বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় বিনির্মাণে আহমদ ছফা | The Background

Monday, November 29, 2021

Contact Us

Google Play

Breaking News

বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় বিনির্মাণে আহমদ ছফা

হাসিবুর রহমান 

বহুমুখী প্রতিভার রূপদর্শী আহমদ ছফা পশ্চিম বাংলার মানুষের চোখে বিশেষ পরিচিত নন। শুধু আহমদ ছফা কেন সাহিত্য সমাজবিজ্ঞানের বহু ব্যক্তিত্বও এপার বাংলায় পরিচয় গড়ে তুলতে পারেননি। বাংলার সামাজিক ইতিহাস চর্চার পথিকৃৎ আবদুল করিম, মমতাজুর রহমান তরফদার, সিরাজুল ইসলামের মতন খ্যাতিমান ঐতিহাসিকদের নাম সাধারণ পাঠকরা জানেন না–এটা একটা বড় বিস্ময়!

একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, রাতারাতি দেশভাগ হলেও রাতারাতি বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি পাল্টে যায়নি। আবহমান কালের বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য চর্চা, জীবন চর্চা এক নিরবিচ্ছিন্ন ধারা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, দুই বাংলার অগণন সৃষ্টিশীল ঐক্যপ্রয়াসী বাঙালি কবি, চিন্তক, লেখকরা বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রবাহকে বাঁচিয়ে রেখেছেন যত্নে, সাধনায়। বিভাগোত্তর কালে  দুই বাংলায় সাহিত্য ও সমাজ বিজ্ঞানের আদান-প্রদান হয়নি তা নয়, যা হয়েছে তার বেশির ভাগই একাডেমিক প্রয়োজনে বা ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব আগ্রহে। এই পরিসরে দুই বাংলায় উদার ভাববিনিময়ের অবকাশকে সুকৌশলে অস্বীকৃত হয়েছে বলে মেনে নেওয়া উচিত।

***

আহমদ ছফা আধুনিক প্রজন্মের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, লেখক, কবি, গল্পকার, অনুবাদ শিল্পী, ইতিহাসবেত্তা, এছাড়াও নানা অভিধায় তাঁর পরিচয় আছে। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সমাজ বিজ্ঞানের জগতে ব্যতিক্রমী চিন্তা-চেতনার অগ্রণী। তাঁর স্বল্পকালীন জীবনবৃত্তে রচিত গল্প, উপন্যাস, কবিতা, সমালোচনা মূলক গদ্য পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং পুনর্মূল্যায়ন করার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে। বহুমুখী বিষয়ভিত্তিক তিনি চল্লিশটিরও বেশি গ্রন্থের রচয়িতা। এর মধ্যে দুই একটি রচনা কালজয়ী, অসামান্য কয়েকটি সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের মন, সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক বাংলায় বাঙালি মধ্যবিত্তের উদ্ভব, হারানো লেখা, শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যদ্যপি আমার গুরু প্রমুখ।

আহমদ ছফা ১৯৪৩ সালের ৩০শে জুন অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানার গাছবাড়িয়া গ্রামে এক মুসলমান দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হেদায়েত আলি, মা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান। ম্যাট্রিকুলেশন পড়ার সময়ে তিনি স্কুলে ছাত্র অবস্থায় কৃষক সমিতি ,কমিউনিস্ট পার্টির কাজের সঙ্গে যুক্ত হন, পরিণত বয়সে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও একজন সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মানসিক গঠনে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন, স্বাধীন বাংলাদেশে নবগঠিত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত স্বার্থপর শ্রেণীর স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা, লুটতরাজকে তীব্র কষাঘাত করেছেন, জাতীয় স্বার্থে অবহেলিত দরিদ্র শ্রেণীর উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপোষহীনভাবে আজীবন সংগ্রাম করেছেন।

আহমদ ছফার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াও তাঁর ব্যক্তি জীবনের মতো অগোছালো।

প্রাথমিকে ছাত্র অবস্থায় রামচন্দ্রকে নিয়ে  তাঁর লেখালেখির শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা অনার্সে ভর্তি হয়ে লেখাপড়ার সম্পূর্ণ করেননি। পরে ১৯৬৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক হন, অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তি হন। স্নাতকোত্তর বিভাগের পড়াশোনার সময় ড: আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় ‘রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতির সাধনা’ নামে তাঁর একটি প্রবন্ধ  এই সংকলন গ্রন্থে  স্থান লাভ করে। এই সময় মাত্র বাইশ বছর বয়সী ছফা সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস লিখে তাঁর ব্যতিক্রমী গবেষণাধর্মী কর্মের পরিচয় দেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁর গ্রন্থের ভূমিকা লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন– তাঁর ইতিহাস চেতনা এতটাই সম্পৃক্ত  ছিল যে বাংলা ভাষায় সিপাহী যুদ্ধের নিরিখে এমন শক্তিশালী লেখা পূর্বে লেখা হয়নি তো বটেই, তাঁর চিন্তাচেতনার ধারের কাছেও কোন বাঙালির ঐতিহাসিক এমন মৌলিক ভাবনার গবেষণা কল্পনাও করতে পারেননি।

