“ফাতেহা ইয়াজ দাহাম”প্রসঙ্গে কিছু কথা | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

“ফাতেহা ইয়াজ দাহাম”প্রসঙ্গে কিছু কথা

আতিউর  রহমান

আজ “ফাতেহা ইয়াজ দাহাম”৷ হাই স্কুলে পড়ার কালে ধারণা ছিল প্রথমটি মুহাম্মদ (স) এর জন্মদিন ও দ্বিতীয়টি মৃত্যুদিন৷ ধর্মপ্রাণ শিক্ষক বাবা সেদিন প্রাথমিক ভুলটা ভাঙিয়েছিলেন৷ “ফাতেহা দোয়াজ দাহাম”একই সাথে মুহাম্মদ(সঃ) এর জন্ম ও মৃত্যুদিন৷ আর “ফাতেহা ইয়াজ দাহাম” ব্যাপারটা ভিন্ন৷ “ফাতেহা” আরবি শব্দের অর্থ দোয়া, প্রার্থনা বা মোনাজাত করা বা কারো ওপর নিজের পুণ্য কাজের ফল সমর্পন করা৷ আর “ইয়াজ দাহাম” ফারসি শব্দের অর্থ একাদশ বা এগারো৷  তাহলে “ফাতেহা ইয়াজ দাহামের” সমষ্টিগত অর্থ হয় এগারোর প্রার্থনা বা দোয়া৷  আর এই এগারো হল আরবি মাস “রবিউস সানী”র এগারো তারিখ৷ যেদিন আব্দুল কাদের জিলানী( রহঃ) এর মৃত্যুদিন৷ যদিও এই মৃত্যু দিন নিয়ে ঐতিহাসিকেরা একমত নন৷ আমাদের দেশে অবশ্য এ দিনটিতেই “ফাতেহা ইয়াজ দাহাম” পালিত হয় ৷

মুসলমান সমাজের একটা বৃহত্তর অংশের মানুষ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) সম্পর্কে খুব বেশি খোঁজ রাখেন না৷ অন্য ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের না জানাটাই  স্বাভাবিক৷ ইরানের জিলান নামক স্থানে ৪৭১ হিজরির ১লা রমজান (১০৭৫ খ্রীস্টাব্দ) আব্দুল কাদের জন্মগ্রহণ করেন। জিলানের অধিবাসী তাই জিলানী৷ হযরত মহম্মদ(সঃ)জন্মের প্রায় ৫০০ বছর পর৷ যখন ইসলাম আবার ক্ষয়িষ্ণুতা ও অবক্ষয়ের পথে চলছিল ঠিক তখনই তাঁর আবির্ভাব৷  আব্দুল কাদের জিলানী ছিলেন আধ্যাত্মিকতায় খুব উঁচুদরের ব্যক্তিত্ব৷ ইতিহাস বলে যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, তপস্বী, বহু গ্রন্থ প্রণেতা, ধর্ম প্রচারক ও সর্বোপরি মানবপ্রেমিক।  কাব্য, সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ের সুপন্ডিত ছিলেন তিনি। তাঁর “গুনিয়াতুত ত্বালিবীন”,”ফতহুল রব্বানী” খুব বিখ্যাত গ্রন্থ৷ মানুষকে আকর্ষণ করার অদ্ভূত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি৷ তাঁর প্রচেষ্টায়  ইসলাম আবার বিশ্বে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে৷ ইসলাম জানা মানুষেরা  আব্দুল কাদের জিলানী সম্পর্কে নিশ্চয় জানবেন যে মহম্মদ(সঃ)এর সহযোগী বা সঙ্গী(সাহাবা) ছাড়া আর যে সকল ইসলামী মনীষী (ওলি / আউলিয়া) দুনিয়াতে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদার দাবীদার আব্দুল কাদের জিলানী( রহঃ)৷  সেজন্য তাঁকে “বড়ো পীর” বলা হয়৷ তিনি আরও বহু উপাধির অধিকারী ছিলেন৷ ৫৬১ হিজরি সনে (১১৬৬খ্রীঃ)  তিনি প্রয়াত হন৷ ইরাকের বাগদাদে তাঁর কবর  আছে৷ গতানুগতিক  পালিত হওয়া আড়ম্বরপূর্ণ  জন্ম -মৃত্যু দিবসের  লোকাচার ইসলামে বৈধ নয়৷ এছাড়া, মৃত ব্যক্তির কবরকে কেন্দ্র করে যে নোংরামি আমাদের দেশের মুসলমানদের একটা অংশ করে থাকেন  তা ইসলামে চরম অন্যায় বলে বিবেচিত৷ যেমন ধরুন, যাকে তাকে পীর ভাবা, মাজারে চাদর চাপানো, কবরে সেজদা করা, আল্লাহ ও রসুলের চেয়ে  পীর কে অধিক গুরুত্ব দেওয়া৷ এগুলো অবশ্যই কুসংস্কার৷ ইসলামে সবার উপরে স্রষ্টা, তারপর রসুল(সঃ)৷ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)কে স্মরণ করতে চাইলে তাঁর জীবন ও আদর্শের পর্যালোচনা করে আলোকময় দিকগুলিকে নিজের জীবনে গ্রহণ করাই সবচেয়ে উত্তম হবে৷ সেই সঙ্গে তাঁর জন্য পরমেশ্বরের নিকট  মঙ্গলময় প্রার্থনা করা ভালো৷

