বৈজ্ঞানিক চেতনা, যুক্তিবাদী মনন, বস্তুবাদী উপলব্ধি | The Background

Saturday, October 24, 2020

Contact Us

Google Play

বৈজ্ঞানিক চেতনা, যুক্তিবাদী মনন, বস্তুবাদী উপলব্ধি

সুশোভন পাত্র

বেসিক্যালি বিষয়টা আপনার গা সওয়া হয়ে গেছে। আপনি সকালে ব্রাউন ব্রেডে লো-কোলেস্ট্ররেল পিনাট বাটার লেপতে লেপতে পেপার উল্টে দেখবেন দিলীপ ঘোষ বলেছেন “গরুর দুধে সোনা থাকে। তাই দুধের রং হলুদ হয়। দেশি গরুর কুঁজের মধ্যে স্বর্ণনাড়ি থাকে। সূর্যের আলো পড়লে, সেখান থেকে সোনা তৈরি হয়।” আপনি পড়ি মরি করে বাস ধরে কনুইয়ের গুঁতো খেতে খেতে কলেজ যাওয়ার পথে ফেসবুকে পড়বেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী ত্রিভেন্দ্র সিং রাওয়াত বলেছেন “গরু একমাত্র প্রাণী যে পরিবেশে অক্সিজেন দেয়।” আপনি সারাদিন অফিসে বসের মুখ ঝামা খেয়ে চায়ে ডোবান বিস্কুটের মত নেতিয়ে বাড়ি ফেরার সময় জানবেন উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী বলেছেন “ইন্দ্রদেব কে তুষ্ট করতে যজ্ঞ করলেই দিল্লির বায়ুদূষণ কমে যাবে।” সন্ধেবেলা পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে আপনি সবজান্তা চাটুজ্জেদার মুখে শুনবেন মধ্যপ্রদেশের বিরোধী দলনেতা বলেছেন “অঙ্গনওয়াড়ি স্কুলের বাচ্চাদের খাবারে ডিম দিলে তারা বড় হয়ে নরখাদক হয়ে উঠবে।”

আগে আপনি বিরক্ত হতেন। ছিঃ ছিঃ করতেন। রেগে দুটো খিস্তিও দিতেন। এখন আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় চারটে মিম শেয়ার করেন। ফেসবুকে জম্পেশ কটা টু-লাইনার পোস্ট করে খিল্লি করেন। হোয়াটস-অ্যাপে তিন মিনিটের ভিডিও ফরোয়ার্ড করেন। তারপর বালিশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন। বেসিক্যালি বিষয়টা আপনার গা সওয়া হয়ে গেছে। আপনার মনে হতে শুরু করেছে, ৩৭% ভোটে পেয়ে জিতেছে যখন তখন গোটা দেশটাই তো ওঁদের বাপের সম্পত্তি। এরা সকাল-বিকেল আমাদের এতদিনের বৈজ্ঞানিক চেতনার প্যান্টুল টেনে দিয়ে চলে যাবে। সুযোগ পেলেই আমাদের যুক্তিবাদী মননের বগলে চুলকে দেবে। থেকে থেকে আমাদের বস্তুবাদী উপলব্ধির পাছায় বিছুটি ঘষবে। আর আমরা দাঁত কেলিয়ে হাসব। কারণ ভোটে জিতে বলছে তো, বলা যায় না, গরুর দুধে ২-৪ ভরি সোনা বেরোলেও বেরোতে পারে।

আর এক আধবার গরুর দুধ দুয়ে সোনা আছে কিনা পরীক্ষা করে নিতে ক্ষতি তো কিছু নেই! আমরা তো ছোটবেলা থেকেই কালো বেড়াল রাস্তা কাটলে সেই রাস্তা বদলে অন্য রাস্তা ধরে আপোষ করে গন্তব্যে পৌঁছতে শিখেছি। দিনের পর দিন বাচ্চাদের ‘বুরি নজর’ থেকে বাঁচাতে কপালে-গালে যত্ন করে কাজলের কালো টিপ পরিয়েছি। সূর্যগ্রহণের সময় বাইরে বেরোলে শরীরে অশুভ শক্তি ভর করে -আমরা বিশ্বাস করেছি। ঘরের সামনে লেবু লঙ্কা ঝুলিয়ে সংসার কে অবশ্যম্ভাবী বিপদ থেকে আমরা বীরের মত রক্ষা করেছি। আমি শুনেছি, সন্ধ্যে বেলা নখ কাটা যায় না, রাতের বেলা উঠোনে ঝাঁট দেওয়া যায় না, শনিবারে সেলুন যাওয়া যায় না, জন্মদিনে পোড়া খাওয়া যায় না। আমি ভ্যান হিউসেনের শার্টের নিচে বিপদতারিনীর লাল সুতো সযত্নে লালন পালন করেছি, বাস্তু পছন্দ হয়নি বলে ফেভারিট ওপেন টেরেসের ফ্ল্যাট এক লহমায় রিজেক্ট করেছি, পরীক্ষায় পাশ করতে আঙ্গুলে লাল-নীল পাথর পরেছি,  দিনটা কেমন কাটবে জানতে আনন্দবাজার খুলে ‘আজকের রাশিফল’ দেখেছি।