অতঃপর আহমদ ছফা দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রপত্রিকায় দুই হাতে লিখে গেছেন আমৃত্যু। ১৯৭০সালে এম.এ.পরীক্ষা দিয়ে ফল প্রকাশের আগেই তিনি বাংলা একাডেমীর পিএইচডি গবেষণার বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহকে ইতিহাসের নৈব্যক্তিক বিশ্লেষণ করে দেশবাসীকে চমৎকৃত করেন। উল্লেখ্য, তাঁর পূর্বে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবিস্তার বিশ্লেষণ কেউ করেননি। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে আহমদ ছফা ছিলেন ওপার বাংলার অন্যতম সেরা লেখক, চিন্তাবিদদের একজন। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ ইতিহাস ভ্রমণকাহিনী অনুবাদসহ সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। সব্যসাচী বিরলপ্রজ আহমদ ছফা ছিলেন একাধারে দার্শনিক এবং মানবতাবাদী। প্রচারবিমুখ লেখক কখনও নাম-যশ পুরস্কারের তোয়াক্কা করেননি। সাহিত্যের জন্য তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

***

আহমদ ছফা যৌবন বয়সে লিখেছিলেন ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের হাজার বছরের বিবর্তন বিশ্লেষণপূর্বক তাদের পশ্চাদগামিতার কারণ অনুসন্ধান করেছেন। এই গ্রন্থে তাঁর নির্মোহ বিশ্লেষণ পূর্ব বাংলার মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের নিরবিচ্ছিন্ন এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

গ্রন্থের-এর মূল বিষয়বস্তু হল বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত স্বরূপ অন্বেষণ। বাঙালি মুসলমান আসলে কারা, আর তাদের মনের রূপায়ন কোন কোন সমাজ-সাংস্কৃতিক অভিঘাতে গড়ে উঠেছে, সেক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান একত্রে বাঙালি আর মুসলমান হওয়ার জন্যে যে সংকট অনুভব করে ঐতিহাসিক পটভূমিকায় এর একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক রূপান্তর ছফা আলোচনা করেছেন।

মুসলিম বিজয়ের সময়ে এদেশের বড় সংখ্যার একটি বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের অন্ত্যজ  জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। শত বছরের ইতিহাসে রক্তে এসেছে স্রোত। এক রক্ত আরেক রক্তের সাথে মিশে সৃষ্টি করেছে নতুন জনগোষ্ঠী।রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুদের সংঘাতের সৃষ্টি ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনে সামাজিক পরিবর্তন ও নবতর মূল্যচেতনায় সমাজের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সংস্কৃতিগত বিভেদ তৈরি না হলেও মুসলমানরা নিজেদের সংস্কৃতিকে নিজেদের মত করে রূপান্তরিত করেছিলেন। সুদূর অতীতকাল থেকে এই জাতি গোষ্ঠী  ধর্ম পরিবর্তন করলেও তাদের বিশ্বাস এবং মানসিকতার মৌলবস্তুর পরিবর্তন ঘটেনি। আজ অবধি বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারার মূল কাঠামোটি রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। ব্রিটিশ শাসনে বাঙালি হিন্দুর মধ্যে একটা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণী গড়ে ওঠে, মুসলমানরা ঔপনিবেশিক শিক্ষা গ্রহণে  মানসিকভাবে প্রস্তুতি ছিলেন না- এই আপত্তির অনিবার্য কারণে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে আর্থসামাজিক বিভেদের রূপটি প্রকট হয়ে ওঠে। আহমদ ছফা অবশ্য বাঙালি হিন্দুর থেকে মুসলমানের পিছিয়ে পড়ার এটাই একমাত্র কারণ বলে মানতে পারেননি। এর নেপথ্যে ছিল প্রচ্ছন্ন সাংস্কৃতিক বৈষম্য যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমশ দূরত্ব তৈরি করতে সহায়ক হয়েছে। তিনি বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক চেতনাহীনতা ও নৈতিক মূল্যবোধ হীনতার সন্ধান করেছেন।

তিনি এক স্থানে লিখেছেন ,”যে জাতি উন্নত বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না, অথবা সেগুলোকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না, তাকে দিয়ে উন্নত রাষ্ট্র্র সৃষ্টিও সম্ভব নয়। যে নিজের বিষয় নিজে চিন্তা করতে জানে না, নিজের ভালোমন্দ নিরূপণ করতে অক্ষম, অপরের পরামর্শ এবং শোনা কথায় যার সমস্ত কাজ-কারবার চলে, তাকে খোলা থেকে আগুনে কিংবা আগুন থেকে খোলায়, এইভাবে পর্যায়ক্রমে লাফ দিতেই হয়। ”