ইসলামে আব্দুল কাদের জিলানীর মত বা প্রায় সমগোত্রীয় যে সব মনীষী জগতে এসেছিলেন বা বর্তমানে আছেন তাঁরা মানব প্রেম, অহিংসা, আত্মত্যাগ, সততা, সত্যতার জন্য লড়াই করেছেন বা করে চলেছেন৷ আমাদের দেশেও এমন মানুষ ছিলেন, আজও আছেন ৷ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, খাজা মইনুদ্দিন চিশতি, বাংলার ফুরফুরার দাদা হুজুর পীর আবু বক্কর সিদ্দিকী, মুহম্মদ তাহির প্রমুখ৷ অন্ধের হাতি দেখার মত যাঁরা ইসলাম জেনেছেন তাঁরাই ধর্ম সংকটের স্রষ্টা৷

“ফাতেহা ইয়াজ দাহাম” প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলতে হয় একদিকে রাজনৈতিক ধর্মহীনতা, অন্যদিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার শেষ করে দিল দেশটাকে! বহু  ধর্মের দেশ আমার ভারতবর্ষ৷ বৈচিত্রের মধ্য ঐক্যই আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব৷ কিন্তু আজ মূল সংকট  সেই ধর্ম, তাও আবার হিন্দু আর মুসলমান এই দুই ধর্ম  সম্প্রদায়ের মধ্যে৷ বহু প্রাচীন এ সমস্যা আজ ভংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি৷ কিন্তু এটা তো হবার কথা ছিল না! ১৪-১৫ শতাংশ মুসলমান যেন এ দেশের সব সর্বনাশের মূলে! একটা বৃহত্তর অংশের ধ্বজাধারীরা মনে করছেন৷ সত্যিই কি তাই ? একদমই না৷ এই প্রচারকে কেন্দ্র করে এক শক্তি টিকে থাকতে চাইছে ! গত নির্বাচনেও এ নোংরামির চরম শিকার হয়েছে৷ খুব ছোট বেলা থেকে যাঁদের সঙ্গে এঁটো জিনিস কাড়া কাড়ি করে খেয়ে বড়ো হয়েছি, তাদের সাথে রাজনীতির কথা বলতে গেলে ভয় করেছে, আজও করছে! এতটা অবিশ্বাস, এতটা বিষাক্ত ভয়ংকর পরিস্থিতি কেন? কোন ধর্ম বা প্রকৃত ধার্মিক এর চর্চায় ব্যস্ত? আমি মনে করিনা৷ ছোট থেকেই ধার্মিক বাবা বলতেন, যে অন্যের ধর্মকে ঘৃনা করে সে নিজের ধর্মকে ভালোবাসে না৷ পবিত্র কোরাণে আছে- “লাকুম দ্বীনিকুম ওয়া লিয়্যা দ্বীন”৷ (সুরা-আল কাফেরুন)৷ অর্থাৎ তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার৷ আবার ইসলাম এও বলছে, ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না৷

দেশের সকল ধর্মের পথভ্রষ্টরা সঠিক পথের নিশানা খুঁজে পেলে, এই দেশের রাজনীতি থেকে ধর্ম ব্যবসা নিপাত গেলে তবেই আজকে ফাতেহা ইয়াজ দাহাম পালন সার্থক হবে।

উপরের চিত্রঃ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-র সমাধি, বাগদাদ।

 

 

Facebook Comments