রুপোলি পর্দায় কাশ্মীরনামা | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

রুপোলি পর্দায় কাশ্মীরনামা

ওহিদ রেহমান

প্রখ্যাত উর্দূ সাহিত্যিক আমীর খসরু বলেছেন, পৃথিবীতে স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে, সেটা তবে কাশ্মীর..কাশ্মীর এবং কাশ্মীর। হ্যাঁ, ভূস্বর্গ কাশ্মীরের নান্দনিক আবেদন এমনই। তবে, একথাও সত্যি যে, কাশ্মীর যত সুন্দর, এর রাজনৈতিক সমীকরণ ততটাই জটিল। কলমের ডগায় কাশ্মীরের রূপ লাবণ্যের দ্যুতি যতটা খোলতাই, কাশ্মীরের জনজীবনের সমস্যা, সম্ভবনা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তি নিয়ে এলিট সমাজের একটি বৃহৎ অংশ ততটাই আড়ষ্ট। কিন্তু, তাতে কাশ্মীরের ‘কাশ্মীরিয়াৎ’ বিন্দু পরিমাণ বিবর্ণ হয়না। আসুন, রুপালী পর্দার ফিতেয় ভর করে ডুব দিয়ে আসি রঙিন কাশ্মীরের সাদা কালো সংসারে।

হামিদ (২০১৮)

মুহাম্মদ আমিন ভাটের ‘ফোন নং ৭৮৬’ নাটকের উপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘হামিদ’ চলচ্চিত্রটি, ইরানী শিশুতোষ চলচ্চিত্রের স্মৃতি উসকে দেবে চলচ্চিত্র প্রেমীদের। পরিচালক আইজাজ খানের ‘হামিদ’ আসলে রাজনৈতিক জটিল আবর্তের উর্ধ্বে মানবতার জয়গান। ছবির গল্পে আমরা দেখি, আট বছর বয়সী হামিদের (তালহা আরশাদ রেশি) বাবা একজন নৌকা মিস্ত্রি। যিনি উপত্যকার রাজনৈতিক আঁচে আর পাঁচজন সাধারণ কাশ্মীরির মতো একদিন গুম হয়ে যান। সেই কঠিন সময়ে তাঁর মা ইশরাত (রসিকা দুগল) স্বামীকে ফিরে পাওয়ার অসম লড়াইয়ে নামেন। পিতা মাতার স্নেহ বঞ্চিত হামিদ হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ। তাকে বলা হয় যে, তাঁর বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। শিশু হামিদ কোনক্রমে জানতে পারে যে, আল্লাহর ফোন নম্বর ৭৮৬। সে সেই নম্বরে বারংবার ফোন কল করার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রারম্ভিক পর্যায়ে তাঁর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু, একদিন তাঁর সেই ফোন কলে সাড়া দেন একজন সিআরপিএফ জওয়ান অভয় (বিকাশ কুমার)। সদ্য নিখোঁজ পিতার সন্ধানে সন্তান এবং কর্মসূত্রে সন্তানের থেকে দূরে থাকা সিআরপিএফ জওয়ান অভয়ের মনোবেদনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পর্দায়। এখানেই রাজনীতির জটিল সমীকরণ হেরে যায় পারিবারিক বন্ধন, অপত্য, স্নেহ, মমতার কাছে।

ভ্যালি অফ সেন্টস্ (২০১২)

‘যদি পৃথিবীর কোনো স্থান স্বর্গের দাবি করতে পারে, তবে সেটি কাশ্মীর এবং যদি এমন কোনো স্থান থাকে যা মানবতার সব অন্ধকার পরিণতির প্রতীক হয়, তাহলে সেটিও কাশ্মীর। কাশ্মীর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এমনতর শব্দবন্ধের অবতারণা করেন বিশিষ্ট আমেরিকান চলচ্চিত্র সমালোচক রজার ইবার্ট। পরিচালক মুসা সাইদের প্রথম ছবি ‘ভ্যালি অব সেন্টস্’ আসলেই যেন ১ ঘন্টা ২০ মিনিটের এক গীতি আলেখ্য। ছবিতে উপত্যকার রাজনৈতিক উত্তাপের থেকে বেশি উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করা হয়েছে উপত্যকার পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে। তবে, অনেক সমালোচকদের কাছে ছবিটির সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী অংশটি হল বিরল ধরনের বন্ধুত্বের চিত্র, যা প্রেমের অর্থকে অতিক্রম করেছে। ছবির শুরুতে আমরা দেখি, কাশ্মীরি যুবক গুলজার (গুলজার আহমদ ভাট) এবং আফজাল (মুহাম্মদ আফজল সোফি) উপত্যকার রাজনৈতিক অস্থিরতার দরুন ডাল লেকে নৌকা চালানো বন্ধ করে পালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু, তারা ব্যর্থ হয়। সেইসময় তাঁদের সাথে পরিচয় হয় পরিবেশ বিজ্ঞানী আসিফার (নিলোফার হামিদ)। গুলজার তাকে তাঁর গবেষণার কাজে সহায়তা করে। ডাল লেক সন্নিহিত অঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র উঠে আসে আসিফার গবেষণায়। গুলজার উপলদ্ধি করে, আসলে শুধু পরিবেশ নয়, ঠুনকো রাজনৈতিক স্বার্থে সমগ্র উপত্যকার জনজীবন আজ হুমকির সম্মুখীন।