আসলে আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমান সমাজের রোগ ধরতে পেরেছিলেন। বাঙালি মুসলমানের কর্মকান্ডকে তিনি ‘অকেশনাল’ বলে উল্লেখ করেছেন। বাঙালি মুসলমান না বাঙালি, না মুসলমান। এই প্রসঙ্গ টানতে তিনি বাঙালি মুসলমানের মন প্রবন্ধে প্রাচীন পুঁথিসাহিত্য ও উপন্যাসে হিন্দু সাহিত্যিকদের মুসলমানদের বীরত্ব প্রকাশে মতো কাল্পনিক গায়েবি ক্ষমতা এবং চরিত্র টেনে আনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেছিলেন, ঐতিহাসিক চরিত্রসমূহ দিয়ে স্বদেশীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর জোরারোপ করে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য হিন্দুরা যে সমস্ত বিষয় নিয়ে গর্ববোধ করত, সেই সমস্ত বিষয়ে মুসলিম লেখকেরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ করে চিত্রায়িত করেছেন। যেমন আহমদ ছফা বলেছেন, ‘হিন্দু সমাজের বীরেরা যদি পাতাল বিজয় করে বহাল তবিয়তে ফিরে আসতে পারেন, আমির হামজা দৈত্যের দেশে গমন করে তাদের শায়েস্তা করে আসতে পারেবেন না কেন ইত্যাদি।

পুঁথি সাহিত্য ধর্মীয় কাহিনীতে ভাস্বর। এক্ষেত্রে এ ধর্মীয় কাহিনীগুলোর চরিত্রগুলো অলৌকিক মহিমায় উজ্জ্বল।  মানুষের বিশ্বাসের জগতে এই অলৌকিক বর্ণনা কোন মানুষের যৌক্তিক ব্যাখ্যার দ্বার খুলতে পারে না, এ বিষয়গুলো সর্বদা সাধারণের মনে প্রশ্ন হিসেবে বিরাজ করেছে। ছফা দেখিয়েছেন, মধ্যযুগে সৃষ্ট এই সাহিত্যকর্মগুলোর নতুন সামাজিক চাহিদার দরুন তৈরি হয়েছিল এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুরা অধিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ নির্মাণ করেছিল।

বাঙালি মুসলমানরা শুরু থেকেই তাদের আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দুর্দশার হাত  থেকে আত্মরক্ষার তাগিদেই ক্রমাগত ধর্ম পরিবর্তন করে। মুসলমান শাসন আমলে প্রভুত্ব অর্জনের উন্মেষ হলেও তাদের জাগতিক দুর্দশার অবসান ঘটেনি। যেহেতু মৌলিক উংপাদন পদ্ধতির মধ্যে কোন পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেনি, তাই রাজশক্তিকেও পুরনো সমাজ সংগঠনকে মেনে নিতে হয়েছে। সেজন্যই মুসলিম শাসনামলেও বাঙালি মুসলমানেরা রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিগৃহীত ছিলেন। ইংরেজ আমলে উঁচু শ্রেণীর মুসলমানরা সম্পূর্ণভাবে সামাজিক নেতৃত্বের আসন থেকে বিতাড়িত হলে উঁচুবর্ণের হিন্দুরা স্বাভাবিকভাবেই সে আসন পূরণ করে। বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের লোক। তাদের মানসিকতার মধ্যেও আদিম সমাজের চিন্তন পদ্ধতির লক্ষণসমূহ সুপ্রকট। ছফা বলেছেন, বাঙালি মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতে জানেনা, বাঙালি মুসলমানের সামাজিক সৃষ্টি সাংস্কৃতিক সৃষ্টি দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিসমূহের প্রতি চোখ বোলালেই তা পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

তবুও বাংলার মুসলমান তাদের জীবন জিজ্ঞাসা ও কালের প্রত্যাশাকে ইতিহাস অস্বীকার করতে পারে না। অবিকশিত উদীয়মান জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবার বুদ্ধি ও চিন্তার অংশগ্রহণ অপরিহার্য– একথা ছফা পরতে পরতে বাঙালিকে স্মরণ করিয়েছেন।

তাঁর দৃষ্টিতে বাঙালি মুসলমানের  মন-মানস এতো দীর্ঘকাল ধরে দাসত্ব করেছে যে তার হদিস আমরা নিজেরাও জানিনা। অসংখ্য বিদেশি জিনিসের মধ্যে কোনটা আমাদের জন্য উপযুক্ত, কোনটা অনুপযুক্ত, কোনটা প্রয়োজন, কোনটা অপ্রয়োজন, কোনটা খেলে ভালো হবে, কোনটা খেলে খারাপ হবে, কোনটা করা উচিত, কোনটা করা উচিত নয় সে ব্যাপারে আমাদের ধারণা করার শক্তিও নষ্ট হয়ে গেছে।