এই তো কদিন আগেও আপনি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেও শবরীমালা ইস্যুতে মনে মনে বলেছেন “এতো দিনের ট্র্যাডিশন, না ভাঙলেই তো পারে।” মনে পড়ে বছর তিনেক আগে গুজরাটের উনাতে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের হাতে নিচু জাতের দলিতদের প্রকাশ্য রাস্তায় মার খেতে দেখে আপনি বলেছিলেন “বড়ে বড়ে দেশো মে আইসি ছোটি ছোটি বাতেন হতি রহতি হ্যা স্যানোরিটা”। এই তো সেদিন আপনি আম্বেদকারের ‘অ্যানাইহিলেশন অফ কাস্টের’ আদর্শে দীক্ষিত দলিত ছাত্র রোহিত ভামুলার আত্মহত্যার ঘটনা কে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে হজম করে নিয়েছিলেন। কু-সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্রুসেডর, দাভোলকার কিম্বা কালবুর্গি’দের রক্তে ভারতবর্ষের মাটি ভিজলে, আপনি নিশ্চিন্ত, নিরুদ্বেগ থেকেছিলেন। আসলে প্রতিদিন আপনি একটু একটু করে নিজের বৈজ্ঞানিক চেতনা, যুক্তিবাদী মনন, বস্তুবাদী উপলব্ধির গলা টিপে খুন করেছেন। প্রচলিত কুসংস্কার কে ‘সামাজিক প্রথা’ বলে গ্লোরিফাই করেছেন। কেউ প্রশ্ন করলে তাকে ‘আঁতেল’ বলে হ্যাঁটা করেছেন। আদতে আপনি আজকের দিলীপ ঘোষদের রাস্তা সযত্নে প্রশস্ত করেছেন।

মার্কেটে দিলীপ ঘোষরা ছিলই। গত পাঁচ বছরে পার্থক্য একটাই, বিজেপি ধরে ধরে ঐ দিলীপ ঘোষদের নেতা বানিয়েছে। নীতি নির্ধারণ করার ক্ষমতা দিয়েছে। এখন বাঁদর কে মাধুরী দীক্ষিত ভেবে মাচায় চাপালে, বাঁদর নাচই তো নাচবে, ডিস্কো ড্যান্স তো আর করবে না। তাই আমাদের নির্বাচিত ১৭তম পার্লামেন্ট ‘জয় শ্রী রাম, আল্লাহ-হু-আকবর, জয় মা কালীর’ নামে গগনভেদী চিৎকারে শপথ নিয়েছে। আমাদের নির্বাচিত হরিয়ানার বিধানসভায় ন্যাংটো সাধু ৪০ মিনিট বক্তৃতা করেছে। নির্বাচিত সাংসদ আশারাম বাপুদের কোলে চেপেছ, রাম রহিমদের মাথায় তুলেছে। আর এবার আপনার ছেলে মেয়ের স্কুলের সিলেবাসে বিজ্ঞান বদলে ‘মিথ’ হয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসের নামে পৌরাণিক কাহিনী পড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তর্কপ্রিয় ভারতীয়দের আনুগত্যের পাঠ শেখানো হচ্ছে। কৌতূহলী মনন কে ভক্তিতে বদলে দেওয়ার নিরলস চেষ্টা চলছে।

চেষ্টা চলছে কারণ বৈজ্ঞানিক চেতনা, যুক্তিবাদী মনন, বস্তুবাদী উপলব্ধি হিন্দুরাষ্ট্র গঠনে সবচেয়ে বড় বাধা। যখনই আপনি, আমি, আমরা -আমাদের এই প্রতিদিনের সমাজ কে, সমাজে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব গুলোকে বৈজ্ঞানিক চেতনা, যুক্তিবাদী মনন আর বস্তুবাদী উপলব্ধির ফর্মুলা তে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব, তখনই আপনার মনে হবে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কোন হরিদাস পাল নিয়ম করে দিয়েছে যে মেয়েরা ঘরে থাকবে, সন্তান প্রতিপালন করবে, সংসার চালাবে আর ছেলেরা বাইরে যাবে, কাজ করবে? তখনই আপনার মনে হবে আমি ঘোমটা দেব না বোরখা পরব, তিলক কাটবো না দাড়ি রাখবো তুমি ঠিক করে দেবার কে? তখনই আপনি আর কাউকে ঢপ দিতে পারবেন না যে তুমি নিচু জাতে জন্মেছ কারণ তুমি পাপ করেছো; গরীব হয়ে জন্মেছ কারণ তুমি পূর্বজন্মে খারাপ কাজ করেছো। তখন আর যুদ্ধ জিগিরে নির্বাচনী জয়ের ব্লু-প্রিন্ট লেখা যাবে না। ধর্মের নামে রাজনীতির ব্যবসা করা যাবে না। মুসলমানদের ‘দুধেল গরু’ কিম্বা গরুর নামে মানুষ খুন করে দাদা-দিদিদের ভোট ভোট খেলা যাবে না। কৃষকের ফসলের দাম, শ্রমিক-বেকারের কান্না-রক্ত-ঘাম; এতদিনের বঞ্চনার হিসেব চাইলে দিলীপ ঘোষের মত সঙ্ঘ পরিবারের দালালদের আর হিন্দুরাষ্ট্র গড়া হবে না।

 

Facebook Comments