হারুদ (২০১০)

কাশ্মীরের জটিল রাজনৈতিক আর্বতের রুপোলি পর্দার রূপক স্ক্রীন প্লে ‘হারুদ’, যার অর্থ শরৎকাল। পরিচালক আমির বাশির স্বীয় নিপুনতায়, উপত্যকার গড় কাশ্মীরি জনজীবনের গল্প তুলে ধরেছেন ১ ঘন্টা ৩৬ মিনিটের এই ছবিতে। গল্পটি কাশ্মীরের বাসিন্দা রফিক (শাহনওয়াজ ভাট) কে নিয়ে যিনি পাকিস্তানে পালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেন। তারপর উপত্যকার অস্থিরতার আঁচ ছুঁয়ে যায় তাঁদের পরিবারকে। তাঁদের পরিবারের বড় ছেলের অসহায় মৃত্যু দুমড়েমুচড়ে দেয় পুরো পরিবার পরিজনদের। উপত্যকার বুলেটের আতঙ্ক প্রতিটি মুহূর্তে ছুঁয়ে থাকে পরিবারটিকে। তারপর রফিকের হাতে উঠে আসে তাঁর ভাইয়ের ক্যামেরা। ধীরে ধীরে রফিক জীবনের দিকনির্দেশনা লাভ করে। অন্যদিকে, তাঁর বাবা (মুহাম্মদ আমির নাজি) রাজ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কারণে বারবার বিচলিত হয়ে পড়েন।’হারুদ’ কাশ্মীরের বিদ্রোহের ইতিহাসের ধারাবিবরণী নয়, এই ছবি উপত্যকার নিরীহ বাসিন্দাদের মনস্তত্ত্ব অন্বেষণ করার চেষ্টা করে। পরিচালক আমির বশির নিজে উপত্যকার সন্তান। ফলে, সাধারণ কাশ্মীরিদের বুকের রক্তক্ষরণ তাঁর চেনা। পুরো ছবি জুড়ে পিতার চরিত্রে ইরানিয়ান অভিনেতা মুহাম্মদ আমির নাজি অসাধারণ অভিনয় করেছেন।

ইয়াঁহান (২০০৫)

পরিচালক সুজিত সরকারের বলিউডে পা গলানোর প্রথম ছবি ‘ইয়াঁহান’। অস্থির উপত্যকার ভালোবাসার লাল গোলাপ এই ছবি। ‘ইয়াঁহান’ এর প্রতিপাদ্য কাশ্মীর এবং ভালোবাসা। এই দুটি বিষয়ই প্রতিটি ভারতীয়দের হৃদয়ের কাছাকাছি। ছবিতে ক্যাপ্টেন আমানের (জিমি শেরগিল) পোস্টিং হয় কাশ্মীরে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর মুখে প্রথম উচ্চারিত “ওয়াহ!”, আসলেই কাশ্মীরের আত্মধ্বনি। আবার দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সময়ে কাশ্মীরের অন্যতম প্রতিশব্দ রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে অস্থিরতা। ফলে, খুব সচেতনভাবেই, ক্যাপ্টেন আমান কাশ্মীরের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং প্রত্যাশা পূরণের ফেরিওয়ালা হতে চাই। অন্যদিকে মিনিশা লাম্বা অভিনীত চরিত্র আদা কাশ্মীরের নিরীহ সৌন্দর্যের প্রতিনিধিত্ব করে পুরো ছবি জুড়ে। ‘ইয়াঁহান’ বক্স অফিসে তেমন হৈচৈ সৃষ্টি করত না পারলেও, মুক্তির ১৬ বছর পরেও, ছবিটি এখনও তার বিশেষ পরিচয়ে টিকে আছে। একজন মুসলিম কাশ্মীরী কন্যার চূড়ান্ত ভালোবাসার আকুতি এই ছবি। গীতিকার গুলজারের লেখা এই ছবির গানগুলো প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমীকে ছুঁয়ে যায়।