আমরা জ্ঞানকে কতদূর সার্বজনীন করব, প্রযুক্তিবিদ্যার কী পরিমাণ প্রসার ঘটাব এবং বিজ্ঞানের ফলিত প্রয়োগ কত দূর নিশ্চিত করব তার উপরেই নির্ভর করছে … অপরের বাঁধা-ধরা চিন্তার মধ্যে আমাদের আবর্তিত হতে হবে। আমাদের নিজস্ব রুচি নিজস্ব সংস্কৃতির যে নির্দিষ্ট কোনো আকার আছে, তা কোনোদিন দৃশ্যমান করে তুলতে পারব না। বাঙালি-সংস্কৃতি বলতে যদি আদ্যিকালের কোনো সমাজের চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন থাকি বা তা আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করি তাহলে আমরা সভ্য মানুষ হিসাবে স্বীকৃত হতে পারব না। ইতিহাসের ধারায় বাঙালি আজ যেখানে এসে পৌঁছেছে সবকিছু স্বীকার করে নিয়ে, মেনে নিয়ে এই বৈজ্ঞানিক যুগে পৃথিবীর অপরাপর দেশের সঙ্গে তাল রেখে আমাদের মাটি জলহাওয়া যে আমাদের চরিত্রকে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচে তৈরি করেছে, সেটি ফুটিয়ে তুলতে পারাটাই হবে আমাদের যথার্থ মৌলিকতার স্ফূরণ এবং সেটাই হবে আমাদের যথার্থ বাঙালিয়ানা। -‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (মুক্তধারা, ১৯৭২)

বাঙালি মুসলমান  সমাজের গঠন, বিকাশ জাগরণ শিক্ষা-দীক্ষা আকাঙ্ক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তির পরিচর্যা নিয়ে তিনি পেশাদার গবেষকের মত গভীর হবে ভেবেছেন। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি একটি  উদীয়মান বিকশিত জাতীয় সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নতুন সম্ভাবনা ও তাৎপর্য সৃষ্টি করেছিল। ষাটের দশকে উদীয়মান লেখকদের মধ্যে ছফার স্বাতন্ত্র্য চেতনা বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছিল।

***

আহমদ ছফাকে অনেকে ঔপন্যাসিক, কবি, গল্পকার হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত লেখনীর সুর শতধারায় প্রবাহিত প্রায় অভিন্নমুখী। তিনি কেন লিখেছেন তাঁর কৈফিয়ৎ নিজেই দিয়েছেন—আমি নিতান্ত তুচ্ছ মানুষ। তবু আমার ক্রমাগত মনে হচ্ছে আমাকে লিখতে হবে, পালিয়ে বাঁচতে পারব না।  লেখকেরা মানব-সমাজের, মানবজাতির অস্তিত্বের সারবান অংশটুকু ধারণ করেন। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বৈজ্ঞানিক, সাংবাদিক এঁরা সকলেই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু লেখককে আমার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বিক্রমাদিত্যের আমলের কারিগর – বিজ্ঞানী এবং অন্যবিধ বিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমাদের চিন্তা না করলেও চলে। কিন্তু কালিদাসকে নিয়ে না ভাবলে চৈতন্যের শুদ্ধতা আসবে না বলে মনে করি।.. আমি কতটুকু লেখক কতটুকু কবি বা অন্যকিছু সেটাও জানি না। তবুও আমাকে লিখতে হবে। লেখাটা আমার কাছে আনন্দের নয়, অত্যন্ত গুরুভার বেদনাময় কর্তব্য। এড়িয়ে যেতে চাই; পারিনা। (কেন লিখি: ৩৯৫) ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যেমন রুশো, মন্টেস্কুর  আবির্ভাব ঘটেছিল, বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পূর্বেই  অনেকটা দার্শনিক দায়বদ্ধতা নিয়েই তাঁর আবির্ভাব। তাঁর সমস্ত রচনার মূল এই ছিল জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সার্থক বাঙালির মনে অফুরন্ত উদ্দীপনা সৃষ্টি করা। হাজার হাজার বছরের উপেক্ষিত সাধারণ কৃষক খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষের আশা আকাঙ্খার স্বপ্নীল জাতি রাষ্ট্রে ন্যায় ও অধিকার বলবৎ করা। বাংলার এই উপেক্ষিত নর-নারীর মনের ভাষাকে আয়ত্ত করেছিলেন সাহিত্য গল্প কবিতার কলমে, এই অর্থে তিনি দার্শনিক, লেখক, সমকালীন বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী চিন্তাবিদ। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর সুস্পষ্ট মতামত ছিল।

সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক নৈরাজ্য বিষয়ে আহমদ ছফা  মনে করতেন যে,  সাংস্কৃতিক মুক্তি ছাড়া সমাজের কাঙ্খিত মুক্তি সম্ভব নয়। ষাটের দশকে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মেধা শূন্যতা, তাঁদের অন্তঃসারশূন্য কথামালাকে অবলোকন করে হতাশ হয়েছেন ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, আসল সাম্প্রদায়িক ও নকল প্রগতিশীল সুবিধাবাদীদের যুগপতভাবে পরাস্ত করতে না পারলে বাংলাদেশের জনগণের সংস্কৃতির উত্থান অসম্ভব। তিনি উদীয়মান বাংলার সমাজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে উপলব্ধি করেছিলেন নির্মোহভাবে। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিষয়টি যে কেবল বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বের আলোচিত বিষয় সম্পর্কে ছফা অনেক আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা একটি অবিকশিত সমাজ ব্যবস্থারই লক্ষণ। নতুন পরিস্থিতিতে এর উত্থান একটি বাস্তবতা যা ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক ভাবে মাথাচাড়া দিতে পারে তার জন্য এর বিরুদ্ধে অঢেল প্রস্তুতি চাই।

