাসমি কে কেন খুন করলো?” মুহূর্তে সবাই স্তম্ভিত। প্রধানমন্ত্রীর মুখ নিমেষে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি কি উত্তর দিয়েছিলেন জানা নেই, কারণ উত্তরটা গৌণ। মুখ্য হয়ে উঠলো প্রশ্নটাই।
আচ্ছা আজকের প্রধানমন্ত্রী কে এমন প্রশ্ন করার সুযোগ আছে? হিম্মত আছে? কিম্বা কেউ করলে তাঁর ২০৬টা হাড়ই আস্ত থাকবে এমন গ্যারান্টি আছে? আসলে আগে এখানেই আমাদের সবার একটা দেশ ছিল। সে দেশে কারও বাপের জমিদারি নয়, গণতন্ত্র ছিল।
ছিল এমন একটা দেশ ২০০৫-ও। JNU-র বার্ষিক সম্মিলনী তে আমন্ত্রিত প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। সদ্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর বক্তৃতার কিছু অংশ, আফস্পা আইন সহ একাধিক আর্থিক নীতির বিরোধিতায় তাঁকে কালো পতাকা দেখায় JNU-র নকশাল এবং অতি-বাম সংগঠনগুলি। মঞ্চে উঠে সেদিন মনমোহন সিং ফ্রেঞ্চ দার্শনিক ভলতেয়ার কে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন “আপনার বক্তব্যের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করতেই পারি, কিন্তু আমি আমৃত্যু আপনার ভিন্নমত পোষণের অধিকার রক্ষা করব।” অনুষ্ঠানের পর হুকুম সত্ত্বেও ছাত্ররা ক্ষমা না চাইলে তাঁদের শোকজ নোটিশও ধরিয়ে দেন VC। খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর অনুরোধ করেছিলেন বিক্ষোভকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিতে।
প্রধানমন্ত্রী, ছাত্র সংগঠন, VC, ভলতেয়ার –আজও সবই আছে বহাল তবিয়তেই। কিন্তু মেলাতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন তো? আশ্চর্য হচ্ছেন তো? আসলে আগে এখানেই আমাদের সবার একটা দেশ ছিল। সে দেশে কারও বাপের জমিদারি নয়, গণতন্ত্র ছিল।
এই পর্যন্ত পড়ে যারা আমাকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছেন, কিম্বা, আমার প্রোফাইলে ‘টুকড়ে টুকড়ে’ গ্যাং-র প্রতিনিধি হওয়ার জীবাশ্ম খুঁজে প্রত্নতাত্ত্বিক গোয়েন্দাগিরি শুরু করছেন তাঁরা সিট ব্যাক অ্যান্ড রিল্যাক্স! শুনুন, এমনকি ২০০২-০৩’ও NDA-র রাজত্বে কার্গিল, পোখরান সহ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে JNU-র ওপেন এয়ার থিয়েটারে বাজপেয়ীর তীব্র সমালোচনা করে পথ নাটিকা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেদিন ছাত্রদের মারধর কিম্বা ক্যাম্পাসে ভাংচুর তো অনেক দুরস্ত। JNU-র কর্তৃপক্ষ নুন্যতম একটা এনকোয়ারি কমিশনও গঠন করেনি।
আসলে গত ৬বছরে দেশের প্রিমিয়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে রাজনৈতিক ভাবে অস্থির করে তোলা নিছক বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ১৩,৬৯৭ কোটি এবং উচ্চশিক্ষা খাতে ৩,৯০০ কোটি সরকারী বরাদ্দ হ্রাস, ১৫%’র ছাড়া বাকিদের জন্য ফেলোশিপ ‘ডিসকন্টিনিউ’ করা, নতুন শিক্ষানীতি কিম্বা হালফিলের JNU-র ফি বৃদ্ধি -ল্যান্ডস্কেপে ছড়িয়ে থাকা এই বিন্দু গুলো কে জুড়লে যে নকশাটা তৈরি হবে, সেটা আসলে ‘ট্রেডেবেল কোমডিটি’ হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার অবারিত দ্বার WTO-GATS’র হাত ধরে বেসরকারিকরণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার আস্ত একটা মোডাস অপারেন্ডি। যে অপারেন্ডির হাত ধরে উচ্চশিক্ষার ৬৫%’ই আজ বেসরকারি। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশ্বের গড় বেসরকারিকরণ যেখানে ১৪%, ভারতে সেখানে ২৫%। আর তাই ভারতবর্ষের ৬৫% বাবা-মা সঞ্চয়ের অর্ধেক সন্তানের শিক্ষা বা কেরিয়ারের পিছনে ব্যয় করতে বাধ্য হন।
আরে মশাই, নেপথ্যের রাজনীতিটা বুঝুন। দেশে স্বল্প খরচায়, জাত-ধর্মের তোয়াক্কা না করে, প্রান্তিক গরীব ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা এবং যুক্তিবাদী মননের বিকাশের সুযোগ যদি JNU-র মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি আপনাকে দেয়; তাহলে আপনাকে কি পাগলা কুত্তা কামড়েছে যে আপনি আপনার ছেলেমেয়ে কে জিও ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি করবেন? আর জিও ইউনিভার্সিটির ব্যবসার লাভ না হলে কি আম্বানির পেট খারাপ হয়েছে যে বিজেপির পার্টি ফান্ডে পয়সা ঢালবে? তাই জমিদাররা শিক্ষা কে বাজারের পণ্য করতে পণ করেছে। স্বল্প খরচার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে দুর্বল করতে শকুনের নজর পড়েছে। জিও ইউনিভার্সিটির শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়ে আম্বানিদের খুশি করতে সস্তায় কিছু লেঠেল পুষেছে। আর ভালোবেসে জমিদাররা সেই লেঠেলদের এবিভিপি নাম রেখেছে। তবে কি জানেন? ঐ ফ্যাসিস্ট লেঠেলদের শায়েস্তা করতে টাইগার স্তালিন আজও ঐশীদের ভিতরে জিন্দা আছে।
Facebook Comments