ইনশাল্লাহ, ফুটবল (২০১০) 

আশ্বিন কুমার পরিচালিত ১ ঘন্টা ২০ মিনিটের ‘ইনশাল্লাহ, ফুটবল’ এক নতুন কাশ্মীরের কথা বলে। উগ্রপন্থী বাসিরের ছেলে বাসারাত ওরফে বাসাহ্ স্বপ্ন দেখে নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার হিসাবে। তাঁর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে কাশ্মীরে আসেন বিখ্যাত ফুটবল কোচ মার্কোস। ফুটবলের বিনিময় কার্যক্রমের আওতায়, দীর্ঘ টেনিং শেষে মার্কোস বাসাহ কে নির্বাচিত করে সেন্টোস এফসি ফুটবল ক্লাবের জন্য এবং তখনই বাসাহর সামনে আসে এক অদ্ভুত সমস্যা। বাসাহ বিদেশযাত্রার আবেদন খারিজ করা হয় তার বাবার উগ্রপন্থার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার দরুন। এই চলচ্চিত্রটি কাশ্মীর উপত্যকায় বিদ্রোহ ও জঙ্গিবাদের কারণে নাগরিকদের যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তা বের করার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়। ছবিটি পুসান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘ওয়াইড অ্যাঙ্গেল’ ডকুমেন্টারি বিভাগের অংশ হিসাবে সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়। ছবিটি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রদর্শিত এবং প্রশংসিত হয়। যদিও ছবির বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ার দরুন, দেশের সেন্সর বোর্ড ছবিটির প্রদর্শনের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

হাফ-উইডো (২০১৭)

কাশ্মীরি সিনেমা নির্মাতা পরিচালক দানিশ রেনজুর ‘হাফ-উইডো’ আসলে সদ্য বিবাহিত তরুনী নীলার (নিলোফার হামিদ) স্বামী খালেদকে খুঁজে ফেরার গল্প। যাকে বিয়ের কিছুদিন পর, রাতের খাবার টেবিল থেকে তুলে নিয়ে যায় ভারতীয় আর্মির পোশাক পরিহিত কয়েকজন। নীলা বিষয়টিকে আর পাঁচজন কাশ্মীরি মহিলার মতো নিয়তির লিখন ভেবে নিয়ে গুমরে মরতে চাইনা। তাই সে স্বামী ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নামে রাজপথে। আইনের শরনাপন্ন হয়। নিজ অধিকার আদায়ে প্রচার পত্র বিলি করে জনমত গড়ে তুলে। পরবর্তীতে তাঁর ভাই জাকিরকেও (শাহনাওয়াজ ভাট) একইভাবে গুম করা হয়। নীলা মরিয়া হয়ে রাতের অন্ধকারে জেলের অন্দরে প্রবেশ করে। একই ছাদের তলায় নীলা এবং জাকিরের বৌ জয়নব নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে থাকে। আসলে, তাদের দুইজনের জীবনের গল্প এক এবং অভিন্ন। এই ছবির প্রতিটি পর্বে ‘ট্রু কাশ্মীরিয়াৎ’ এর প্রাঞ্জল উপস্থিতির দেখা মেলে। বলিউডি রসদকে এই ছবিতে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ‘হাফ-উইডো’ আসলে উপত্যকার শত শত স্বামীহারা সন্তানহারা কাশ্মীরি নারীদের মর্মদন্ত শোকগাঁথা।

চলচ্চিত্র সমাজের দর্পণ। কখনো সেখানে ফুটে ওঠে ভালোবাসার লাল গোলাপ আবার কখনো শোষণ-বঞ্চনার বেআব্রু দাঁত নখ। যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ সময়ের স্রোতে বয়ে চলে নদীর মত। উপত্যকার মানুষ সেইভাবেই প্রতিদিন স্বপ্ন দেখে, পার্কে যায়, প্রাতঃভ্রমন করে, প্রাতঃরাশ করে, অফিস করে, হ্যাঁ আড়ালে আবডালে চুমু ও খায়। ঠিক সেইভাবেই ‘রিল’ এবং ‘রিয়ালের’ কাশ্মীরের নদী, পাহাড়, ঝর্ণা, সবুজ প্রান্তর তার একবুক কষ্ট নিয়ে প্রতিদিন জেগে ওঠে তাঁর এক ও অদ্বিতীয় কাশ্মীরিয়াৎ নিয়ে।

Facebook Comments