আহমদ ছফার সত্যিকারের সেকুলার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জগুলি তাঁর এসব ভাষ্যের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসে । মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের ( বাঙালি জাতীয়তাবাদবিরোধী) অনুচররা ছাড়াও এমন অনেকেই আছেন যারা পাকিস্তানিদের বাঙালি শাসন ও দমনের কথা মেনে নিলেও পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে মোটেও মেনে নিতে পারেননি মুসলমান বাঙালির জাতীয়তাবোধ জেগে ওঠায়। এই পাকিস্তানপন্থী যুদ্ধাপরাধী (যাদের আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয় আলবদর, আলশামস ও রাজাকার ) এবং মুসলিম বাঙালিরা মিলেই বাংলাদেশে সংবিধানের মূলনীতিগুলোকে পাল্টে দিয়ে আহমদ ছফার প্রত্যাশিত সেকুলার বাংলাদেশের সাংবিধানিক ভিত্তিটাকেই ওলটপালট করে দেয়।

যে আহমদ ছফা উচ্চকিত কণ্ঠে বলেছিলেন, শুধু আশি শতাংশ কেন শতকরা একশো ভাগ মুসলমানও এ দেশে বসবাস করলেও একটি সেকুলার সমাজ, একটি সেকুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ নিরন্তর চালিয়ে যেতে হবে; সেই আহমদ ছফা একদিন মুসলিম বাঙালি’দের ঘেরাটোপে বন্দি হয়েছেন,  এটাই ইতিহাসের এক ট্র্যাজেডি।

***

দু’বাংলার সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর সুস্পষ্ট ভাবনা ছিল , এবং তা খোলাখুলিভাবে জানিয়েছেন। আহমদ ছফার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল  অপ্রিয় মতামতও তিনি অকপটে উগরে দিতেন।

দু’বাংলার  মানুষের মধ্যে একই ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং একই জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হাজার হাজার বছর ধরে বহমান। ইতিহাসের পরিণত সন্ধিক্ষণে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বলি হয়েছে বাংলা, দুই বাংলার মানুষ।

আহমদ ছফা পেশাদার ঐতিহাসিক না হয়েও একজন উদার চিন্তক হিসেবে দুই বাংলার সংস্কৃতি, দেশভাগের বিশেষ করে বাংলা ভাগের মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করেছেন নিজের মতো করে।

সেদিন ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সবকিছুর বন্ধন থেকে ধর্মের দোহাই দিয়ে বাংলাকে আলাদা করা হয়েছিল এবং বাংলার মানুষ তা নীরবে মেনে নিয়েছে। আহমদ ছফার ভাষায়– আসলে বাঙালিদের ভেতরই গলদ ছিল, এ জন্য মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা দায়ী ছিল, সেইসঙ্গে ছিল লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত। এবং একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন— জিন্নাহর পূর্বেও মহারাষ্ট্রের নেতা বালগঙ্গাধর তিলক এক ধরনের দ্বিজাতিতত্ত্বের দাবি উঠিয়েছিলেন এবং অগ্রসর সমাজের মানুষ এখনও তিলককে জাতীয় মনীষী হিসেবেই গণ্য করে, এটাই আশ্চর্য, ইতিহাসের বিকৃত অভিযাত্রা।

দেশ বিভাগের জন্য হিন্দু মহাসভা কিংবা কংগ্রেস দায়ী নয়— শুধু মুসলিম লীগের ধর্মোন্মাদনা , স্বার্থবুদ্ধি এবং জিন্নাহর একগুয়েমী একতরফাভাবে দায়ী– কথাটা সত্যি নয়।

এ কথা জোর দিয়ে বলার আগে একটা জাতির সমাজ, সংস্কৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক গঠনের অতীত পটভূমির নির্মোহ বিশ্লেষণ দরকার, সেইসঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করা আবশ্যক। আর্থ-সামাজিক এবং কঠোরভাবে রাজনৈতিক আধিপত্য অক্ষুন্ন রাখতে সেদিনের বাঙালি হিন্দু নেতারা যে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাস তা অস্বীকার করেনি।

আজ দেশভাগ, বাংলা ভাগ স্মৃতির পলেস্তারায় ঢাকা পড়ে গেছে, শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে দু’বাংলার সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা জগতে নতুন নতুন ভাবনা প্রসারিত হয়েছে, উভয় বাংলার সাংস্কৃতিক সম্বন্ধ স্থাপনের অবারিত সুযোগ,পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

‘দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক’ প্রবন্ধে ছফা বলেছেন, সমগ্র ভারতের সমগ্র জাতিগুলোর মাঝে বাঙালিরা সবথেকে বেশি প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক। এর পিছনে ছফা খুব ভাল একটি যুক্তি দিয়েছেন। একমাত্র বাংলা বাদে হিন্দু মুসলমানের অনেকটা সময় ধরে পাশাপাশি অবস্থানের গৌরব আর কোন জাতির মাঝে ততটা দেখা যায় না। ১৯৪৬ সালের মত দাঙ্গার হবার পরেও এই বাংলার হিন্দু মুসলিম আবার একে অপরের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক নিয়ে বাস করতে পেরেছিলো সেটা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে যেকোনো জাতিদের কাছে দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বে একটা জাতি হিসেবে আত্মপরিচিতি তুলে ধরার জন্য যখন সংগ্রামে নেমেছিল, রণধ্বনি তুলেছিল শুধু পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের  বুকের গভীরে যত বেশি বেজেছে অন্য ভারতীয় প্রদেশবাসীর বুকে ততটা বাজার কথা নয়। ধর্ম এক না হয়েও ভাষা ও জাতিগত কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে এই সম্পর্কের রসায়নকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

হাজার অন্তরায় সত্বেও বাংলা ভাষা ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের অনন্য কৃতিত্ব পূর্ব বাংলার বাঙালিদের, এই বিরল গৌরব অর্জনে ছফা ভারতের সহায়তা দানকে বড় কৃতজ্ঞতার নজরে দেখেছেন, বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের মানসিক সহযোগিতা বাঙালি হিসেবে ভোলার নয়। পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা যে ধর্মের, যে দলের হন না কেন।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের উদারতা যেমন প্রশংসা করেছেন, তেমনি ওপার বাংলার মানুষের সংকীর্ণতার তীব্র নিন্দা করেছেন খোলাখুলিভাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আহমদ ছফা অনেকদিন যাবত বাস করেছিলেন। তৎকালীন কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু বাঙালি মনের সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িকতা তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। দুই বাংলার সংস্কৃতি নামক প্রবন্ধের একস্থানে লিখেছেন, কলকাতা শহরে অবস্থিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি-ফারসি ছাড়া কোন মুসলমান অধ্যাপকের এনট্রি হয়নি দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম, শহরের ছোট-বড় অর্থনীতির উৎস গুলিতে বর্ণবাদের বেড়াজালে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। এখানে নিম্ন বর্ণ, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার সুযোগ কোথায়!

আর ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ, আগ্রাসন। সাংস্কৃতিক পুঁজিবাদ এতটাই কঠোর যে সাহিত্য, কলা, সমাজবিজ্ঞানের ভাবনাটুকু করপোরেটরা নিয়ন্ত্রণ করে, বেশিরভাগ কবি-সাহিত্যিকরা ওদের পদানত। এই সমস্ত নবীন-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের মেধা মনন কর্পোরেটদের কাছে বিক্রি করে ভোগবিলাসী জীবনে অভ্যস্ত, বড় মাপের অনেক লেখক, সাহিত্যিক কর্পোরেটের বেড়াজাল থেকে নিজেদের মুক্ত রেখেছিলেন বলে জীবনে প্রচার-প্রসার, অর্থের মুখ দেখেননি। চরম অভিমানবশত বাঙালি মনের এই অধঃপতন দেখে  ছফা বাংলাদেশী লেখক কবিদের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকদের অন্ধ অনুসরণ, অনুকরণের ব্যাপারে সর্তক করে দিয়েছেন। তিনি খুব স্পষ্ট করে বলেছেন “স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব সাহিত্যধারাকে উত্থানপর্বে পৌঁছে দিতে যে সাহায্যের প্রয়োজন, সেই সাহায্য দেবার ক্ষমতা, সময় আজকের পশ্চিমবাংলার নেই।”

***

আহমদ ছফা ‘শতবর্ষের ফেরারি :বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ নামে একটি বই রচনা করে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য চর্চা ও বাঙালি জাতি গঠনে তাঁর অবদান নিয়ে আলোকপাত করেছেন, বলা যায় অসামান্য মূল্যায়ন করেছেন। বাঙালি মুসলমান সমাজ বঙ্কিমকে কোনদিনই সুনজরে দেখেনি একথা খুবই সত্য , হয়তো তার নানা মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের রাষ্ট্র দর্শন, সমাজ ভাবনাগুলি থেকে বাঙালি মুসলমান মন ফিরিয়ে নিলে নিজের প্রতিই অবিচার করা  হবে মন্তব্য করেছেন ছফা। তবে বাংলার হিন্দু সমাজ মানুষ বঙ্কিমচন্দ্রকে ঋষির আসনে বসিয়েছিলেন। তিনি যে বাংলার জাতীয় সংগ্রামের উদগাতা–কথাটা খুবই বিকৃত অর্থে সত্য। তিনি জাতীয়তাবোধ, বা ন্যাশনালাজিম পরিমণ্ডল তৈরি করেছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের দিকে তাকিয়ে, এখানে সবার প্রবেশাধিকারের কথা উল্লেখিত হয়নি।

কিন্তু প্রতিবেশী মুসলমান সমাজের জন্য তাঁর ভাবনার সীমাবদ্ধতা, সাহিত্য ও প্রবন্ধে ভাষা প্রয়োগ, পদ্ধতি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিস্তর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আছে। যদিওবা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলার সাহিত্য ও সমাজ গঠনের মননে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।

একথা ঠিক যে, আজকের ভারতবর্ষেও বঙ্কিমের রাষ্ট্রচিন্তা অসম্ভব রকম জীবন্ত। ঘোষিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত রাষ্ট্রের কর্ণধারদের পক্ষেও বঙ্কিমের চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না ।

ছফা লিখেছেন, মহসিন ফান্ডের বদান্যতায় লেখাপড়া শিখে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমান সমাজকে এমনই উপহার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষে বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সাহিত্য রচনার এই একপেশে ধারা অনেক বড় বড় লেখকই অনুসরণ করেছেন, আহমদ ছফার ভাষায় যা দুর্ভাগ্যের। আহমদ ছফা রামমোহন ,বিদ্যাসাগর ,রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, বঙ্কিমচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পাশ্চাত্যের অনেক মনীষীদের সৃষ্টি  নিয়ে মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। রামমোহন, বিদ্যাসাগরের কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন করতে ছাড়েননি এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও, গ্যেটের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে  নিজেকে মানুষ ভাবতে আনন্দ বোধ করেছেন।

গ্যেটে— এই মনীষীর বৈভবময় জীবন ও বিপুল সৃষ্টি ছফাকে সূর্যাভিমুখী পুষ্পের মতো প্রস্ফুটিত করেছে। গ্যেটের অমর কাব্য ‘ফাউস্ট’, যেটি তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে রচনা করেছেন, সেই বৃহদায়তন রচনাটি অনুবাদের সৎসাহসিক উদ্যোগ আহমদ ছফা নিয়েছিলেন। ফাউস্ট এত স্বচ্ছ প্রাঞ্জল রচনাকে অনুবাদ বলে মনে হয় না, যেন মৌলিক তাঁর। চিরায়ত সাহিত্যের প্রতি  শ্রদ্ধা ও অনুরাগ এর সুফল এই গ্রন্থ, অনুবাদ সাহিত্যের একটি মাইলফলক।

শুধু গ্যেটে নয়, আহমদ ছফার চেতনা ও সৃষ্টিশীলতায় অনেকেরই প্রভাব ছিল; বিশেষভাবে  রাসেল এবং রবীন্দ্রনাথ। এই তিন মনীষী শুধু যে তাঁর মনোগঠনে ভূমিকা রেখেছেন তা নয়, সৃষ্টিশীলতার দুরূহ দুর্গম পথের পথিক হতেও সৎসাহস জুগিয়েছেন। ইংরেজ মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল ও বাঙালি মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আহমদ ছফা অসাধারণ দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

ছফা যৌবন বয়সে কবিগুরুর প্রতি যে প্রণতি দেখিয়েছেন, পরিনত বয়সে পূর্বতন ধ্যান-ধারণা থেকে কিছুটা হলেও পিছুপা হয়েছেন।

আহমদ ছফার লেখা ‘জীবিত থাকলে রবীন্দ্রনাথকেই জিজ্ঞেস করতাম’ শিরোনামে একটি কালজয়ী প্রবন্ধে স্পষ্টত তার প্রতিবাদী চেতনা, সংক্ষুব্ধতা ও সাহসের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা রীতিমতো বিস্ময়ের ব্যাপার। এখানে তিনি স্পষ্টভাবে রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ করে লেখেন, “গোত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমার জীবনের মহত্তম মানুষ। জীবনের সমস্ত রকম সমস্যা সংকটে আমি তার রচনা থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করতে চেষ্টা করেছি। আমার বোধবুদ্ধি যখন একটু সেয়ানা হয়ে উঠল, একটা প্রশ্ন নিজের মধ্যেই জন্ম নিল। আমি মুসলমান চাষা সম্প্রদায় থেকে আগত একজন মানুষ। রবীন্দ্রনাথ আমাদের নিয়ে কিছু লিখেননি কেন? এ প্রশ্নটা মনের মাঝে জাগলেও প্রকাশ্যে উচ্চারণ করতে সাহস করিনি। আমাদের গোঁড়া মুসলমানেরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে সকল অপপ্রচার করে থাকে, আমার প্রশ্নটিকে তাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে আমাকে রবীন্দ্র-বিরোধীদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করার ভয়ে অনেক দিন চুপচাপ ছিলাম। এখন আমার একটি উপলব্ধি এসেছে যে, যেভাবে ইচ্ছে গ্রহণ করুক, আমার মন যেভাবে বলছে আমি প্রশ্নটা সেভাবে উচ্চারণ করব। এখানকার রবীন্দ্রভক্তরা হয়তো রুষ্ট হবেন। তবে আমি নিশ্চিত রবীন্দ্রনাথের রুহ মোবারক আমার প্রশ্নে কষ্ট পাবে না। রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তিনি ফুলের গন্ধ, পাখির গান, এমনকি গোধূলির আলোর কাছেও নিজেকে ঋণী ভাবতেন।”

***

আহমদ ছফা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী একজন প্রগতিশীল লেখক। অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল ক্ষুরধার। অনেকের মতে, বাংলাদেশে আহমদ ছফার মতো সাহসী লেখক দ্বিতীয় কেউ নেই। তিনি কখনো হিসেব করে লিখতেন না। অত্যন্ত রাগী ছিলেন, কখনো কারও সঙ্গে আপস করেননি। বলা হয়, বাংলাদেশে আহমদ ছফা একজনই। বাংলা সাহিত্যে এ পর্যন্ত যত প্রাবন্ধিক, লেখক ও সাহিত্যিক জন্ম নিয়েছেন, তাদের মধ্যে আহমদ ছফাই সবচেয়ে সাহসী, কুশলী, বহুমুখী—এক কথায় অসাধারণ ছিলেন।

মানবিক মূল্যবোধ ও গুণাবলির জন্যও আহমদ ছফা ছিলেন অনন্য। ছফা ছিলেন ভবঘুরে, অবিবাহিত এবং খ্যাতি, ধন-সম্পদ বা অন্যান্য বৈষয়িক মোহবর্জিত। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ব্যক্তিত্ব, চিন্তাশক্তি ও চিত্রকর্মের উচ্চ প্রশংসা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এসএম সুলতানকে তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে প্রচারের মুখে নিয়ে আসেন।

তিনি অপূর্ব গদ্যশৈলী রপ্ত করেছিলেন, এক একটা বিষয়ের জন্য এক এক রকম। চিন্তাশীল রচনায় হোক কিংবা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কি গল্প কি উপন্যাস তার গদ্য মানিয়ে যেত। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে স্বতন্ত্র একা মানুষ ছিলেন আহমদ ছফা। উদার ,অসাম্প্রদায়িক, ষোলআনা সংস্কারমুক্ত চিন্তাশীল এই মানুষটি জ্ঞানচর্চার দিগন্ত সব সময় বাড়াতে চাইতেন,  সুন্দরের প্রতি এমন তৃষ্ণা খুব কম লেখকের মধ্যে সচরাচর  পাওয়া যায় না।

ব্যক্তিগত জীবনে আহমদ ছফা অস্বীকার করেছেন সমস্ত প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমানকে। তাঁর একটা স্থির লক্ষ্য ছিল যে সমাজে একটা রেনেসাঁস সৃষ্টি করা , সেই রেনেসাঁর জন্য নতুন নতুন মাল মশলা চাই অনেক কলাকুশলী চাই ,প্রতিনিয়ত বাঙালি তরুণদের মধ্যে সেসব সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতেন, একটা সম্ভবনাময়ী ভবিষ্যৎ নির্মাণে। তিনি বলতেন– আজ থেকে যদি দশ বছর বিশ বছর একশ পঞ্চাশ বৎসর বাদে, আমার মৃত্যুর পরে কোন প্যাশনেট তরুণ যদি আমার কাজের কোন একটা অর্থ বুঝতে চেষ্টা করে, তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা উচিত ।

আহমদ ছফার অকাল মৃত্যু নিয়ে আনিসুজ্জামান লিখেছেন, বহুমুখী সৃজনশীল মনীষী আহমদ ছফা নিজের একটা জগত তৈরি করেছিল এবং সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত হয়েছে জগতে বাস করত, আর সেই জগৎ এবং আমাদের এই জগত ছেড়ে সে চলে গেল! আমার কনিষ্ঠের, আমার ছাত্রের মৃত্যু আমাকে দেখতে হয়েছে , আবারও হলো। বেশিদিন বাঁচার এ এক অভিশাপ,  ছফার সমালোচনা আমিও করেছি ,সেই সঙ্গে তাঁকে শ্রদ্ধা ও করেছি।

অনেকের মতে বাঙালি মুসলমানেরদের মধ্যে  মীর মশাররফ হোসেনের পরে এতো বিশুদ্ধ চিন্তার লেখক সম্ভবত ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পরেও দুই বাংলায় তিনি অফুরন্ত চিন্তার খোরাক রেখে গেছেন যা নতুন করে ভেবে দেখার বিস্তর সুযোগ রয়েছে।

তথ্য সূত্র:

১. বাঙালি মুসলমানের মন, হাওলাদার প্রকাশনা , ঢাকা,১৯৮১

২. আহমদ ছফা স্মারক গ্রন্থ, সম্পাদনা ,মোর্শেদ শফিউল হাসান ও সোহরাব হাসান, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা,২০০৩

৩.আহমদ ছফা নির্বাচিত প্রবন্ধ , মোর্শেদ শফিউল হাসান, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা,২০০২

৪.আহমদ ছফার ডাইরি, সম্পাদনের নুরুল আনওয়ার, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৭

৫. ওঙ্কার উপন্যাস, স্টুডেন্ট ওয়েজ ,ঢাকা, ১৪০০

৬. শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রাচ্যবিদ্যা প্রকাশনী ,ঢাকা ১৯৯৭

৭. যদ্যপি আমার গুরু, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা,১৯৮৮

৮. সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস খান ,ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, ২০১১

৯.আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার, নুরুল আনোয়ার, খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানি ,ঢাকা ,২০০৯

১০. হারানো লেখা, খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানি, সংগ্রহ ও সম্পাদনা, নুরুল আনোয়ার,হাওলাদার প্রকাশনা , ঢাকা ,২০১৫

১১. সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস, আহমদ ছফা, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা ১৯৭৯

১২. উত্তরখন্ড, আহমদ ছফা, সংগ্রহ সম্পাদনাঃ নুরুল আনোয়ার , খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি ,ঢাকা, ২০১১

 

Facebook Comments